ঢাকা ০২:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে ঐকমত্য কমিশনের শেষ বৈঠক, মঙ্গলবার সুপারিশ পেশ

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ তুলে দিতে যাচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এই সুপারিশ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে।

সুপারিশ হস্তান্তরের সময় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরাও উপস্থিত থাকবেন।

এর আগে সোমবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে কমিশনের শেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, কমিশন সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।

এই সমাপনী বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠনের শুরু থেকে চূড়ান্ত সুপারিশ দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের ডকুমেন্ট, আলোচনার ভিডিও, অডিও এবং ছবি যত্ন করে সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এগুলো মহামূল্যবান সম্পদ। একটা জাতি হিসেবে আমরা কোন পরিস্থিতিতে, কী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম, তা সবার জন্য দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা এবং উন্মুক্ত রাখা দরকার। যতগুলো বৈঠক হয়েছে, তার ছবি ও ভিডিও, যত চিঠি চালাচালি হয়েছে—সবকিছু সংরক্ষণ করতে হবে এবং বিষয়ভিত্তিক ভাগ করে (ক্যাটাগরি) রাখতে হবে। টেলিভিশনে যে আলোচনাগুলো সরাসরি প্রচার হয়েছে, সেগুলোও খণ্ড খণ্ড আকারে সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ, এগুলোই হবে ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।’

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘যারা গবেষণা করতে চান, তারা যেন এগুলো দেখে কাজে লাগাতে পারেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ডকুমেন্টগুলো থেকে যাবে। এই দলিলগুলোই ভবিষ্যতে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।’

এসময় প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দল, ঐকমত্য কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, গবেষক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বৈঠকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি অন্যান্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নেও সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কমিশন সদস্যরা আহ্বান জানান।

কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বাংলাদেশে একটি স্থায়ী জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরির জন্য কাজ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি আইন বিশেষজ্ঞ, বিচারপতি, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘গত জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, তার তিনটি মূল দায়িত্বের (বিচার, সংস্কার, নির্বাচন) মধ্যে একটি হলো কাঠামোগত সংস্কার। এই সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করাই ছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান কাজ। দলগুলোর মধ্যে মিল-অমিল থাকার পরেও সংস্কারের প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট ছিল। তারা সবসময় আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন এবং দিনের পর দিন ধৈর্য ধরে বিচক্ষণতার সাথে সংলাপে অংশ নিয়েছেন।’

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘জুলাইয়ের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণ-অভ্যুত্থান আমাদের যে সুযোগ করে দিয়েছে, তা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি। কমিশন সংস্কারকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে জনগণ কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখতে পায়। কমিশন তার দায়িত্ব শেষ করেছে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সুপারিশ হস্তান্তর করা হবে। কমিশনের মেয়াদ ৩১ অক্টোবর শেষ হলেও, সরকারের প্রয়োজনে এ দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।’

নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও কমিশন সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সবাই সরকারের আন্তরিকতা ও সাহসিকতা দেখতে চায়। গণ-অভ্যুত্থানে যে তাজা প্রাণগুলো ঝরে গেল, যত মানুষ আহত হলো, তা মনে রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যেন এই সুযোগ না হারাই।’

কমিশন সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐক্য দেখা গিয়েছিল, ঠিক একই রকম আন্তরিকতার প্রতিফলন কমিশনের বৈঠকগুলোতেও ছিল। এটা খুবই ইতিবাচক একটা দিক।’

পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান ও কমিশন সদস্য সফর রাজ বলেন, ‘এই প্রথম রাজনৈতিক দলগুলো এক টেবিলে বসে ধৈর্যের সাথে আলোচনা করেছে। ভবিষ্যতেও যেন এই ধরনের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও কমিশন সদস্য ড. ইফতেখারুজ্জামান ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি দুদক সংস্কারেও সরকারকে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ‘আমরা যতগুলো শহীদ পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, সংস্কার নিশ্চিত করা না গেলে তাদের সন্তানদের এই আত্মত্যাগ বৃtha যাবে। জুলাইয়ে যারা জীবন দিলেন, তারাই এই সংস্কারের মূল ভিত্তি।’

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শহীদ ওসমান হাদির স্মরণে আলিয়ার দেয়ালে গ্রাফিতি: বিচারের দাবিতে সোচ্চার শিক্ষার্থীরা

প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে ঐকমত্য কমিশনের শেষ বৈঠক, মঙ্গলবার সুপারিশ পেশ

আপডেট সময় : ১০:২৮:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ তুলে দিতে যাচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এই সুপারিশ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে।

সুপারিশ হস্তান্তরের সময় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরাও উপস্থিত থাকবেন।

এর আগে সোমবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে কমিশনের শেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, কমিশন সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।

এই সমাপনী বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠনের শুরু থেকে চূড়ান্ত সুপারিশ দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের ডকুমেন্ট, আলোচনার ভিডিও, অডিও এবং ছবি যত্ন করে সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এগুলো মহামূল্যবান সম্পদ। একটা জাতি হিসেবে আমরা কোন পরিস্থিতিতে, কী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম, তা সবার জন্য দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা এবং উন্মুক্ত রাখা দরকার। যতগুলো বৈঠক হয়েছে, তার ছবি ও ভিডিও, যত চিঠি চালাচালি হয়েছে—সবকিছু সংরক্ষণ করতে হবে এবং বিষয়ভিত্তিক ভাগ করে (ক্যাটাগরি) রাখতে হবে। টেলিভিশনে যে আলোচনাগুলো সরাসরি প্রচার হয়েছে, সেগুলোও খণ্ড খণ্ড আকারে সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ, এগুলোই হবে ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।’

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘যারা গবেষণা করতে চান, তারা যেন এগুলো দেখে কাজে লাগাতে পারেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ডকুমেন্টগুলো থেকে যাবে। এই দলিলগুলোই ভবিষ্যতে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।’

এসময় প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দল, ঐকমত্য কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, গবেষক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বৈঠকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি অন্যান্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নেও সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কমিশন সদস্যরা আহ্বান জানান।

কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বাংলাদেশে একটি স্থায়ী জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরির জন্য কাজ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি আইন বিশেষজ্ঞ, বিচারপতি, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘গত জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, তার তিনটি মূল দায়িত্বের (বিচার, সংস্কার, নির্বাচন) মধ্যে একটি হলো কাঠামোগত সংস্কার। এই সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করাই ছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান কাজ। দলগুলোর মধ্যে মিল-অমিল থাকার পরেও সংস্কারের প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট ছিল। তারা সবসময় আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন এবং দিনের পর দিন ধৈর্য ধরে বিচক্ষণতার সাথে সংলাপে অংশ নিয়েছেন।’

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘জুলাইয়ের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণ-অভ্যুত্থান আমাদের যে সুযোগ করে দিয়েছে, তা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি। কমিশন সংস্কারকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে জনগণ কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখতে পায়। কমিশন তার দায়িত্ব শেষ করেছে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সুপারিশ হস্তান্তর করা হবে। কমিশনের মেয়াদ ৩১ অক্টোবর শেষ হলেও, সরকারের প্রয়োজনে এ দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।’

নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও কমিশন সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সবাই সরকারের আন্তরিকতা ও সাহসিকতা দেখতে চায়। গণ-অভ্যুত্থানে যে তাজা প্রাণগুলো ঝরে গেল, যত মানুষ আহত হলো, তা মনে রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যেন এই সুযোগ না হারাই।’

কমিশন সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐক্য দেখা গিয়েছিল, ঠিক একই রকম আন্তরিকতার প্রতিফলন কমিশনের বৈঠকগুলোতেও ছিল। এটা খুবই ইতিবাচক একটা দিক।’

পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান ও কমিশন সদস্য সফর রাজ বলেন, ‘এই প্রথম রাজনৈতিক দলগুলো এক টেবিলে বসে ধৈর্যের সাথে আলোচনা করেছে। ভবিষ্যতেও যেন এই ধরনের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও কমিশন সদস্য ড. ইফতেখারুজ্জামান ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি দুদক সংস্কারেও সরকারকে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ‘আমরা যতগুলো শহীদ পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, সংস্কার নিশ্চিত করা না গেলে তাদের সন্তানদের এই আত্মত্যাগ বৃtha যাবে। জুলাইয়ে যারা জীবন দিলেন, তারাই এই সংস্কারের মূল ভিত্তি।’