দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিদ্যমান গভীর সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐকমত্য জরুরি বলে মনে করছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা সত্ত্বেও উচ্চ ব্যয়, জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা, ডলার সংকট, ভর্তুকির চাপ এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে খাতটি আর্থিক ও কাঠামোগতভাবে ব্যাপক চাপে পড়েছে। এই সংকট নিরসনে নতুন সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি মিলনায়তনে জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের এক আলোচনা সভায় এসব অভিমত ব্যক্ত করেন বক্তারা। সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য সুসংগঠিত পদক্ষেপের ওপর জোর দেন।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মূলত প্রাথমিক জ্বালানিতে দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। তিনি উল্লেখ করেন, এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ)-এর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। বর্তমান দুটি এফএসআরইউর নির্ধারিত সক্ষমতার বাইরে গিয়ে জরুরি প্রয়োজনে আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়। জালাল আহমেদ আরও বলেন, ২০০১ সালের পর দেশে কোনো বাস্তবভিত্তিক রিজার্ভার ম্যানেজমেন্ট স্টাডি হয়নি এবং গত ১৬ বছর ধরে গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতা বিরাজ করছে। জ্বালানি খাতে সীমিত বরাদ্দ থাকলেও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। তার মতে, প্রাথমিক জ্বালানিতে বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়। কয়লা খাতে অগ্রগতি নেই এবং ১৯৯৬ সালের পর নতুন কোনো সমন্বিত জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা হয়নি। দেশের প্রকৃত বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনায় বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ অপ্রয়োজনীয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর, যা জলবায়ু পরিবর্তন ও প্যারিস চুক্তির আলোকে একটি নেতিবাচক চিত্র। বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যা গত এক বছরে আরও বেড়েছে। এর ফলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সহজেই অনুমেয়। অধ্যাপক ইজাজ হোসেন গ্যাস খাতের পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৫০০ থেকে ২৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর প্রায় ৫৯ থেকে ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। গৃহস্থালি খাতে গ্যাস ব্যবহারের হিসাব ১১ শতাংশ দেখানো হলেও বাস্তবে তা ৫-৬ শতাংশের বেশি নয়। তিনি আরও বলেন, গ্যাস বিতরণ ও সঞ্চালনে প্রায় ৮.৫ শতাংশ সিস্টেম লস দেখানো হলেও বাস্তবে প্রযুক্তিগত কারণে এত লস হওয়ার কথা নয়। এটি মূলত চুরি ও অনিয়মের ফল। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ শতাংশ গ্যাস কার্যত চুরি বা অপচয় হচ্ছে, যার মধ্যে ৩০-৩৩ শতাংশ আমদানিকৃত এলএনজি। এই ১০ শতাংশ ক্ষতি মানে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সরাসরি ক্ষতি, যা বন্ধ করা গেলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব।
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়ক সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল ও কয়লার ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। গ্যাসের ঘাটতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ওঠানামা খাতটিকে অস্থির করে তুলেছে। এলএনজি আমদানি, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সংযোগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিদ্যুৎ খাত স্থিতিশীল না হলে দ্রুত শিল্পায়ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ কঠিন হবে। আদানি পাওয়ার চুক্তির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এই চুক্তি স্বেচ্ছা ও অপ্রতিযোগিতামূলকভাবে অনুমোদিত হয়েছিল, যেখানে জ্বালানি মূল্য, বিনিময় হার, কর ও নীতি পরিবর্তনের সমস্ত ঝুঁকি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ওপর বর্তেছে। এর ফলস্বরূপ বিদ্যুৎ উৎপাদন চার গুণ বাড়লেও স্বতন্ত্র উৎপাদককে প্রদেয় অর্থ এগারো গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও জানান, ২০২৫ সাল নাগাদ বিদ্যুৎ খাতের বার্ষিক ক্ষতি ৫০ হাজার থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। তাই স্বচ্ছ চুক্তি, শক্তিশালী প্রশাসন এবং কার্যকর নীতি প্রয়োগ অপরিহার্য।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও আইইউবি’র উপাচার্য অধ্যাপক এম. তামিম বলেন, সামনে দেশকে বড় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করতে হবে। নতুন সরকারকে কঠিন সময় পার করতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিলের আগে চলমান অবস্থায় যাচাই ও পর্যালোচনা জরুরি, কারণ তা না হলে সরবরাহ বন্ধ হয়ে জনগণ ভোগান্তির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিজস্ব গ্যাস সবচেয়ে কম খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের তুলনায় এখনও অনেক সাশ্রয়ী। নিজস্ব জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎ ১০ টাকার নিচে দেওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, দেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় নিজস্ব জ্বালানি উন্নয়নের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। অধ্যাপক তামিম আরও বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে মাইক্রোম্যানেজমেন্ট ও কষ্টসাধ্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জনগণ সুলভ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাইলেও তা আনার জন্য সময়, পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভর করবে।
এসওএএস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক হোসাইন খান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি কয়েকটি ভয়াবহ অমীমাংসিত সংকটের মুখে রয়েছে, যা দেশকে ধসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৩৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ এবং বিদ্যুৎ খাতের গভীর আর্থিক সংকট সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। তিনি বলেন, গত বছর বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হয়েছে, যার বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করা হয়েছে। এই লোকসান ঋণ বা টাকা ছাপিয়ে বহন করা সম্ভব নয়; এতে হাইপার ইনফ্লেশনের আশঙ্কা তৈরি হবে। মুশতাক হোসাইন খান আরও বলেন, ভর্তুকি তুলে নিতে হলে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে, যা হলে শিল্প খাত টিকবে না এবং দেশে ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন শুরু হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের মূল কারণ নীতির অভাব নয়, বরং ২০১০ সালের পর থেকে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। বিদ্যুৎ উৎপাদন চার গুণ বাড়লেও খরচ বেড়েছে এগারো গুণ এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে বিশ গুণ। মাস্টার প্ল্যান উপেক্ষা করে এবং অযৌক্তিক চুক্তির মাধ্যমে এই সংকট তৈরি হয়েছে। তার মতে, দুর্নীতি বন্ধ না হলে কোনো নীতিগত সংস্কারই কার্যকর হবে না।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী মহাসচিব এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জাতীয় ইস্যুতে সকল রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে ঐকমত্যের প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতি বদলানোর কারণে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, বরং সমস্যা আরও বেড়ে যাচ্ছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্নীতি রোধ এবং দেশপ্রেমমূলক নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অঙ্গীকার ও দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। দুর্নীতি জাতিকে ধ্বংস করছে এবং এটি রোধ করতে সবার রাজনৈতিক ও নৈতিক অংশগ্রহণ দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন। সরকার, বিরোধী দল, প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের উচিত যৌথভাবে নীতিমূলক প্রস্তাব তৈরি করা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা। যারা নীতি নির্ধারণ ও সম্পদের ব্যবহার নিয়ে দায়িত্বে আছেন, তাদের অব্যাহত দুর্নীতি ও অসচেতনতা বন্ধ করতে হবে। এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, তার দলের পক্ষ থেকে জাতীয় ইস্যুতে বাস্তবভিত্তিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হয়েছে, যা সরকারের পরবর্তী নীতি নির্ধারণে কাজে লাগানো যাবে।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, আসন্ন সরকারের জন্য শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ রয়েছে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও শক্তি খাতে। তিনি সাংবাদিক ও একাডেমিয়ার বন্ধুদের আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণকে সচেতন করা জরুরি যেন অপ্রিয় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এখনও খুব কম, মাত্র ২.৩ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ওভারক্যাপাসিটি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়াতে, বড় খরচের কেন্দ্রগুলো নবায়নযোগ্য শক্তিতে ধীরে ধীরে রূপান্তর করা উচিত। এছাড়া পাইপলাইন গ্যাসের দাম সিলিন্ডার গ্যাসের তুলনায় বৃদ্ধি করা দরকার, যাতে ঘরে বসে পাওয়া সুবিধা অন্যায়ভাবে ব্যবহার না হয়। ওয়াহিদ হোসেন জোর দিয়ে বলেন, অপ্রিয় সত্য বলা ও অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরুতেই করা ভালো, কারণ সরকারকে তিন-চার বছরের মধ্যে নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হয়। সত্যের শক্তি কাজে লাগিয়ে, অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে তা ফলপ্রসূ করা সম্ভব।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামসুল আলম বলেন, বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অনিয়ম চললে কোনো প্রতিষ্ঠান সুস্থভাবে কাজ করতে পারে না। তিনি অভিযোগ করেন, রেগুলেটরি কমিশন, যা সেক্টরের একমাত্র নিয়ন্ত্রক, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের হাতিয়ার হয়ে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, কম্পিটিশন কমিশন ও ভোক্তা অধিদপ্তরও কোনো ভূমিকা নিচ্ছে না, আর আইন লঙ্ঘনের দণ্ড কার্যকর হচ্ছে না। শামসুল আলম আরও বলেন, রিপোর্ট বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা সঠিক ফলাফল আনে না। ফলে, সেক্টরের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ও অপ্রিয় সত্য সামনে আনা জরুরি।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহ, বিইআরসির সাবেক সদস্য মো. মিজানুর রহমান, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খান, আইইইএফএ’র লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম, এলপিজি অটোগ্যাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনেরর সভাপতি মো. সেরাজুল মাওলা, লোয়াবের সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশিদ, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন মালিক সমিতি মহাসচিব ফারহান নূর, রবির চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার শহীদ আলমসহ প্রমুখ।
রিপোর্টারের নাম 





















