ঢাকা ০২:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬

দারিদ্র্য বিমোচনে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ: বছরে ১ লাখ কোটি টাকা সংগ্রহের সম্ভাবনা

দেশে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি শক্তিশালী যাকাত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ কোটি টাকার যাকাত সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিশাল অর্থ সুপরিকল্পিতভাবে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করা গেলে দেশের প্রায় চার কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব।

শনিবার রাজধানীর বেইলি রোডে অফিসার্স ক্লাবে আয়োজিত ‘চতুর্দশ যাকাত ফেয়ার-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টের (সিজেডএম) উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিজেডএম-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, যাকাত কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। ইসলামের ইতিহাসে দীর্ঘকাল যাকাত রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগ্রহ ও বিতরণ করা হতো। কিন্তু ব্রিটিশ ও মুঘল আমল থেকে এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে আসায় এর সামষ্টিক সুফল ব্যাহত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে সরকারিভাবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে যাকাত বোর্ড থাকলেও সেখান থেকে বছরে মাত্র ১১ কোটি টাকার মতো সংগৃহীত হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। অথচ সঠিকভাবে হিসাব করলে দেশে বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার যাকাত আহরণ সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, সামর্থ্যবানদের জন্য যাকাত প্রদান করা কোনো দয়া নয়, বরং এটি দরিদ্রদের অধিকার। যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যাকাত দেন না, তাদের ঈমানি চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ। এই অর্থ যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানবকল্যাণে ব্যয় করা যায়, তবে অভাবের তাড়নায় মানুষকে আর অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে হবে না।

সভাপতির বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্ব এক গভীর দার্শনিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। যাকাত দেওয়ার পর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং এই অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি যাকাতকে একটি জীবিকাভিত্তিক প্রকল্পের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানে সিজেডএম-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ যাকাতের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়। অনেকেই যাকাতের সঠিক নিয়ম বা হিসাব জানেন না। ব্যক্তিগতভাবে যাকাত দেওয়ার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর। যাকাত ফেয়ারের মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের মধ্যে এই সচেতনতা তৈরি করা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ‘ইসলামিক সামাজিক অর্থায়ন: ভবিষ্যৎ পথনির্দেশিকা’ শীর্ষক একটি বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে যাকাত ও ওয়াকফ থেকে সংগৃহীত আয় জিডিপির প্রায় ১.৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যা টাকার অঙ্কে দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি। এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি পৃথক ‘ইসলামিক সোশ্যাল ফাইন্যান্স মিনিস্ট্রি’ বা মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনীতিতে যাকাতের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক গাইডলাইনের অভাবে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সরকার যদি যাকাত আদায়ে স্বচ্ছ ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করে, তবে এটি দারিদ্র্য বিমোচনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।

উল্লেখ্য, এবারের যাকাত ফেয়ারে বিভিন্ন যাকাত ও দাতব্য সংস্থা এবং ইসলামিক প্রকাশনীসহ মোট ২৫টি স্টল অংশ নিয়েছে। মেলায় যাকাত আদায়ের নিয়ম ও এর সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক যাকাত ব্যবস্থা গড়ে উঠলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সপ্তাহান্তে বৃষ্টিতে ভিজবে দেশের পাঁচ বিভাগ: আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস

দারিদ্র্য বিমোচনে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ: বছরে ১ লাখ কোটি টাকা সংগ্রহের সম্ভাবনা

আপডেট সময় : ১০:৫৬:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

দেশে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি শক্তিশালী যাকাত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ কোটি টাকার যাকাত সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিশাল অর্থ সুপরিকল্পিতভাবে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করা গেলে দেশের প্রায় চার কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব।

শনিবার রাজধানীর বেইলি রোডে অফিসার্স ক্লাবে আয়োজিত ‘চতুর্দশ যাকাত ফেয়ার-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টের (সিজেডএম) উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিজেডএম-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, যাকাত কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। ইসলামের ইতিহাসে দীর্ঘকাল যাকাত রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগ্রহ ও বিতরণ করা হতো। কিন্তু ব্রিটিশ ও মুঘল আমল থেকে এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে আসায় এর সামষ্টিক সুফল ব্যাহত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে সরকারিভাবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে যাকাত বোর্ড থাকলেও সেখান থেকে বছরে মাত্র ১১ কোটি টাকার মতো সংগৃহীত হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। অথচ সঠিকভাবে হিসাব করলে দেশে বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার যাকাত আহরণ সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, সামর্থ্যবানদের জন্য যাকাত প্রদান করা কোনো দয়া নয়, বরং এটি দরিদ্রদের অধিকার। যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যাকাত দেন না, তাদের ঈমানি চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ। এই অর্থ যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানবকল্যাণে ব্যয় করা যায়, তবে অভাবের তাড়নায় মানুষকে আর অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে হবে না।

সভাপতির বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্ব এক গভীর দার্শনিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। যাকাত দেওয়ার পর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং এই অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি যাকাতকে একটি জীবিকাভিত্তিক প্রকল্পের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানে সিজেডএম-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ যাকাতের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়। অনেকেই যাকাতের সঠিক নিয়ম বা হিসাব জানেন না। ব্যক্তিগতভাবে যাকাত দেওয়ার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর। যাকাত ফেয়ারের মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের মধ্যে এই সচেতনতা তৈরি করা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ‘ইসলামিক সামাজিক অর্থায়ন: ভবিষ্যৎ পথনির্দেশিকা’ শীর্ষক একটি বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে যাকাত ও ওয়াকফ থেকে সংগৃহীত আয় জিডিপির প্রায় ১.৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যা টাকার অঙ্কে দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি। এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি পৃথক ‘ইসলামিক সোশ্যাল ফাইন্যান্স মিনিস্ট্রি’ বা মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনীতিতে যাকাতের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক গাইডলাইনের অভাবে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সরকার যদি যাকাত আদায়ে স্বচ্ছ ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করে, তবে এটি দারিদ্র্য বিমোচনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।

উল্লেখ্য, এবারের যাকাত ফেয়ারে বিভিন্ন যাকাত ও দাতব্য সংস্থা এবং ইসলামিক প্রকাশনীসহ মোট ২৫টি স্টল অংশ নিয়েছে। মেলায় যাকাত আদায়ের নিয়ম ও এর সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক যাকাত ব্যবস্থা গড়ে উঠলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।