ঢাকা ০৬:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

নবম বেতন কমিশনের প্রতিবেদন জমা: সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ

সরকারি কর্মজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো সুপারিশ করে নবম জাতীয় বেতন কমিশন নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ আগেই প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি পেশ করে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী এবং অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের সকল পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সরকার ২৩ সদস্যের এই নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। তাদের জন্য ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের দীর্ঘ ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হলো। কমিশনের প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত শেষ তারিখ ছিল ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, যা কমিশন নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন করলো। উল্লেখ্য, কমিশন তাদের জন্য নির্ধারিত বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয়ে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে।

প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তিনি মন্তব্য করেন, “এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।”

এ সময় কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান জানান, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটেই সুস্পষ্ট কার্যপরিধি (Terms of Reference) নির্ধারণ করে বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করেছে।

নির্ধারিত কার্যপরিধি অনুসরণ করে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে কমিশন বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইনে মোট ১৮৪টি সভা করেছে। এসব সভা থেকে ২ হাজার ৫৫২ জনের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা সভার আয়োজন করে ব্যাপক মতবিনিময় করা হয়।

কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান নির্ধারণ এবং এর বাস্তবায়নযোগ্যতা পর্যালোচনা করা। প্রতিবেদন দাখিলকালে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এই প্রস্তাব বাস্তবায়নই এখন পরবর্তী কাজ। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে, যে কমিটি বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।”

কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য মোট ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশনপ্রধান জানান, এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

কমিশনের প্রতিবেদনে নতুন নতুন প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে— সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি দপ্তরসমূহে ভাতাসমূহ পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির বড় অংশ বরাদ্দের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

নবম বেতন কমিশনের প্রতিবেদন জমা: সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ

আপডেট সময় : ১০:০৯:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

সরকারি কর্মজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো সুপারিশ করে নবম জাতীয় বেতন কমিশন নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ আগেই প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি পেশ করে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী এবং অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের সকল পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সরকার ২৩ সদস্যের এই নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। তাদের জন্য ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের দীর্ঘ ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হলো। কমিশনের প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত শেষ তারিখ ছিল ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, যা কমিশন নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন করলো। উল্লেখ্য, কমিশন তাদের জন্য নির্ধারিত বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয়ে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে।

প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তিনি মন্তব্য করেন, “এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।”

এ সময় কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান জানান, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটেই সুস্পষ্ট কার্যপরিধি (Terms of Reference) নির্ধারণ করে বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করেছে।

নির্ধারিত কার্যপরিধি অনুসরণ করে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে কমিশন বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইনে মোট ১৮৪টি সভা করেছে। এসব সভা থেকে ২ হাজার ৫৫২ জনের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সমিতি ও অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা সভার আয়োজন করে ব্যাপক মতবিনিময় করা হয়।

কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান নির্ধারণ এবং এর বাস্তবায়নযোগ্যতা পর্যালোচনা করা। প্রতিবেদন দাখিলকালে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এই প্রস্তাব বাস্তবায়নই এখন পরবর্তী কাজ। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে, যে কমিটি বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।”

কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য মোট ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশনপ্রধান জানান, এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

কমিশনের প্রতিবেদনে নতুন নতুন প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে— সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি দপ্তরসমূহে ভাতাসমূহ পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন।