দেশের ব্যাংকিং খাত দুর্বৃত্তায়ন, অনিয়ম, পরিবারতন্ত্র ও সুশাসনের অভাবে কার্যত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তার অভিযোগ, এসব কারণে গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, যার একটি বড় অংশ সম্ভবত বিদেশে পাচার হয়েছে। এছাড়া, পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগও করেন তিনি। বুধবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ‘ব্যাংকিং খাত: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেন।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর তার বক্তব্যে দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান নাজুক চিত্র তুলে ধরে বলেন, সুশাসনের অভাব, অনিয়ম ও দুর্বৃত্তায়নের কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন যে, এই বিপুল অঙ্কের অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে। পাশাপাশি, পরিবারতন্ত্রের প্রভাবের কারণেও প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার অভিযোগ করেন তিনি, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
দেশের বর্তমান ব্যাংক সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, বর্তমানে ৬১টি ব্যাংক থাকলেও বাংলাদেশের জন্য ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট। ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনা গেলে সুশাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে। তিনি জানান, সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংখ্যা কমিয়ে দুটি রেখে বাকিগুলোকে একীভূত (মার্জ) করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
ব্যাংকিং খাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সঠিক গভর্ন্যান্সের অভাবেই এই খাত ধ্বংসের মুখে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতে বহুমুখী সংস্কার প্রয়োজন এবং সব ক্ষেত্রেই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে গভর্নর আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আগামী মার্চ মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নেমে আসবে। তবে একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন যে, সংশোধিত বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ জারি না হলে ভবিষ্যতে আবারও ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ‘ব্যাংক রেজ্যুলিউশন ফান্ড’ গঠনের কাজ করছে। এই তহবিলে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই রেজ্যুলিউশন কাঠামোর আওতায় আনা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে গভর্নর বলেন, নগদ লেনদেনই রাজস্ব ফাঁকির প্রধান মাধ্যম। ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করা গেলে বছরে অতিরিক্ত দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব। এজন্য তিনি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, একটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত খাতকে পুনরুদ্ধারে বর্তমান গভর্নরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্বীকার করেন, ব্যাংকিং খাত বর্তমানে কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে তা এখন স্পষ্ট। বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে এই খাতকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে এবং ইতিবাচক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আলোচনা সভায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শরিফ মোশারফ হোসেন দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ঋণ খেলাপির হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কমে গেছে, যা ফলস্বরূপ বিনিয়োগকেও বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতকে আরও কঠোর পর্যবেক্ষণের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের যৌথ আয়োজনে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহাবুব উল্লাহ, সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 















