ঢাকা ০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোট ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র মতভেদ, ধৈর্য দেখাচ্ছে বিএনপি

বর্তমানে দেশজুড়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশমালা। বিশেষ করে, সুপারিশকৃত ‘গণভোট’ কবে হবে, এই ইস্যুতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল চাইছে নভেম্বরেই বা জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট আয়োজন করা হোক। অন্যদিকে, দেশের বৃহত্তম দল বিএনপিসহ অন্যান্য অধিকাংশ রাজনৈতিক দল চায়, গণভোটটি জাতীয় নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত হোক। এই মতবিরোধের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বক্তৃতার মঞ্চসহ সর্বত্রই তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলছে।

তবে, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এই পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ ধৈর্য দেখাতে চাইছে। দলটি আপাতত কোনো ধরনের শক্তি প্রদর্শন বা রাজপথের কর্মসূচি দিয়ে দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় না। বিএনপি আশা করছে, প্রধান উপদেষ্টা দেশের বাস্তবতার নিরিখে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। তাদের মতে, শুধু সুপারিশ করলেই সেটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে না, তাই জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনোভাবেই গণভোট মানা হবে না।

বিএনপি মনে করে, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে তারা দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে আসছে এবং এখনো দিচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নিজেদের স্বার্থে প্রশাসনে দলীয়করণ করলেও বিএনপি সেই পথে না হেঁটে দ্রুততম সময়ে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরকার গঠনের কথা বলে আসছে। এ কারণেই বিএনপি সব সময় শান্তি ও চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। তবে দলটি হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যদি কোনো অশুভ পক্ষ দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে বা নির্বাচন বানচাল করতে চায়, তবে বিএনপি বসে থাকবে না এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থে কঠোর কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে বাধ্য হবে।

গত বুধবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের বিষয়ে মূল আলোচনা হয়। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে উপস্থিত স্থায়ী কমিটির সদস্যরা আপাতত সর্বোচ্চ ধৈর্য দেখানোর বিষয়ে একমত হন। এরপর বৃহস্পতিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও দলের নেতারা একই ইঙ্গিত দেন। তারা বলেন, বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল এবং এই মুহূর্তে তাদের জনসমর্থন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তাদের বড় কর্মসূচিতে লাখ লাখ লোকের সমাগম হতে পারে এবং তারা চাইলেই সারাদেশে বড় ধরনের শোডাউন করতে পারে। কিন্তু নানা মতপার্থক্য তৈরি হওয়া সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করে চলেছে।

স্থায়ী কমিটির সভার সূত্র অনুযায়ী, বিএনপির মূল লক্ষ্য হলো যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া। এ জন্য তারা যতখানি ছাড় দেওয়া সম্ভব, তা দিয়েছে এবং গণভোটসহ অন্যান্য ইস্যুতেও নমনীয় থাকতে চায়। তারা তাদের বক্তব্য আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে নয়, বরং মিডিয়ার মাধ্যমে, বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে, এবং প্রয়োজনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে অনৈক্যের বিষয়গুলো জানাবে। তবে তারা জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট কখনোই মেনে নেবে না; গণভোট হলে তা নির্বাচনের দিনই হতে হবে। যদি নির্বাচনের আগে গণভোটের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তবে বিএনপি আর ধৈর্য ধারণ করবে না।

স্থায়ী কমিটির সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ব্যাপারে জাতির সামনে কমিটমেন্ট দিয়েছেন, আমরা তাতে আস্থা রেখেছি। জাতির স্বার্থে নির্বাচনের দিন গণভোটে আমরা একমত হয়েছি। এর বাইরে অন্য কোনো দিন বা নির্বাচনের আগে আমরা গণভোট মেনে নেব না। আমরা আমাদের মতামত জাতির সামনে তুলে ধরলাম। প্রয়োজনে আমরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে যাব।” তিনি আরও নিশ্চিত করেন, “আমরা কোনো কর্মসূচিতে এখন যাব না। নির্বাচন নিয়ে আমাদের কাছে কোনো ধোঁয়াশা নেই। সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।”

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এই সুপারিশকে উল্লেখ করে বলেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে এটা একটি সুপারিশ। এর মধ্যে যে ত্রুটিগুলো আমরা পেয়েছি, তা উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। সব ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দল একমত নাও হতে পারে। এ জন্য নোট অব ডিসেন্ট দিয়েও একমত হওয়া যায়। আমরা চাই ঐকমত্য কমিশনে যা সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা ডকুমেন্টেড আছে সে ব্যাপারে সুপারিশ করা হোক।”

স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা করা হয় যে, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এর মাধ্যমে কমিশন চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে ঐক্যের পরিবর্তে কার্যত অনৈক্য সৃষ্টি করছে। বিএনপি এখন মনে করছে যে, ঐকমত্য কমিশন, সরকার এবং আরো দু-একটি রাজনৈতিক দল একই পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি সবচেয়ে বড় অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও কমিশনের সুপারিশে তাদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে, বিশেষ করে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সনদে লিপিবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা রাখা হয়নি। এতে বিএনপি বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ।

সভা সূত্রে জানা যায়, স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য গণভোটে পাস হওয়া প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুপারিশকে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান জারীকৃত লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) এবং আইয়ুব খান প্রবর্তিত বেসিক ডেমোক্রেসি বা মৌলিক গণতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি মনে করেন, কমিশনের সুপারিশে দুটি দলের প্রস্তাব এবং ঐকমত্য কমিশনের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার থেকে নির্বাচনের আগে গণভোটের বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে মতামত দিচ্ছেন। বিএনপির অ্যাক্টিভিস্টরা ‘না’ এর পক্ষে কাজ করছেন এবং জামায়াতের অ্যাক্টিভিস্টরা ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে পোস্ট দিচ্ছেন। তবে সার্বিকভাবে, নির্বাচনের আগে গণভোটের বিষয়ে ‘না’ এর পক্ষেই বেশি মতামত দেখা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মন্তব্য করেন, “গণভোট নির্বাচনের আগে হবে বা নির্বাচনের দিন হবে, এটা নিয়ে যে বিরোধ হচ্ছে এটা রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের ব্যাপার। আগে হলে কী হবে আর নির্বাচনের দিন হলে কী হবে, সেটা সাধারণ মানুষ বোঝে না। তবে এটা ঠিক, এতে রাজনৈতিক অনৈক্য বাড়ছে। এতে ফ্যাসিবাদী শক্তির তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে চললে ফ্যাসিবাদী শক্তি ফিরে আসার পথও সৃষ্টি হতে পারে।”

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ড. ইউনূসের বিদায় ও নতুন সরকারের আগমনে ভারতের স্বস্তি এবং প্রত্যাশার দোলাচল

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোট ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র মতভেদ, ধৈর্য দেখাচ্ছে বিএনপি

আপডেট সময় : ১২:০২:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ নভেম্বর ২০২৫

বর্তমানে দেশজুড়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশমালা। বিশেষ করে, সুপারিশকৃত ‘গণভোট’ কবে হবে, এই ইস্যুতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল চাইছে নভেম্বরেই বা জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট আয়োজন করা হোক। অন্যদিকে, দেশের বৃহত্তম দল বিএনপিসহ অন্যান্য অধিকাংশ রাজনৈতিক দল চায়, গণভোটটি জাতীয় নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত হোক। এই মতবিরোধের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বক্তৃতার মঞ্চসহ সর্বত্রই তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলছে।

তবে, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এই পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ ধৈর্য দেখাতে চাইছে। দলটি আপাতত কোনো ধরনের শক্তি প্রদর্শন বা রাজপথের কর্মসূচি দিয়ে দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় না। বিএনপি আশা করছে, প্রধান উপদেষ্টা দেশের বাস্তবতার নিরিখে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। তাদের মতে, শুধু সুপারিশ করলেই সেটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে না, তাই জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনোভাবেই গণভোট মানা হবে না।

বিএনপি মনে করে, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে তারা দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে আসছে এবং এখনো দিচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নিজেদের স্বার্থে প্রশাসনে দলীয়করণ করলেও বিএনপি সেই পথে না হেঁটে দ্রুততম সময়ে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরকার গঠনের কথা বলে আসছে। এ কারণেই বিএনপি সব সময় শান্তি ও চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। তবে দলটি হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যদি কোনো অশুভ পক্ষ দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে বা নির্বাচন বানচাল করতে চায়, তবে বিএনপি বসে থাকবে না এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থে কঠোর কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে বাধ্য হবে।

গত বুধবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশের বিষয়ে মূল আলোচনা হয়। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে উপস্থিত স্থায়ী কমিটির সদস্যরা আপাতত সর্বোচ্চ ধৈর্য দেখানোর বিষয়ে একমত হন। এরপর বৃহস্পতিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও দলের নেতারা একই ইঙ্গিত দেন। তারা বলেন, বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল এবং এই মুহূর্তে তাদের জনসমর্থন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তাদের বড় কর্মসূচিতে লাখ লাখ লোকের সমাগম হতে পারে এবং তারা চাইলেই সারাদেশে বড় ধরনের শোডাউন করতে পারে। কিন্তু নানা মতপার্থক্য তৈরি হওয়া সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করে চলেছে।

স্থায়ী কমিটির সভার সূত্র অনুযায়ী, বিএনপির মূল লক্ষ্য হলো যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া। এ জন্য তারা যতখানি ছাড় দেওয়া সম্ভব, তা দিয়েছে এবং গণভোটসহ অন্যান্য ইস্যুতেও নমনীয় থাকতে চায়। তারা তাদের বক্তব্য আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে নয়, বরং মিডিয়ার মাধ্যমে, বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে, এবং প্রয়োজনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে অনৈক্যের বিষয়গুলো জানাবে। তবে তারা জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট কখনোই মেনে নেবে না; গণভোট হলে তা নির্বাচনের দিনই হতে হবে। যদি নির্বাচনের আগে গণভোটের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তবে বিএনপি আর ধৈর্য ধারণ করবে না।

স্থায়ী কমিটির সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ব্যাপারে জাতির সামনে কমিটমেন্ট দিয়েছেন, আমরা তাতে আস্থা রেখেছি। জাতির স্বার্থে নির্বাচনের দিন গণভোটে আমরা একমত হয়েছি। এর বাইরে অন্য কোনো দিন বা নির্বাচনের আগে আমরা গণভোট মেনে নেব না। আমরা আমাদের মতামত জাতির সামনে তুলে ধরলাম। প্রয়োজনে আমরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে যাব।” তিনি আরও নিশ্চিত করেন, “আমরা কোনো কর্মসূচিতে এখন যাব না। নির্বাচন নিয়ে আমাদের কাছে কোনো ধোঁয়াশা নেই। সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।”

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এই সুপারিশকে উল্লেখ করে বলেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে এটা একটি সুপারিশ। এর মধ্যে যে ত্রুটিগুলো আমরা পেয়েছি, তা উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। সব ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দল একমত নাও হতে পারে। এ জন্য নোট অব ডিসেন্ট দিয়েও একমত হওয়া যায়। আমরা চাই ঐকমত্য কমিশনে যা সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা ডকুমেন্টেড আছে সে ব্যাপারে সুপারিশ করা হোক।”

স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা করা হয় যে, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এর মাধ্যমে কমিশন চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে ঐক্যের পরিবর্তে কার্যত অনৈক্য সৃষ্টি করছে। বিএনপি এখন মনে করছে যে, ঐকমত্য কমিশন, সরকার এবং আরো দু-একটি রাজনৈতিক দল একই পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি সবচেয়ে বড় অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও কমিশনের সুপারিশে তাদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে, বিশেষ করে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সনদে লিপিবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা রাখা হয়নি। এতে বিএনপি বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ।

সভা সূত্রে জানা যায়, স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য গণভোটে পাস হওয়া প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুপারিশকে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান জারীকৃত লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) এবং আইয়ুব খান প্রবর্তিত বেসিক ডেমোক্রেসি বা মৌলিক গণতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি মনে করেন, কমিশনের সুপারিশে দুটি দলের প্রস্তাব এবং ঐকমত্য কমিশনের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার থেকে নির্বাচনের আগে গণভোটের বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে মতামত দিচ্ছেন। বিএনপির অ্যাক্টিভিস্টরা ‘না’ এর পক্ষে কাজ করছেন এবং জামায়াতের অ্যাক্টিভিস্টরা ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে পোস্ট দিচ্ছেন। তবে সার্বিকভাবে, নির্বাচনের আগে গণভোটের বিষয়ে ‘না’ এর পক্ষেই বেশি মতামত দেখা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মন্তব্য করেন, “গণভোট নির্বাচনের আগে হবে বা নির্বাচনের দিন হবে, এটা নিয়ে যে বিরোধ হচ্ছে এটা রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের ব্যাপার। আগে হলে কী হবে আর নির্বাচনের দিন হলে কী হবে, সেটা সাধারণ মানুষ বোঝে না। তবে এটা ঠিক, এতে রাজনৈতিক অনৈক্য বাড়ছে। এতে ফ্যাসিবাদী শক্তির তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে চললে ফ্যাসিবাদী শক্তি ফিরে আসার পথও সৃষ্টি হতে পারে।”