বাংলাদেশে প্রস্তাবিত নবম পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দুই থেকে আড়াই গুণ বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বেতন কাঠামোর পরিবর্তনের হারের তুলনায় বাংলাদেশের এই সুপারিশকে নজিরবিহীন এবং অবাস্তব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান কিংবা নেপালে যেখানে বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে বাংলাদেশে ১০০ থেকে প্রায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। পতিত স্বৈরাচারী সরকারের আমলের অবাধ লুটপাট, অর্থ পাচার এবং বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত বাংলাদেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই উচ্চহারে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতের অষ্টম পে কমিশন তাদের নতুন কাঠামোতে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেতন বাড়ানোর প্রাথমিক সুপারিশ করেছে, যা ২০২৭ সালে কার্যকর হতে পারে। এর আগে ২০১৬ সালে তাদের সপ্তম পে কমিশনে বেতন বৃদ্ধি পেয়েছিল মাত্র ২৩.৫ শতাংশ। একইভাবে পাকিস্তানে ২০২৫-২৬ বাজেটে কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানো হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ এবং নেপালে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই বৃদ্ধির হার ছিল ১৫ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে ২০১৫ সালের অষ্টম পে কমিশনেই বেতন বাড়ানো হয়েছিল ৯১ থেকে ১০০ শতাংশ। বর্তমান প্রস্তাব অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সরকারকে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে, যা বর্তমান বাজেটের ওপর এক ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করবে।
অর্থনীতিবিদরা এই সুপারিশের সময়োপযোগিতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সরকার টাকা ছাপিয়ে বা বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে বেতন বাড়াতে পারে না। বাংলাদেশের রাজস্ব আয় জিডিপির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এমন পরিস্থিতিতে এই বিপুল ব্যয় মেটাতে গেলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP) থেকে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হবে। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে। ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং সরকার ব্যাংক খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চহারে বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো এই সুপারিশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ এবং জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ইতোমধ্যে জানিয়েছেন যে, এই বিশাল বোঝা বর্তমান সরকার বহন করবে না এবং এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ এই কৌশলকে ‘অ্যাডভান্স ব্ল্যাকমেইলিং’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমন একটি অসম্ভব প্রস্তাব দিয়ে রাখা হয়েছে যা পরবর্তী নির্বাচিত সরকার বাতিল করলে আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতার মুখে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বর্তমানে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের উপরে এবং বিনিয়োগে চরম স্থবিরতা বিরাজ করছে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ এবং উচ্চ ব্যাংক সুদের হারের এই সময়ে এই ধরনের সুপারিশ অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে, নবম পে কমিশনের এই সুপারিশ কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রস্তাব নয়, বরং এটি আগামীর বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংকটের বীজ বপন করে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
রিপোর্টারের নাম 























