ঢাকা ১০:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

ভোটের প্রচারে ভারত নিয়ে নীরব বিএনপি-জামায়াত

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৫৯:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

## বাংলাদেশের নির্বাচন: ভারত ইস্যু কি কৌশলী নীরবতার আড়ালে?

ঢাকা: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। তবে এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ে একটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে – ভারত প্রসঙ্গ। বিগত নির্বাচনগুলোর মতো এবার ভারত ইস্যুটি প্রধান দলগুলোর প্রচারণায় তেমনভাবে স্থান পায়নি, যা অনেককেই বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যারা অতীতে ভারত নীতি নিয়ে সোচ্চার ছিল, এবার এ বিষয়ে কৌশলী নীরবতা অবলম্বন করছে।

নির্বাচনের আর মাত্র আট দিন বাকি, এই পরিস্থিতিতে প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের ভারত নীতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে তারা ভারত ইস্যুতে কোনো কথা বলতে চান না। জামায়াত নেতারা অবশ্য বলেছেন, তারা সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, তাদের পররাষ্ট্রনীতি হলো সব দেশের সঙ্গে সমান সম্মান ও মর্যাদার সম্পর্ক স্থাপন করা, এবং ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তারা একই নীতিতে বিশ্বাসী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান দলগুলোর এই নীরবতা তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। নির্বাচনের আগে ভারত-বিমুখ কোনো মন্তব্য করে তারা কোনো ঝুঁকি তৈরি করতে চাইছে না। তবে, নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা যেকোনো সরকারকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বলে মনে করছেন তারা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও এই নীরবতাকে দুর্ভাগ্যজনক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ভারত ইস্যুতে সুস্পষ্ট অবস্থান না থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হতে পারে।

ভারতের গণমাধ্যম এবং থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর এই ভারত-বিরোধী প্রচারণায় অনুপস্থিতিকে স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখছে। বিএনপির নির্বাচনী স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সমদূরত্ব বজায় রাখার নীতি, এবং জামায়াতের পক্ষ থেকে পাকিস্তান জামায়াতের প্রভাব না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলাদেশে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা, যেমন সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ, বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারণা, এবং বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা, ভারতের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে তেমন কোনো প্রতিবাদ বা বক্তব্য না থাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিস্মিত। তারা মনে করেন, এসব ঘটনা দেশের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানলেও রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

ভারতের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতকে ভারত ইস্যুতে নীরব রাখতে পারা দিল্লির জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। তারা মনে করছে, এই নীরবতা বাংলাদেশের জন্য ভালো বার্তা বহন করে না। ভারত ইতোমধ্যে আগামী নির্বাচিত সরকারকে চাপে ফেলতে প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানা গেছে। গঙ্গার পানিচুক্তি, সীমান্ত নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু ইস্যু, ট্রানজিটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ঢাকা-র উপর চাপ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারতীয় সাংবাদিক নীতিন গোখলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে, বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনী প্রচারে ভারত-বিরোধী কার্ড দেখা যাচ্ছে না। তিনি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং লক্ষ্য করেছেন যে জামায়াত নেতারাও এখন উন্নয়নের কথা বলছেন এবং তাদের উপর পাকিস্তান জামায়াতের কোনো প্রভাব নেই বলে জানাচ্ছেন।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী মনে করেন, দুই দলই ক্ষমতায় যেতে চাইছে এবং ভারত অখুশি হয় এমন কিছু বলে ঝুঁকি তৈরি করতে চাইছে না। তিনি বলেন, ভারত একটি বৃহৎ শক্তি, এবং তাদের সঙ্গে আমাদের ডিল করতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সমমর্যাদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক শাহাব এনাম খান মনে করেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতের আবেদন আগের মতো নেই, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস দিল্লির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে ডিল করার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা আগামী সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে ভারতের পদক্ষেপ সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ভারতের সঙ্গে ডিল করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার উপর জোর দিয়েছেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জনসেবা স্থবির বরিশালে: নির্বাচিত প্রতিনিধি শূন্যতায় চরম দুর্ভোগে নগরবাসী

ভোটের প্রচারে ভারত নিয়ে নীরব বিএনপি-জামায়াত

আপডেট সময় : ০৮:৫৯:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## বাংলাদেশের নির্বাচন: ভারত ইস্যু কি কৌশলী নীরবতার আড়ালে?

ঢাকা: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। তবে এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ে একটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে – ভারত প্রসঙ্গ। বিগত নির্বাচনগুলোর মতো এবার ভারত ইস্যুটি প্রধান দলগুলোর প্রচারণায় তেমনভাবে স্থান পায়নি, যা অনেককেই বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যারা অতীতে ভারত নীতি নিয়ে সোচ্চার ছিল, এবার এ বিষয়ে কৌশলী নীরবতা অবলম্বন করছে।

নির্বাচনের আর মাত্র আট দিন বাকি, এই পরিস্থিতিতে প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের ভারত নীতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে তারা ভারত ইস্যুতে কোনো কথা বলতে চান না। জামায়াত নেতারা অবশ্য বলেছেন, তারা সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, তাদের পররাষ্ট্রনীতি হলো সব দেশের সঙ্গে সমান সম্মান ও মর্যাদার সম্পর্ক স্থাপন করা, এবং ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তারা একই নীতিতে বিশ্বাসী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান দলগুলোর এই নীরবতা তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। নির্বাচনের আগে ভারত-বিমুখ কোনো মন্তব্য করে তারা কোনো ঝুঁকি তৈরি করতে চাইছে না। তবে, নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা যেকোনো সরকারকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বলে মনে করছেন তারা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও এই নীরবতাকে দুর্ভাগ্যজনক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ভারত ইস্যুতে সুস্পষ্ট অবস্থান না থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হতে পারে।

ভারতের গণমাধ্যম এবং থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর এই ভারত-বিরোধী প্রচারণায় অনুপস্থিতিকে স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখছে। বিএনপির নির্বাচনী স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সমদূরত্ব বজায় রাখার নীতি, এবং জামায়াতের পক্ষ থেকে পাকিস্তান জামায়াতের প্রভাব না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলাদেশে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা, যেমন সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ, বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারণা, এবং বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা, ভারতের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে তেমন কোনো প্রতিবাদ বা বক্তব্য না থাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিস্মিত। তারা মনে করেন, এসব ঘটনা দেশের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানলেও রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

ভারতের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতকে ভারত ইস্যুতে নীরব রাখতে পারা দিল্লির জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। তারা মনে করছে, এই নীরবতা বাংলাদেশের জন্য ভালো বার্তা বহন করে না। ভারত ইতোমধ্যে আগামী নির্বাচিত সরকারকে চাপে ফেলতে প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানা গেছে। গঙ্গার পানিচুক্তি, সীমান্ত নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু ইস্যু, ট্রানজিটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ঢাকা-র উপর চাপ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারতীয় সাংবাদিক নীতিন গোখলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে, বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনী প্রচারে ভারত-বিরোধী কার্ড দেখা যাচ্ছে না। তিনি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং লক্ষ্য করেছেন যে জামায়াত নেতারাও এখন উন্নয়নের কথা বলছেন এবং তাদের উপর পাকিস্তান জামায়াতের কোনো প্রভাব নেই বলে জানাচ্ছেন।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী মনে করেন, দুই দলই ক্ষমতায় যেতে চাইছে এবং ভারত অখুশি হয় এমন কিছু বলে ঝুঁকি তৈরি করতে চাইছে না। তিনি বলেন, ভারত একটি বৃহৎ শক্তি, এবং তাদের সঙ্গে আমাদের ডিল করতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সমমর্যাদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক শাহাব এনাম খান মনে করেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতের আবেদন আগের মতো নেই, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস দিল্লির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে ডিল করার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা আগামী সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে ভারতের পদক্ষেপ সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ভারতের সঙ্গে ডিল করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার উপর জোর দিয়েছেন।