বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ‘টাইম টু মার্কেট’ বা পণ্য উৎপাদনে দীর্ঘসূত্রতার সংকট কাটাতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কাস্টমস-মুক্ত ‘ফ্রি ট্রেড জোন’ (FTZ) গঠনের পরিকল্পনায় নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটির (বেজা) গভর্নিং বোর্ড। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও শুল্ক বাধার অবসান ঘটবে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বেজার গভর্নিং বোর্ড সভায় এই নীতিগত সিদ্ধান্তটি অনুমোদন করা হয়। বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।
ফ্রি ট্রেড জোনের সুবিধা ও গুরুত্ব: আশিক চৌধুরী জানান, ফ্রি ট্রেড জোন হবে এমন একটি বিশেষায়িত এলাকা যা ভৌগোলিকভাবে দেশের ভেতরে হলেও কার্যত কাস্টমস টেরিটরির বাইরে বলে বিবেচিত হবে। এখানে কোনো প্রকার শুল্ক বা জটিল কাস্টমস পদ্ধতি ছাড়াই বিদেশি কাঁচামাল আমদানি, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তৃতীয় দেশে পুনঃরপ্তানি (রি-এক্সপোর্ট) করা যাবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বিদেশ থেকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা বা অন্যান্য কাঁচামাল আনতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। এতে সঠিক সময়ে ক্রেতাদের ডেলিভারি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফ্রি ট্রেড জোনে আগে থেকেই কাঁচামাল মজুত রাখার সুবিধা থাকলে ‘টাইম টু মার্কেট’ সমস্যার একটি কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান মিলবে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রাথমিক প্রকল্প: সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা এলাকায় প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ একর জমির ওপর এই ফ্রি ট্রেড জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং বন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় আনোয়ারাকৈ এই প্রকল্পের জন্য আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। বৈশ্বিক উদাহরণ হিসেবে দুবাইয়ের বিখ্যাত ‘জেবেল আলি ফ্রি জোন’-এর মডেল অনুসরণ করার ইঙ্গিত দেন আশিক চৌধুরী। উল্লেখ্য, দুবাইয়ের সেই জোন থেকে বছরে প্রায় ১৯০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়, যা পুরো দুবাইয়ের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: সরকার আশা করছে, এই কাস্টমস-মুক্ত জোন বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে বিদ্যমান কাস্টমস আইন, বিনিয়োগ নীতি এবং বিভিন্ন বিধিনিয়মে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও সংশোধন আনতে হবে। আশিক চৌধুরী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই প্রকল্পের প্রাথমিক অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে। এতে করে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বাংলাদেশের সক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
রিপোর্টারের নাম 























