ঢাকা ০৯:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: ভারত ম্যাচ বয়কটে অনড় পাকিস্তান, আইসিসিতে গভীর সংকট

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:১৪:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের ঘোষণায় অনড় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তান সরকার এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে, বৈশ্বিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি পাকিস্তানকে সতর্ক করে বলেছে, এমন একতরফা সিদ্ধান্তের আইনি ও চুক্তিগত ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। এই ম্যাচটি না হলে আইসিসির আর্থিক খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে, যা বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। পাকিস্তানের এই অনড় অবস্থান আইসিসিকে গভীর সংকটে ফেলেছে।

পাকিস্তানের এই ঘোষণার পর থেকেই ক্রিকেট মহলে জল্পনা-কল্পনা চলছে— পাকিস্তান কি শেষ পর্যন্ত তাদের বয়কটের সিদ্ধান্ত বজায় রাখবে? একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) কী ধরনের পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে। আইসিসির ইভেন্টে অংশগ্রহণ পরিচালিত হয় ‘মেম্বার্স পার্টিসিপেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এমপিএ) দ্বারা, যার একটি অনুলিপি ইএসপিএনক্রিকইনফো হাতে পেয়েছে। এই নথির ভিত্তিতে আইনি বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তান-ভারত ম্যাচ না হওয়ার দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্ভাবনা নিয়ে মতামত দিয়েছেন, যা পাকিস্তান এবং আইসিসি উভয়কেই জটিল আইনি পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।

আইসিসির চুক্তি ও পাকিস্তানের দায়
আইসিসির সব ইভেন্টে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোকে যে এমপিএ-তে স্বাক্ষর করতে হয়, সেখানে একটি স্পষ্ট শর্ত রয়েছে। চুক্তির ৫.৭.১ ধারায় বলা হয়েছে, যেকোনো সদস্য দেশ যোগ্যতা অর্জন করলে সংশ্লিষ্ট আইসিসি ইভেন্টে শুধু অংশ নেবে না; বরং নির্ধারিত প্রতিটি ম্যাচ নিঃশর্তভাবে খেলবে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করলে আইসিসি সহজেই দাবি করতে পারে যে, পিসিবি এই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করছে। এর ফলে ক্ষতিপূরণ, আর্থিক জরিমানা এমনকি আরও কঠোর সাংগঠনিক শাস্তির পথও খুলে যেতে পারে।

ফোর্স মেজার বিতর্ক
আইসিসির বিরুদ্ধে পিসিবির সম্ভাব্য প্রধান প্রতিরক্ষা হতে পারে ‘ফোর্স মেজার’ অর্থাৎ সরকারের নির্দেশে ম্যাচ খেলতে না পারা। এমপিএ-এর ১২ নম্বর ধারায় সরকারি আদেশকে ফোর্স মেজার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে, চুক্তি অনুযায়ী এক্ষেত্রে আইসিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত নোটিস দিতে হয় এবং ব্যাখ্যা করতে হয়— কীভাবে ওই আদেশ চুক্তিগত দায় পালনে বাধা সৃষ্টি করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়, পিসিবি সে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে কি না। আইসিসির প্রতিক্রিয়া থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বিষয়টি তারা জানে, কিন্তু আইনি দিক থেকে সেটি যথেষ্ট কি না, তা বড় প্রশ্ন।

‘সব ম্যাচ নয়, এক ম্যাচ’ যুক্তির খণ্ডন
আইসিসি চাইলে যুক্তি দিতে পারে যে, যদি একটি দল একটি ম্যাচ খেলতে না পারে, তাহলে পুরো টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সক্ষমতাই হারায়। সেক্ষেত্রে পিসিবির অংশগ্রহণ বাতিল পর্যন্ত করতে পারে সংস্থাটি। অন্যদিকে, পিসিবির যুক্তি হতে পারে— এটি আংশিক ফোর্স মেজার, যার শাস্তি সর্বোচ্চ একটি ম্যাচে ফরফিট বা হার হিসেবেই গণ্য হওয়া উচিত। তাই এটি পুরো টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কারের কারণ হতে পারে না। তারা আরও যুক্তি দিতে পারে— যদিও ম্যাচ পরিত্যাগ বা ফরফিট সংক্রান্ত কিছু ধারা টুর্নামেন্ট প্লেয়িং কন্ডিশনে অকার্যকর করা হয়েছে, তবুও সেখানে পয়েন্ট বণ্টন ও নেট রান রেট গণনার ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে তারা কেবল ক্রীড়াগত ক্ষতিই ভোগ করবে।

মন্ত্রী-চেয়ারম্যানের দ্বৈত ভূমিকা
বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির ভূমিকা নিয়ে। তিনি একদিকে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান, অন্যদিকে দেশটির সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আইনে যেখানে বোর্ডের স্বায়ত্তশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই দ্বৈত ভূমিকা পিসিবির অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে। আইসিসি চাইলে দাবি করতে পারে— এই ফোর্স মেজার ‘স্ব-সৃষ্ট’ এবং বৈধ প্রতিপক্ষ নয়। ফোর্স মেজার পরিস্থিতি ঠিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। উদাহরণ হিসেবে, বিসিসিআই ভারত সরকারের নির্দেশে ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পাকিস্তানে না খেলার সিদ্ধান্ত নিলেও হাইব্রিড মডেলের মাধ্যমে সেটি সমাধান করা হয়েছে। তাই এমন ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকলে ফোর্স মেজার দেখানো কঠিন হয়ে যায়, যদিও অসম্ভব নয়। পিসিবি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন ফোর্স মেজার হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

চরম শাস্তির ঝুঁকি
আইসিসি সংবিধান অনুযায়ী, গুরুতর দায়ভঙ্গের ক্ষেত্রে কোনো সদস্য দেশকে সাময়িক বরখাস্ত বা সদস্যপদ বাতিল করার ক্ষমতাও বোর্ডের হাতে রয়েছে। যদিও এটি চরম পদক্ষেপ, তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে সে সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে এই সংকট শুধু একটি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করছে না, এটি বিশ্ব ক্রিকেট রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও ঠিক করে দিতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সেমিফাইনালের স্বপ্ন জিইয়ে রাখার লড়াই: শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি পাকিস্তান, সামনে পাহাড়সম সমীকরণ

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: ভারত ম্যাচ বয়কটে অনড় পাকিস্তান, আইসিসিতে গভীর সংকট

আপডেট সময় : ০১:১৪:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের ঘোষণায় অনড় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তান সরকার এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে, বৈশ্বিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি পাকিস্তানকে সতর্ক করে বলেছে, এমন একতরফা সিদ্ধান্তের আইনি ও চুক্তিগত ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। এই ম্যাচটি না হলে আইসিসির আর্থিক খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে, যা বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। পাকিস্তানের এই অনড় অবস্থান আইসিসিকে গভীর সংকটে ফেলেছে।

পাকিস্তানের এই ঘোষণার পর থেকেই ক্রিকেট মহলে জল্পনা-কল্পনা চলছে— পাকিস্তান কি শেষ পর্যন্ত তাদের বয়কটের সিদ্ধান্ত বজায় রাখবে? একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) কী ধরনের পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে। আইসিসির ইভেন্টে অংশগ্রহণ পরিচালিত হয় ‘মেম্বার্স পার্টিসিপেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এমপিএ) দ্বারা, যার একটি অনুলিপি ইএসপিএনক্রিকইনফো হাতে পেয়েছে। এই নথির ভিত্তিতে আইনি বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তান-ভারত ম্যাচ না হওয়ার দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্ভাবনা নিয়ে মতামত দিয়েছেন, যা পাকিস্তান এবং আইসিসি উভয়কেই জটিল আইনি পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।

আইসিসির চুক্তি ও পাকিস্তানের দায়
আইসিসির সব ইভেন্টে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোকে যে এমপিএ-তে স্বাক্ষর করতে হয়, সেখানে একটি স্পষ্ট শর্ত রয়েছে। চুক্তির ৫.৭.১ ধারায় বলা হয়েছে, যেকোনো সদস্য দেশ যোগ্যতা অর্জন করলে সংশ্লিষ্ট আইসিসি ইভেন্টে শুধু অংশ নেবে না; বরং নির্ধারিত প্রতিটি ম্যাচ নিঃশর্তভাবে খেলবে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করলে আইসিসি সহজেই দাবি করতে পারে যে, পিসিবি এই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করছে। এর ফলে ক্ষতিপূরণ, আর্থিক জরিমানা এমনকি আরও কঠোর সাংগঠনিক শাস্তির পথও খুলে যেতে পারে।

ফোর্স মেজার বিতর্ক
আইসিসির বিরুদ্ধে পিসিবির সম্ভাব্য প্রধান প্রতিরক্ষা হতে পারে ‘ফোর্স মেজার’ অর্থাৎ সরকারের নির্দেশে ম্যাচ খেলতে না পারা। এমপিএ-এর ১২ নম্বর ধারায় সরকারি আদেশকে ফোর্স মেজার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে, চুক্তি অনুযায়ী এক্ষেত্রে আইসিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত নোটিস দিতে হয় এবং ব্যাখ্যা করতে হয়— কীভাবে ওই আদেশ চুক্তিগত দায় পালনে বাধা সৃষ্টি করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়, পিসিবি সে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে কি না। আইসিসির প্রতিক্রিয়া থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বিষয়টি তারা জানে, কিন্তু আইনি দিক থেকে সেটি যথেষ্ট কি না, তা বড় প্রশ্ন।

‘সব ম্যাচ নয়, এক ম্যাচ’ যুক্তির খণ্ডন
আইসিসি চাইলে যুক্তি দিতে পারে যে, যদি একটি দল একটি ম্যাচ খেলতে না পারে, তাহলে পুরো টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সক্ষমতাই হারায়। সেক্ষেত্রে পিসিবির অংশগ্রহণ বাতিল পর্যন্ত করতে পারে সংস্থাটি। অন্যদিকে, পিসিবির যুক্তি হতে পারে— এটি আংশিক ফোর্স মেজার, যার শাস্তি সর্বোচ্চ একটি ম্যাচে ফরফিট বা হার হিসেবেই গণ্য হওয়া উচিত। তাই এটি পুরো টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কারের কারণ হতে পারে না। তারা আরও যুক্তি দিতে পারে— যদিও ম্যাচ পরিত্যাগ বা ফরফিট সংক্রান্ত কিছু ধারা টুর্নামেন্ট প্লেয়িং কন্ডিশনে অকার্যকর করা হয়েছে, তবুও সেখানে পয়েন্ট বণ্টন ও নেট রান রেট গণনার ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে তারা কেবল ক্রীড়াগত ক্ষতিই ভোগ করবে।

মন্ত্রী-চেয়ারম্যানের দ্বৈত ভূমিকা
বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির ভূমিকা নিয়ে। তিনি একদিকে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান, অন্যদিকে দেশটির সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আইনে যেখানে বোর্ডের স্বায়ত্তশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই দ্বৈত ভূমিকা পিসিবির অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে। আইসিসি চাইলে দাবি করতে পারে— এই ফোর্স মেজার ‘স্ব-সৃষ্ট’ এবং বৈধ প্রতিপক্ষ নয়। ফোর্স মেজার পরিস্থিতি ঠিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। উদাহরণ হিসেবে, বিসিসিআই ভারত সরকারের নির্দেশে ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পাকিস্তানে না খেলার সিদ্ধান্ত নিলেও হাইব্রিড মডেলের মাধ্যমে সেটি সমাধান করা হয়েছে। তাই এমন ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকলে ফোর্স মেজার দেখানো কঠিন হয়ে যায়, যদিও অসম্ভব নয়। পিসিবি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন ফোর্স মেজার হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

চরম শাস্তির ঝুঁকি
আইসিসি সংবিধান অনুযায়ী, গুরুতর দায়ভঙ্গের ক্ষেত্রে কোনো সদস্য দেশকে সাময়িক বরখাস্ত বা সদস্যপদ বাতিল করার ক্ষমতাও বোর্ডের হাতে রয়েছে। যদিও এটি চরম পদক্ষেপ, তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে সে সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে এই সংকট শুধু একটি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করছে না, এটি বিশ্ব ক্রিকেট রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও ঠিক করে দিতে পারে।