রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য জিএম কাদের নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ পেলেও ভোটারদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর’ হিসেবে পরিচিতি এবং সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তার নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এসব অভিযোগের মুখে তিনি সাধারণ ভোটারের পরিবর্তে পরিচিত মহলে এবং সীমিত পরিসরে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন বলে জানা গেছে। যদিও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা অন্যান্য দলের সঙ্গে সমানতালে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
রংপুর-৩ আসনটি রংপুর সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ চার হাজার ১৩৬ জন এবং ভোটকেন্দ্র ১৬৯টি। পূর্ববর্তী সংসদ নির্বাচনে জিএম কাদের ৮১ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লাসহ অন্যান্য প্রতীকের পাশাপাশি লাঙ্গল প্রতীকের ব্যানার-ফেস্টুন শহরের বিভিন্ন স্থানে শোভা পাচ্ছে। মাইকিংসহ প্রচার কার্যক্রমে কোথাও বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি।
তবে, সদর উপজেলার চন্দনপাঠ ইউনিয়নের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের রাজ মিয়া, রংপুর নগরীর লালবাগ বাজারের মুদি দোকানদার মোকলেসুর রহমান এবং ব্যবসায়ী নেতা গোলাপ হোসেনের মতো স্থানীয়দের অভিযোগ, জিএম কাদের জনগণের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগি করে মন্ত্রী হলেও তিনি এলাকার খোঁজখবর রাখেননি এবং উন্নয়নের বরাদ্দ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেই ভাগ হয়ে গেছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এবার নির্বাচিত হলেও এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এছাড়াও, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ নেওয়াকে তারা নেতিবাচকভাবে দেখছেন।
জুলাই আন্দোলনের এক কর্মী ইমতিয়াজ ইমতি বলেন, যারা জুলাইয়ের পক্ষে আন্দোলন করেছেন, তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট চাইছেন। সেখানে জিএম কাদের ‘না’ এর পক্ষে অবস্থান নিয়ে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তিনি নির্বাচন কমিশনকে জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার এবং তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছিলেন। তার মতে, নির্বাচন কমিশন এই দাবি উপেক্ষা করে জুলাই যোদ্ধাদের অবমাননা করেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণ এখন আওয়ামী লীগের দোসরদের ভোট দেবে না।
অন্যদিকে, জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, তারা মাঠে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন এবং জিএম কাদেরের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, লাঙ্গল প্রতীক বিপুল ভোটে জয়ী হবে।
জাতীয় পার্টির মহানগর কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক লেবু মিয়া জানান, গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে অবস্থান এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও জিএম কাদের নিজেই সেগুলোর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তার দাবি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বা সরকারের কোনো আলোচনায় জাতীয় পার্টিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তিনি বলেন, যেহেতু তাদের কোনো পরামর্শ নেওয়া হয়নি, তাই তারা গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও প্রেসিডিয়াম সদস্য আজমল হোসেন লেবু জানান, নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান রংপুরের সাবেক মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাকে এর প্রধান করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জিএম কাদের নিজেও ভোটারদের কাছে ভোট চাইতে যাচ্ছেন এবং তারা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জিএম কাদের বলেন, তিনি একাধিকবার মন্ত্রী ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই। তিনি সাংবিধানিক অধিকারের ওপর জোর দিয়ে বলেন, সবারই ভোট করার অধিকার আছে এবং তিনি আতঙ্কিত নন। তিনি নির্বাচনী প্রচারে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার আশা প্রকাশ করেন এবং বিপুল ভোটে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বেনজু বলেন, আইনগত বাধা না থাকলে কে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলবে, তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তবে যারা পরিবর্তন চান, তাদের ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষেই থাকা উচিত।
রংপুরের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক এনামুল আহসান জানিয়েছেন, রংপুরের ছয়টি আসনে এখন পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোনো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ব্যানার-ফেস্টুন সংক্রান্ত ত্রুটিগুলো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সরিয়ে দিচ্ছেন এবং নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রিপোর্টারের নাম 






















