ঢাকা ০৫:৪২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

মার্কিন স্বপ্নভঙ্গ: ৮০ লাখ টাকা খুইয়ে দেশে ফিরলেন ৩৬ বাংলাদেশি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩৪:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

উন্নত জীবনের আশায় বিপুল অর্থ খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমালেও শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে ৩৬ জন বাংলাদেশির। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে অবৈধ পথে দেশটিতে প্রবেশ করা এই বাংলাদেশিদের শূন্য হাতেই দেশে ফিরতে হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে একটি বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান এই ৩৬ জন, যাদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, এই ৩৬ বাংলাদেশি প্রবাসে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে নিজেদের বসতভিটা, পরিবার-পরিজনের জমি, গয়না বিক্রি করে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে জনপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা, এমনকি কেউ কেউ ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেছিলেন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও এভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) সহায়তায় ব্র্যাকের পক্ষ থেকে ফেরত আসা কর্মীদের পরিবহনসহ প্রয়োজনীয় জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়।

ফেরত আসা এই ৩৬ জনের মধ্যে নোয়াখালী জেলারই ২১ জন। এছাড়া লক্ষ্মীপুর জেলার দুইজন এবং মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা, লালমনিরহাট, শরীয়তপুর, বরগুনা, ফেনী, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও নেত্রকোনা জেলার একজন করে নাগরিক রয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৩ জন।

ব্র্যাকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেরত আসা এই ৩৬ জনের অধিকাংশই প্রথমে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। সেখানে আশ্রয়ের আবেদন করলেও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয় এবং মার্কিন প্রশাসন তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

ফেরত আসা নোয়াখালীর জাহিদুল ইসলাম জানান, দক্ষিণ আমেরিকা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আশায় তিনি দালালদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা। গাজীপুরের সুলতানা আক্তার, যিনি এই দলের একমাত্র নারী সদস্য, জানান, ব্রাজিল হয়ে মেক্সিকো সীমান্ত পার হতে দালালদের ৩০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার সব অর্থই বিফলে গেছে। একইভাবে নোয়াখালীর মির হাসান ৫৫ লাখ, রিয়াদুল ইসলাম ৫০ লাখ ও রাকিব ৬০ লাখ টাকা খরচ করেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে দেশে ফিরেছেন।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এই প্রসঙ্গে বলেন, “গত কয়েক দফায় যারা ফেরত এসেছেন, তাদের অনেকেই প্রথমে ব্রাজিল গিয়ে সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র যান। প্রশ্ন হলো, সরকার যখন ব্রাজিলে বৈধভাবে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দেয়, তখন তারা সত্যিই ব্রাজিলে কাজ করতে যাচ্ছেন নাকি সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছেন, সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।” তিনি আরও বলেন, “এই যে একেকজন ৪০ থেকে ৫৫ লাখ টাকা খরচ করে শূন্য হাতে ফিরে আসছেন, এই দায় কার? যেসব এজেন্সি এই কর্মীদের পাঠিয়েছে এবং যারা এই অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।”

শরিফুল হাসান জানান, চলতি বছরে জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে মোট ১ হাজার ৩২০ জন বাংলাদেশি ব্রাজিলে গেছেন, যার মধ্যে নোয়াখালী জেলারই ৯৫১ জন। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে ব্রাজিলে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়ার আগে সরকারকে আরও সতর্ক হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির বড় অংশ বরাদ্দের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

মার্কিন স্বপ্নভঙ্গ: ৮০ লাখ টাকা খুইয়ে দেশে ফিরলেন ৩৬ বাংলাদেশি

আপডেট সময় : ১০:৩৪:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬

উন্নত জীবনের আশায় বিপুল অর্থ খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমালেও শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে ৩৬ জন বাংলাদেশির। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে অবৈধ পথে দেশটিতে প্রবেশ করা এই বাংলাদেশিদের শূন্য হাতেই দেশে ফিরতে হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে একটি বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান এই ৩৬ জন, যাদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, এই ৩৬ বাংলাদেশি প্রবাসে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে নিজেদের বসতভিটা, পরিবার-পরিজনের জমি, গয়না বিক্রি করে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে জনপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা, এমনকি কেউ কেউ ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেছিলেন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও এভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) সহায়তায় ব্র্যাকের পক্ষ থেকে ফেরত আসা কর্মীদের পরিবহনসহ প্রয়োজনীয় জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়।

ফেরত আসা এই ৩৬ জনের মধ্যে নোয়াখালী জেলারই ২১ জন। এছাড়া লক্ষ্মীপুর জেলার দুইজন এবং মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা, লালমনিরহাট, শরীয়তপুর, বরগুনা, ফেনী, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও নেত্রকোনা জেলার একজন করে নাগরিক রয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৩ জন।

ব্র্যাকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেরত আসা এই ৩৬ জনের অধিকাংশই প্রথমে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। সেখানে আশ্রয়ের আবেদন করলেও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয় এবং মার্কিন প্রশাসন তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

ফেরত আসা নোয়াখালীর জাহিদুল ইসলাম জানান, দক্ষিণ আমেরিকা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আশায় তিনি দালালদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা। গাজীপুরের সুলতানা আক্তার, যিনি এই দলের একমাত্র নারী সদস্য, জানান, ব্রাজিল হয়ে মেক্সিকো সীমান্ত পার হতে দালালদের ৩০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার সব অর্থই বিফলে গেছে। একইভাবে নোয়াখালীর মির হাসান ৫৫ লাখ, রিয়াদুল ইসলাম ৫০ লাখ ও রাকিব ৬০ লাখ টাকা খরচ করেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে দেশে ফিরেছেন।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এই প্রসঙ্গে বলেন, “গত কয়েক দফায় যারা ফেরত এসেছেন, তাদের অনেকেই প্রথমে ব্রাজিল গিয়ে সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র যান। প্রশ্ন হলো, সরকার যখন ব্রাজিলে বৈধভাবে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দেয়, তখন তারা সত্যিই ব্রাজিলে কাজ করতে যাচ্ছেন নাকি সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছেন, সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।” তিনি আরও বলেন, “এই যে একেকজন ৪০ থেকে ৫৫ লাখ টাকা খরচ করে শূন্য হাতে ফিরে আসছেন, এই দায় কার? যেসব এজেন্সি এই কর্মীদের পাঠিয়েছে এবং যারা এই অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।”

শরিফুল হাসান জানান, চলতি বছরে জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে মোট ১ হাজার ৩২০ জন বাংলাদেশি ব্রাজিলে গেছেন, যার মধ্যে নোয়াখালী জেলারই ৯৫১ জন। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে ব্রাজিলে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়ার আগে সরকারকে আরও সতর্ক হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।