ঢাকা ০৯:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রবাসীদের বিশেষ প্রণোদনা: সরকারের নীতিগত অনুমোদন

দেশের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়াতে এক যুগান্তকারী নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা (এনআরবি) দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সহায়তা করলে একটি নির্দিষ্ট হারে নগদ প্রণোদনা পাবেন। সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) গভর্নিং বোর্ডের এক সভায় এই সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সভা শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুদূরপ্রসারী নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে দেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। অনুমোদিত প্রস্তাবনা অনুযায়ী, কোনো প্রবাসী যদি দেশে ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে ভূমিকা রাখেন, তবে তিনি সেই বিনিয়োগের ওপর ১.২৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা পাবেন। এটি প্রবাসীদের জন্য এক ধরনের স্বীকৃতি, যা বর্তমানে রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নগদ প্রণোদনার মতোই কাজ করবে।

চৌধুরী আশিক মাহমুদ আরও বলেন, ব্যক্তিগত ভোগের জন্য অর্থ পাঠানোর পরিবর্তে যারা দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আনবেন, এই নীতির মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো প্রবাসী যদি ১০ কোটি ডলারের ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে সহায়তা করেন, তাহলে সরকার তাকে ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার প্রণোদনা দেবে। তিনি যুক্তি দেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের বসবাসরত দেশগুলোর সমাজ ও বিনিয়োগ মহলের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। এই সংযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরাই সরকারের উদ্দেশ্য।

নীতিগত অনুমোদন পেলেও, এই প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার আগে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা জানিয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, বিদেশে বিডার নিজস্ব কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে চীনে একটি অফিস খোলা হবে। এরপর দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি দেশেও অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব অফিসে স্থায়ী বেতনভুক্ত কর্মীর পরিবর্তে কমিশন বা পরিবর্তনশীল পারিশ্রমিক ব্যবস্থায় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। বিনিয়োগ আকর্ষণের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই তাদের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হবে। চীনের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষা ও বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞ চীনা নাগরিকদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

চৌধুরী আশিক মাহমুদ আরও জানান, দেশের ছয়টি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাকে একীভূত করে একটি একক কাঠামোর আওতায় আনার রোডম্যাপও সরকার অনুমোদন করেছে। ‘সিঙ্গেল আমব্রেলা’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থার অধীনে বিডা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা), হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) – এই ছয়টি সংস্থা একীভূত হবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, বর্তমানে প্রতিটি সংস্থার গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে সরকার প্রধান থাকায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। অতীতে এসব সংস্থার বোর্ড সভা গড়ে পাঁচ বছরে একবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। একীভূত কাঠামোর মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। আদর্শগতভাবে প্রতি ছয় মাস অন্তর বোর্ড সভা হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় কোনো সংস্থাকে বাড়তি সুবিধা না দিতে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নীতিগত অনুমোদন পেলেও, আইনগত ও কাঠামোগত বাস্তবায়নের কাজ পরবর্তী সরকারের সময়ে সম্পন্ন হবে বলে জানানো হয়। আপাতত নতুন সংস্থার নকশা ও কাঠামো তৈরির কাজই অগ্রাধিকার পাবে।

এ ছাড়া, বিডার কার্যপরিধির আওতায় বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক নির্দেশনাও বোর্ড অনুমোদন দিয়েছে। আগে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকলেও, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কমিশন ভিত্তিতে বিনিয়োগ ব্যাংক নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণের পথ সুগম করা হবে বলে জানান বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান।

ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তারাগঞ্জে পাচারকালে ৪০০ লিটার পেট্রোল জব্দ, আটক ১

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রবাসীদের বিশেষ প্রণোদনা: সরকারের নীতিগত অনুমোদন

আপডেট সময় : ০৯:০৫:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়াতে এক যুগান্তকারী নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা (এনআরবি) দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সহায়তা করলে একটি নির্দিষ্ট হারে নগদ প্রণোদনা পাবেন। সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) গভর্নিং বোর্ডের এক সভায় এই সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সভা শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুদূরপ্রসারী নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে দেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। অনুমোদিত প্রস্তাবনা অনুযায়ী, কোনো প্রবাসী যদি দেশে ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে ভূমিকা রাখেন, তবে তিনি সেই বিনিয়োগের ওপর ১.২৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা পাবেন। এটি প্রবাসীদের জন্য এক ধরনের স্বীকৃতি, যা বর্তমানে রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নগদ প্রণোদনার মতোই কাজ করবে।

চৌধুরী আশিক মাহমুদ আরও বলেন, ব্যক্তিগত ভোগের জন্য অর্থ পাঠানোর পরিবর্তে যারা দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আনবেন, এই নীতির মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো প্রবাসী যদি ১০ কোটি ডলারের ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে সহায়তা করেন, তাহলে সরকার তাকে ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার প্রণোদনা দেবে। তিনি যুক্তি দেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের বসবাসরত দেশগুলোর সমাজ ও বিনিয়োগ মহলের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। এই সংযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরাই সরকারের উদ্দেশ্য।

নীতিগত অনুমোদন পেলেও, এই প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার আগে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা জানিয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, বিদেশে বিডার নিজস্ব কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে চীনে একটি অফিস খোলা হবে। এরপর দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি দেশেও অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব অফিসে স্থায়ী বেতনভুক্ত কর্মীর পরিবর্তে কমিশন বা পরিবর্তনশীল পারিশ্রমিক ব্যবস্থায় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। বিনিয়োগ আকর্ষণের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই তাদের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হবে। চীনের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষা ও বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞ চীনা নাগরিকদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

চৌধুরী আশিক মাহমুদ আরও জানান, দেশের ছয়টি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাকে একীভূত করে একটি একক কাঠামোর আওতায় আনার রোডম্যাপও সরকার অনুমোদন করেছে। ‘সিঙ্গেল আমব্রেলা’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থার অধীনে বিডা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা), হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) – এই ছয়টি সংস্থা একীভূত হবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, বর্তমানে প্রতিটি সংস্থার গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে সরকার প্রধান থাকায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। অতীতে এসব সংস্থার বোর্ড সভা গড়ে পাঁচ বছরে একবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। একীভূত কাঠামোর মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। আদর্শগতভাবে প্রতি ছয় মাস অন্তর বোর্ড সভা হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় কোনো সংস্থাকে বাড়তি সুবিধা না দিতে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের পরামর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নীতিগত অনুমোদন পেলেও, আইনগত ও কাঠামোগত বাস্তবায়নের কাজ পরবর্তী সরকারের সময়ে সম্পন্ন হবে বলে জানানো হয়। আপাতত নতুন সংস্থার নকশা ও কাঠামো তৈরির কাজই অগ্রাধিকার পাবে।

এ ছাড়া, বিডার কার্যপরিধির আওতায় বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক নির্দেশনাও বোর্ড অনুমোদন দিয়েছে। আগে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকলেও, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কমিশন ভিত্তিতে বিনিয়োগ ব্যাংক নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি সম্পদ বেসরকারিকরণের পথ সুগম করা হবে বলে জানান বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান।

ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।