আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা জমে উঠেছে। এই আবহে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলনের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত দুই মাস, অর্থাৎ ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে, ব্যাংক থেকে সাধারণ মানুষের হাতে নগদ অর্থের সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থীরা তাদের প্রচারণার ব্যয় মেটানোর জন্য ব্যাংক থেকে বড় পরিমাণে অর্থ উত্তোলন করছেন, যা নগদ অর্থের এই আকস্মিক বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে। তবে, যেকোনো ধরনের অবৈধ বা সন্দেহজনক লেনদেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সন্দেহজনক লেনদেন পরিলক্ষিত হলে ব্যাংকগুলোকে তা তাৎক্ষণিকভাবে রিপোর্ট করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি মাসে দেশের মোট প্রচলিত মুদ্রা থেকে ব্যাংকে জমা হওয়া অর্থ বাদ দিয়ে বাজারে প্রচলিত নগদ অর্থের পরিমাণ হালনাগাদ করে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর মাসে বাজারে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লক্ষ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে বাজারে নগদ টাকার পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুলাই মাস থেকে বাজারে নগদ অর্থের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছিল এবং এই ধারা নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। জুলাই মাসে যেখানে বাজারে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লক্ষ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা, সেখানে আগস্টে তা কমে ২ লক্ষ ৭৬ হাজার ৪৯৪ কোটি, সেপ্টেম্বরে ২ লক্ষ ৭৪ হাজার ৭২৪ কোটি এবং অক্টোবরে ২ লক্ষ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচনের আগে বাজারে নগদ অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ, প্রার্থীরা সাধারণত তাদের নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের জন্য নগদ লেনদেন বেশি করে থাকেন। তবে, যদি কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়, তবে ব্যাংকগুলো বিষয়টি বিএফআইইউকে অবহিত করে থাকে।
এদিকে, গত ১১ জানুয়ারি থেকে নগদ অর্থ জমা ও উত্তোলনের উপর তদারকি জোরদার করেছে বিএফআইইউ। সংস্থাটির নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো একটি হিসাবে নির্দিষ্ট দিনে একক বা একাধিক লেনদেনের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা বা তদূর্ধ্ব সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা জমা বা উত্তোলন (অনলাইন, এটিএমসহ যেকোনো ধরনের নগদ লেনদেন) করা হলে, সে সংক্রান্ত প্রতিবেদন (সিটিআর) বিএফআইইউতে জমা দিতে হবে। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই প্রতিবেদন সাপ্তাহিক ভিত্তিতে জমা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলে ব্যর্থতা বা ভুল তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়েও নগদ অর্থ হাতে রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল, তবে তা আসন্ন নির্বাচনের তুলনায় অনেক কম ছিল। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনের আগের দুই মাস, অর্থাৎ নভেম্বর ও ডিসেম্বরে, বাজারে নগদ অর্থ বৃদ্ধি পেয়েছিল ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ডিসেম্বরেই বৃদ্ধি পেয়েছিল ৬ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার (এমএফএস) উপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিকাশ, রকেট, নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার গ্রাহকরা দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করতে পারবেন এবং প্রতিটি লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা হবে এক হাজার টাকা। এছাড়া, ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির হিসাবে টাকা স্থানান্তর সেবা বন্ধ রাখা হবে।
নির্বাচনে অর্থের অপব্যবহার রোধ এবং ভোটারদের প্রভাবিত করার সুযোগ সীমিত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিএফআইইউ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক শীঘ্রই একটি প্রজ্ঞাপন জারি করবে। তবে, টাকার লেনদেনের এই নির্দিষ্ট সীমা কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 





















