দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে আসছেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। শনিবার সন্ধ্যায় তাঁর আগমনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামজুড়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। দলের শীর্ষ নেতাকে কাছ থেকে দেখার জন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে এক অন্যরকম উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, রবিবার পলোগ্রাউন্ডে আয়োজিত জনসমাবেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষের সমাগম ঘটাতে তারা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এই সমাবেশকে স্মরণীয় করে তুলতে গত এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন স্তরে সমন্বিতভাবে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ নগর, উত্তর, দক্ষিণ জেলা, কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলার নেতৃবৃন্দ এই পরিকল্পনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে বিএনপির বিজয়ের সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করতে তারেক রহমানের এই সফরকে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে দেখছেন।
দলীয় সূত্রমতে, শনিবার সন্ধ্যায় তারেক রহমান ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। সেখান থেকে তিনি নগরীর কাজীর দেউড়িস্থ পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু বে ভিউতে অবস্থান নেবেন। সেখানে রাত্রিযাপন শেষে রবিবার সকাল নয়টায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করবেন তিনি। এই সেমিনারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরা অংশ নেবেন। এরপর সকাল সাড়ে এগারোটা থেকে পৌনে বারোটার মধ্যে তিনি পলোগ্রাউন্ডে পৌঁছাবেন এবং সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন।
রবিবার দুপুর বারোটার মধ্যে চট্টগ্রামের জনসমাবেশ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তিনি ফেনীর উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। তাঁর যাত্রাপথে মহাসড়কের দুই পাশে হাজার হাজার নেতাকর্মী ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে রবিবার সকাল আটটা থেকেই চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা, কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলা থেকে নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করবেন।
এই জনসমাবেশের সার্বিক সমন্বয় করছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তারেক রহমানের আগমনের প্রাক্কালে নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এবং সদস্য সচিব নাজিমুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল শনিবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন (সিএমপি) কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সমাবেশে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে সিএমপি কর্তৃপক্ষ তাঁদের আশ্বস্ত করেছে। নেতাকর্মীদের যাতায়াত ও গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য সিআরবি’র খালি জায়গা এবং আশেপাশের সড়কের পাশে স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।
শনিবার সরেজমিনে পলোগ্রাউন্ড মাঠে দেখা গেছে, তারেক রহমানের জন্য প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ একটি মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। বাঁশ, কাঠ ও স্টিল ব্যবহার করে সাত ফুট উচ্চতা এবং ৬০ ফুট প্রস্থের এই মঞ্চের অবকাঠামো শুক্রবার সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার দুপুরের মধ্যে মঞ্চে লাল গালিচা বিছানো, বসার জন্য সোফা, ফ্যান, সাউন্ড সিস্টেম, ব্যানারসহ অন্যান্য সাজসজ্জার কাজ শেষ হয়েছে। শ্রমিকরা নিবিড়ভাবে কাজগুলো তদারকি করছেন যাতে কোনো ত্রুটি না থাকে। এছাড়াও পলোগ্রাউন্ড এবং নগরীর টাইগারপাস, কদমতলী, সিআরবি সাত রাস্তার মাথায় প্রায় ২০০টি মাইক স্থাপন করা হয়েছে। মঞ্চে ১০টি সাউন্ড সিস্টেম বসানো হয়েছে। মঞ্চ এলাকাকে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার পরে ‘ইয়োলো জোন’ এবং ‘গ্রীন জোন’ রাখা হয়েছে। তারেক রহমানের বক্তব্য দেওয়ার সুবিধার্থে মঞ্চের সামনের অংশে পর্যাপ্ত খালি জায়গা রাখা হয়েছে। জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং ১৬টি আসনের প্রার্থীরা মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
নগরের টাইগারপাসের দ্বি-তল সড়ক এবং আশেপাশের দেয়ালগুলো নতুন রঙে সেজে উঠেছে। নগরীর প্রধান প্রধান মোড়গুলোতে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রার্থীরা বিলবোর্ড স্থাপন করেছেন।
এদিকে, তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম নগরীতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, মহিলাদল, কৃষকদলসহ বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে বাড়তি উৎসাহ নিয়ে অংশ নিচ্ছেন। একইসাথে নির্বাচনী প্রচারণাও গতি পেয়েছে। অনেক নেতাকর্মী বিভিন্ন রঙের টি-শার্ট ছাপিয়ে সংগ্রহ করছেন এবং নিজেদের মধ্যে বিতরণ করছেন। কেউ কেউ জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত বিশেষ ক্যাপ তৈরি করছেন। অনেকে প্ল্যাকার্ড ও বিলবোর্ড তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছেন। এছাড়াও কর্মীদের জন্য শরবত, পানি ও খাবারের আয়োজনও চলছে।
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল আলম জানিয়েছেন, ওয়ার্ড ও কলেজ পর্যায় থেকে প্রায় ১৫ হাজার নেতাকর্মী সমাবেশে যোগ দেবেন। এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকেও হাজার হাজার নেতাকর্মী আসবেন। তারা বিভিন্ন রঙের ক্যাপ ও টি-শার্ট তৈরি করেছেন এবং সকলের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘জিয়া পরিবারের প্রতি চট্টগ্রামের একটি বিশেষ আবেগ রয়েছে এবং আমরাও প্রতিবার তাঁদের আন্তরিকভাবে বরণ করে নিই। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।’
নগর বিএনপি সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, ‘১০ লাখ মানুষের সমাগম ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমাদের চারটি কমিটি সমাবেশ সফল করতে দিন-রাত পরিশ্রম করছে। আমরা চাই এই সমাবেশকে একটি স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারেক রহমানের দুই দশকেরও বেশি সময় পর চট্টগ্রামে আগমন। তাঁকে দেখতে মানুষ উন্মুখ হয়ে আছে। চট্টগ্রামের ঘরে ঘরে আজ উৎসবের হাওয়া বইছে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ প্রস্তুতি:
নগর পুলিশের মুখপাত্র (সহকারী পুলিশ কমিশনার-জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ জানিয়েছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় থাকবে। পাশাপাশি পুলিশ, র্যাব এবং সেনাবাহিনীও মোতায়েন থাকবে। শনিবার থেকেই টহল শুরু হয়েছে। সমাবেশের ভেতরে সাদা পোশাকে পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া, সমাবেশ এলাকার আশেপাশে পরিস্থিতি বিবেচনায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে। বহুতল ভবনগুলো থেকেও নজরদারি রাখা হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























