দক্ষিণ চিলিতে চার দিন ধরে চলা এক বিধ্বংসী দাবানল অন্তত ২০ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। বায়োবিও ও নুবল অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই অগ্নিকাণ্ডে বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং পুরো সম্প্রদায় এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে চারপাশ। এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা জরুরি সহায়তা চেয়ে আকুতি জানাচ্ছেন। একই সাথে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী তাপমাত্রা আবারও বাড়তে পারে—এই আশঙ্কায় দমকল বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দাবানলে যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট শহরের সমান আয়তনের এলাকা ভস্মীভূত হয়েছে। এই দুর্যোগে অন্তত ৭,২০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরকার আশ্বাস দিলেও, ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ—বাস্তবে তারা মূলত স্বেচ্ছাসেবক এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই সহায়তা পাচ্ছেন।
বায়োবিও অঞ্চলের রাজধানী কনসেপসিওনের কাছে পুন্তা দে পারার বাসিন্দা ম্যানুয়েল ওরমাসাবাল জানান, “সাধারণ মানুষই এখন আমাদের একমাত্র ভরসা। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো সহায়তা আমরা পাইনি।” বিদ্যুৎ ও অস্থায়ী শৌচাগারের অভাবে পরিবার ও পোষা প্রাণী নিয়ে একটি তাঁবুতে দিন কাটানো এই ৬৪ বছর বয়সী ব্যক্তি সরকারের উদাসীনতায় হতাশা প্রকাশ করেছেন।
বায়োবিও অঞ্চলের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত শহর লিরকেনের বাসিন্দাদেরও একই রকম অভিজ্ঞতা। ২৩ বছর বয়সী পশুচিকিৎসক মারিয়া হোসে পিনো বলেন, “মানুষই মানুষকে সাহায্য করছে, সরকারি সহায়তা খুবই সীমিত।”
এদিকে, চিলির উপ-স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ভিক্টর রামোস জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে সব ধরনের প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ৩৫০ থেকে ১,৫০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
প্রায় ৪,০০০ দমকলকর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে নিরলসভাবে কাজ করছেন। নুবল, বায়োবিও এবং পার্শ্ববর্তী আরাউকানিয়া অঞ্চলে এখনো ২১টি দাবানল সক্রিয় রয়েছে। দমকল সমন্বয়কারী হুয়ান কেভেদো জানান, তাপমাত্রা কিছুটা কমায় এবং আর্দ্রতা বাড়ায় আগুনের বিস্তার কিছুটা হ্রাস পেলেও, কয়েক দিনের মধ্যেই আবার তীব্র গরম ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
উপকূলীয় শহর পেনকো এবং বন্দরনগরী লিরকেনের পাহাড়ি এলাকায় শত শত বাড়িঘর ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পোড়া গাড়ি, ভেঙে যাওয়া জানালা এবং উড়ে যাওয়া টিনের ছাদ—সর্বত্রই এক ভয়াবহ ধ্বংসলীলার চিত্র।
নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণের কাজও ধীরগতিতে এগোচ্ছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত মাত্র পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। অনেক মরদেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, কিছু দাবানল ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছে। এ ঘটনায় পেনকো এলাকায় অগ্নিসংযোগের চেষ্টার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির উষ্ণ ও শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-মধ্য চিলিতে দাবানলের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিনিয়া দেল মার এলাকায় দাবানলে ১৩৮ জনের প্রাণহানির পর, চলতি বছরের এই অগ্নিকাণ্ডগুলো অন্যতম মারাত্মক বলে বিবেচিত হচ্ছে। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘমেয়াদী উষ্ণতা ও শুষ্কতার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা এই অঞ্চলে চরম দাবানল পরিস্থিতি তৈরি করছে।
রিপোর্টারের নাম 





















