ঢাকা ০৩:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

সংকটকালেও নববি নির্দেশ পালনে অবিচল প্রথম খলিফা: উসামার বাহিনীর ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অভিযান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:০০:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাত পরবর্তী সময়ে মুসলিম উম্মাহ যখন এক চরম শোকাবহ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)। নেতৃত্বহীনতার আশঙ্কা আর চারদিকের অনিশ্চয়তাকে জয় করে তিনি খিলাফতের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তবে তার এই দায়িত্ব গ্রহণ কেবল ক্ষমতা পরিচালনা ছিল না, বরং তা ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও নির্দেশনার প্রতি আপসহীন আনুগত্যের এক কঠিন পরীক্ষা। খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা ইসলামের ইতিহাসে আজও এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের মাত্র কয়েক দিন আগে রোমান সাম্রাজ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রিয় নবীর অসুস্থতা ও পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রয়াণের সংবাদে মদিনার উপকণ্ঠ থেকে বাহিনীটি ফিরে আসতে বাধ্য হয়। শোকাতুর মদিনায় যখন চারদিকে বিশৃঙ্খলা ও ধর্মদ্রোহের (ফিতনা) কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিল, তখন আবু বকর (রা.) কোনো দ্বিধা ছাড়াই উসামার সেই বাহিনীকে পুনরায় শাম বা ফিলিস্তিন অভিযানে পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৎকালীন সময়ে রোম সাম্রাজ্য ছিল আরবের জন্য এক বড় হুমকি। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলামের দাওয়াত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে রাসুল (সা.) বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে দূত পাঠিয়েছিলেন। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস সেই দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলে এবং সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি করলে মুসলিমদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা জরুরি হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় মুতা ও তাবুক যুদ্ধের পর ১১ হিজরির সফর মাসে উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে বালকা ও ফিলিস্তিন অভিমুখে অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল।

খলিফা আবু বকর (রা.) দায়িত্বভার গ্রহণের তৃতীয় দিনেই ঘোষণা দেন যে, উসামার বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে জুরফ নামক স্থানে সমবেত হতে হবে এবং পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যপানে অগ্রসর হতে হবে। খলিফা তার প্রথম ভাষণে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, তিনি পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর পথ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হবেন না। তিনি জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “আমি যতক্ষণ সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকব, আপনারা আমার অনুসরণ করবেন; আর যদি আমি ভুল পথে পরিচালিত হই, তবে আমাকে সংশোধন করে দেবেন।”

তবে এই অভিযান নিয়ে তৎকালীন সময়ে জ্যেষ্ঠ সাহাবিদের মধ্যে কিছুটা সংশয় দেখা দিয়েছিল। মদিনার চারদিকে তখন মুরতাদ বা ধর্মত্যাগীদের বিদ্রোহ মাথাচারা দিয়ে উঠছিল। এমতাবস্থায় উসামার বাহিনী মদিনা ত্যাগ করলে শহরের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এমনকি সেনাপতি উসামা (রা.) নিজেও পরিস্থিতি বিবেচনায় উমর (রা.)-এর মাধ্যমে খলিফার কাছে অভিযান স্থগিতের প্রস্তাব পাঠান।

কিন্তু আবু বকর (রা.) ছিলেন তার সিদ্ধান্তে পাহাড়ের মতো অটল। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “আল্লাহর কসম! যদি বন্যপশুও আমাকে ছিঁড়ে খায় কিংবা মদিনা জনশূন্য হয়ে পড়ে, তবুও আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দেওয়া নির্দেশ এবং তাঁর হাতে উত্তোলিত পতাকাকে অবনমিত হতে দেব না।” তার এই অকুতোভয় ঈমানি দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতা শেষ পর্যন্ত সব সাহাবিকে আশ্বস্ত করে।

একপর্যায়ে আনসার সাহাবিদের পক্ষ থেকে উসামা (রা.)-এর অল্প বয়স নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং অভিজ্ঞ কাউকে সেনাপতি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই প্রস্তাবে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন আবু বকর (রা.)। তিনি উমর (রা.)-কে লক্ষ্য করে বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) যাকে সেনাপতি নিযুক্ত করেছেন, তাকে অপসারণ করার অধিকার আমার নেই।” খলিফার এই কঠোর ও নীতিগত অবস্থান প্রমাণ করে যে, সংকট যত বড়ই হোক না কেন, নববি আদর্শ বাস্তবায়নে কোনো আপস চলে না।

পরিশেষে, আবু বকর (রা.)-এর এই দৃঢ় পদক্ষেপ কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল নবপ্রতিষ্ঠিত খিলাফত রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও আদর্শিক ভিত্তির এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। উসামার বাহিনীর এই সফল যাত্রা পরবর্তী সময়ে রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের পথকে প্রশস্ত করেছিল।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আবু সাঈদ হত্যা মামলা: তদন্তে ত্রুটি দেখছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী, রায় ৯ এপ্রিল

সংকটকালেও নববি নির্দেশ পালনে অবিচল প্রথম খলিফা: উসামার বাহিনীর ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অভিযান

আপডেট সময় : ০৬:০০:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাত পরবর্তী সময়ে মুসলিম উম্মাহ যখন এক চরম শোকাবহ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)। নেতৃত্বহীনতার আশঙ্কা আর চারদিকের অনিশ্চয়তাকে জয় করে তিনি খিলাফতের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তবে তার এই দায়িত্ব গ্রহণ কেবল ক্ষমতা পরিচালনা ছিল না, বরং তা ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও নির্দেশনার প্রতি আপসহীন আনুগত্যের এক কঠিন পরীক্ষা। খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা ইসলামের ইতিহাসে আজও এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের মাত্র কয়েক দিন আগে রোমান সাম্রাজ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রিয় নবীর অসুস্থতা ও পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রয়াণের সংবাদে মদিনার উপকণ্ঠ থেকে বাহিনীটি ফিরে আসতে বাধ্য হয়। শোকাতুর মদিনায় যখন চারদিকে বিশৃঙ্খলা ও ধর্মদ্রোহের (ফিতনা) কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিল, তখন আবু বকর (রা.) কোনো দ্বিধা ছাড়াই উসামার সেই বাহিনীকে পুনরায় শাম বা ফিলিস্তিন অভিযানে পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৎকালীন সময়ে রোম সাম্রাজ্য ছিল আরবের জন্য এক বড় হুমকি। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলামের দাওয়াত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে রাসুল (সা.) বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে দূত পাঠিয়েছিলেন। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস সেই দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলে এবং সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি করলে মুসলিমদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা জরুরি হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় মুতা ও তাবুক যুদ্ধের পর ১১ হিজরির সফর মাসে উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে বালকা ও ফিলিস্তিন অভিমুখে অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল।

খলিফা আবু বকর (রা.) দায়িত্বভার গ্রহণের তৃতীয় দিনেই ঘোষণা দেন যে, উসামার বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে জুরফ নামক স্থানে সমবেত হতে হবে এবং পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যপানে অগ্রসর হতে হবে। খলিফা তার প্রথম ভাষণে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, তিনি পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর পথ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হবেন না। তিনি জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “আমি যতক্ষণ সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকব, আপনারা আমার অনুসরণ করবেন; আর যদি আমি ভুল পথে পরিচালিত হই, তবে আমাকে সংশোধন করে দেবেন।”

তবে এই অভিযান নিয়ে তৎকালীন সময়ে জ্যেষ্ঠ সাহাবিদের মধ্যে কিছুটা সংশয় দেখা দিয়েছিল। মদিনার চারদিকে তখন মুরতাদ বা ধর্মত্যাগীদের বিদ্রোহ মাথাচারা দিয়ে উঠছিল। এমতাবস্থায় উসামার বাহিনী মদিনা ত্যাগ করলে শহরের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এমনকি সেনাপতি উসামা (রা.) নিজেও পরিস্থিতি বিবেচনায় উমর (রা.)-এর মাধ্যমে খলিফার কাছে অভিযান স্থগিতের প্রস্তাব পাঠান।

কিন্তু আবু বকর (রা.) ছিলেন তার সিদ্ধান্তে পাহাড়ের মতো অটল। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “আল্লাহর কসম! যদি বন্যপশুও আমাকে ছিঁড়ে খায় কিংবা মদিনা জনশূন্য হয়ে পড়ে, তবুও আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দেওয়া নির্দেশ এবং তাঁর হাতে উত্তোলিত পতাকাকে অবনমিত হতে দেব না।” তার এই অকুতোভয় ঈমানি দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতা শেষ পর্যন্ত সব সাহাবিকে আশ্বস্ত করে।

একপর্যায়ে আনসার সাহাবিদের পক্ষ থেকে উসামা (রা.)-এর অল্প বয়স নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং অভিজ্ঞ কাউকে সেনাপতি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই প্রস্তাবে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন আবু বকর (রা.)। তিনি উমর (রা.)-কে লক্ষ্য করে বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সা.) যাকে সেনাপতি নিযুক্ত করেছেন, তাকে অপসারণ করার অধিকার আমার নেই।” খলিফার এই কঠোর ও নীতিগত অবস্থান প্রমাণ করে যে, সংকট যত বড়ই হোক না কেন, নববি আদর্শ বাস্তবায়নে কোনো আপস চলে না।

পরিশেষে, আবু বকর (রা.)-এর এই দৃঢ় পদক্ষেপ কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না, বরং এটি ছিল নবপ্রতিষ্ঠিত খিলাফত রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও আদর্শিক ভিত্তির এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। উসামার বাহিনীর এই সফল যাত্রা পরবর্তী সময়ে রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের পথকে প্রশস্ত করেছিল।