ঢাকা ০৬:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

ক্রিকেট বিতর্কে ভারতের অলিম্পিক স্বপ্ন ফিকে? আইওসির কড়া বার্তা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করা এবং ক্রিকেট ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান টানাপোড়েন ভারতের ২০৩৬ সালের অলিম্পিক আয়োজনের স্বপ্নকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) ক্রীড়াক্ষেত্রে রাজনীতিকরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ভারতের অলিম্পিক আয়োজনের সম্ভাবনার ওপর কঠোর নজর রাখছে।

ঘটনার সূত্রপাত বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে। এর পরপরই নিরাপত্তা ইস্যুতে শঙ্কিত হয়ে ওঠে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ভারত থেকে নিজেদের ম্যাচের ভেন্যু শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের আবেদন জানায় বিসিবি। তবে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসি সেই আবেদনে কর্ণপাত না করে উল্টো ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়। নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থেকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দেয় পাকিস্তানও, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন এক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এদিকে, আইসিসির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটি নিজেদের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নেওয়ার দাবি করলেও, অতীতে সম্প্রচার ও আর্থিক স্বার্থে ভারতের পক্ষে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহর সঙ্গে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জয় শাহ পূর্বে বিসিসিআইয়ের সচিব ছিলেন এবং তার বাবা অমিত শাহ বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়া, আইসিসির প্রধান নির্বাহী সঞ্জগ গুপ্ত একসময় জিও স্টারের স্পোর্টস ও লাইভ এক্সপেরিয়েন্সেস বিভাগের সিইও ছিলেন, যে সংস্থাটি ভারতে সব আইসিসি ইভেন্টের একচেটিয়া টিভি সম্প্রচার স্বত্বের অধিকারী। এসব বিষয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই দিল্লিতে ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমস আয়োজন নিশ্চিত হলেও আহমেদাবাদে ২০৩৬ সালের অলিম্পিক আয়োজন নিয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কঠোর নজরদারির মুখে পড়েছে ভারত। এই আয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের অন্যতম বড় প্রতিদ্বন্দ্বী কাতার।

আইওসি ক্রীড়াক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে সব সময় ‘জিরো টলারেন্স’নীতিতে চলে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশগুলোর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের আশঙ্কা থাকলে ভারতের পক্ষে অলিম্পিক আয়োজন স্রেফ আকাশকুসুম কল্পনা। অলিম্পিক চার্টার অনুযায়ী, ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে বাইরের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে তাদের নিয়ম ও শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি অলিম্পিকের ৫০.২ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে—খেলায় রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতপ্রকাশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, গত অক্টোবরে জাকার্তায় বিশ্ব আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ইসরায়েলি দলের ভিসা দিতে অস্বীকার করায় ইন্দোনেশিয়াকে ২০২৬ অলিম্পিক আয়োজনের দৌড় থেকেই ছিটকে যেতে হয়েছিল।

ভারতের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে অলিম্পিকে ক্রিকেটের অন্তর্ভুক্তি। কারণ, ১২৬ বছর পর অলিম্পিকে ফিরছে ক্রিকেট। ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের পর ২০৩২ ব্রিসবেন এবং ২০৩৬ সালের আসরেও ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ভারতীয় বাজারকে লক্ষ্য করেই ক্রিকেটকে অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে আইওসি। ফলে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে এই আন্তর্জাতিক টানাপোড়েনে বেশ চাপে পড়েছে ভারত।

ভারত-বাংলাদেশ দ্বন্দ্বের আগে থেকেই ক্রীড়াক্ষেত্রে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ বহমান। গত বছর পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারত খেলতে অস্বীকার করলে, পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ভারতে যেতে অস্বীকার করে পাকিস্তান। ফলে পাকিস্তানের ম্যাচগুলো হবে শ্রীলঙ্কায়। উল্লেখ্য, দুই দেশ এখন আর দ্বিপাক্ষিক সিরিজও খেলে না। এ বিষয়টিও নজরে রেখেছে অলিম্পিকের সর্বোচ্চ সংস্থা। ফলে ভারতের প্রতি আইওসির স্পষ্ট বার্তা, অলিম্পিকের আয়োজক হতে হলে পাকিস্তানকে ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখাতেই হবে। অন্যথায় ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ আয়োজনের স্বপ্ন তাদের জন্য অধরাই থেকে যাবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে হামলায় নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেবে না স্পেন

ক্রিকেট বিতর্কে ভারতের অলিম্পিক স্বপ্ন ফিকে? আইওসির কড়া বার্তা

আপডেট সময় : ০৯:২৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করা এবং ক্রিকেট ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান টানাপোড়েন ভারতের ২০৩৬ সালের অলিম্পিক আয়োজনের স্বপ্নকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) ক্রীড়াক্ষেত্রে রাজনীতিকরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ভারতের অলিম্পিক আয়োজনের সম্ভাবনার ওপর কঠোর নজর রাখছে।

ঘটনার সূত্রপাত বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে। এর পরপরই নিরাপত্তা ইস্যুতে শঙ্কিত হয়ে ওঠে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ভারত থেকে নিজেদের ম্যাচের ভেন্যু শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরের আবেদন জানায় বিসিবি। তবে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসি সেই আবেদনে কর্ণপাত না করে উল্টো ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়। নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থেকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দেয় পাকিস্তানও, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন এক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এদিকে, আইসিসির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটি নিজেদের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নেওয়ার দাবি করলেও, অতীতে সম্প্রচার ও আর্থিক স্বার্থে ভারতের পক্ষে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহর সঙ্গে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জয় শাহ পূর্বে বিসিসিআইয়ের সচিব ছিলেন এবং তার বাবা অমিত শাহ বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়া, আইসিসির প্রধান নির্বাহী সঞ্জগ গুপ্ত একসময় জিও স্টারের স্পোর্টস ও লাইভ এক্সপেরিয়েন্সেস বিভাগের সিইও ছিলেন, যে সংস্থাটি ভারতে সব আইসিসি ইভেন্টের একচেটিয়া টিভি সম্প্রচার স্বত্বের অধিকারী। এসব বিষয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই দিল্লিতে ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমস আয়োজন নিশ্চিত হলেও আহমেদাবাদে ২০৩৬ সালের অলিম্পিক আয়োজন নিয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কঠোর নজরদারির মুখে পড়েছে ভারত। এই আয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের অন্যতম বড় প্রতিদ্বন্দ্বী কাতার।

আইওসি ক্রীড়াক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে সব সময় ‘জিরো টলারেন্স’নীতিতে চলে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশগুলোর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের আশঙ্কা থাকলে ভারতের পক্ষে অলিম্পিক আয়োজন স্রেফ আকাশকুসুম কল্পনা। অলিম্পিক চার্টার অনুযায়ী, ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে বাইরের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে তাদের নিয়ম ও শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি অলিম্পিকের ৫০.২ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে—খেলায় রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতপ্রকাশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, গত অক্টোবরে জাকার্তায় বিশ্ব আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ইসরায়েলি দলের ভিসা দিতে অস্বীকার করায় ইন্দোনেশিয়াকে ২০২৬ অলিম্পিক আয়োজনের দৌড় থেকেই ছিটকে যেতে হয়েছিল।

ভারতের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে অলিম্পিকে ক্রিকেটের অন্তর্ভুক্তি। কারণ, ১২৬ বছর পর অলিম্পিকে ফিরছে ক্রিকেট। ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের পর ২০৩২ ব্রিসবেন এবং ২০৩৬ সালের আসরেও ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ভারতীয় বাজারকে লক্ষ্য করেই ক্রিকেটকে অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে আইওসি। ফলে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে এই আন্তর্জাতিক টানাপোড়েনে বেশ চাপে পড়েছে ভারত।

ভারত-বাংলাদেশ দ্বন্দ্বের আগে থেকেই ক্রীড়াক্ষেত্রে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ বহমান। গত বছর পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারত খেলতে অস্বীকার করলে, পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ভারতে যেতে অস্বীকার করে পাকিস্তান। ফলে পাকিস্তানের ম্যাচগুলো হবে শ্রীলঙ্কায়। উল্লেখ্য, দুই দেশ এখন আর দ্বিপাক্ষিক সিরিজও খেলে না। এ বিষয়টিও নজরে রেখেছে অলিম্পিকের সর্বোচ্চ সংস্থা। ফলে ভারতের প্রতি আইওসির স্পষ্ট বার্তা, অলিম্পিকের আয়োজক হতে হলে পাকিস্তানকে ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখাতেই হবে। অন্যথায় ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ আয়োজনের স্বপ্ন তাদের জন্য অধরাই থেকে যাবে।