ঢাকা ১২:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬

চিকিৎসক সংকট ও অনুপস্থিতিতে বিপর্যস্ত গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: বন্ধ রয়েছে সিজার অপারেশন

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকটের কারণে ভেঙে পড়েছে স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদের চিকিৎসকরা দীর্ঘ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে সেবা নিতে আসা প্রায় দেড় লাখ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের অভাবে গত জুন মাস থেকে হাসপাতালটিতে সিজারিয়ান অপারেশনসহ সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯টি জুনিয়র কনসালটেন্ট পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন। তবে এই ১০ জনের মধ্যেও শিশু বিভাগের ডা. আলাউদ্দিন এবং প্যাথলোজি বিভাগের ডা. নাবিলা নুজহাত দীর্ঘ দিন ধরে অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত। ডা. আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে এবং ডা. নাবিলা নুজহাতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে।

হাসপাতালের গাইনি বিভাগ ও অপারেশন থিয়েটারের চিত্র আরও ভয়াবহ। জানা গেছে, গাইনি কনসালটেন্ট ডা. সাবরিনা মেহের গত বছরের জুন মাস থেকে কর্মস্থলে অনিয়মিত। ফলে গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে এখানে কোনো সিজারিয়ান অপারেশন হচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ডা. সাবরিনা মেহের মাসে মাত্র এক-দুই দিন হাসপাতালে আসেন। তবে গাইনি চিকিৎসকের দাবি, অপারেশন থিয়েটার প্রস্তুত না থাকায় তিনি অস্ত্রোপচার করতে পারছেন না। যদিও হাসপাতাল প্রশাসন বলছে, চিকিৎসক নিয়মিত উপস্থিত থাকলে একদিনের মধ্যেই অপারেশন থিয়েটার চালু করা সম্ভব। বর্তমানে ওই চিকিৎসকের বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

বর্তমানে হাসপাতালটিতে মেডিসিন, অর্থোপেডিক, চক্ষু, নাক-কান-গলা (ইএনটি), চর্ম ও যৌনসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। মাত্র সাতজন চিকিৎসক দিয়ে চলছে পুরো হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম। এমনকি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাও শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রায়ই ছুটিতে থাকেন। ফলে আবাসিক মেডিকেল অফিসারসহ মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর পুরো হাসপাতালের চাপ পড়ছে।

ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এই হাসপাতালে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত অসংখ্য রোগী আসেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জরুরি অস্ত্রোপচারের সুবিধা না থাকায় মুমূর্ষু রোগীদের রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল বা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার সময় পথেই রোগীর মৃত্যু ঘটছে। এছাড়া প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ রোগী সেবা নিতে এলেও চিকিৎসকের অভাবে তাদের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) জানিয়েছেন, শুধু গোয়ালন্দ নয়, পার্শ্ববর্তী রাজবাড়ী সদরের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষও এখানে সেবা নিতে আসেন। রোগীর চাপের কারণে অনেক সময় মেঝেতেও শয্যা দিতে হয়। সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধের মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে, বাকিটা রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন বলছে, গাইনি চিকিৎসক নিয়মিত না আসায় অপারেশন থিয়েটারটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। নতুন বিসিএস থেকে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলে এই সংকট কিছুটা লাঘব হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত এই জনবল সংকট নিরসন ও অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার পর এক ব্যক্তির আত্মহত্যার অভিযোগ

চিকিৎসক সংকট ও অনুপস্থিতিতে বিপর্যস্ত গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: বন্ধ রয়েছে সিজার অপারেশন

আপডেট সময় : ০২:৩৫:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকটের কারণে ভেঙে পড়েছে স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদের চিকিৎসকরা দীর্ঘ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে সেবা নিতে আসা প্রায় দেড় লাখ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের অভাবে গত জুন মাস থেকে হাসপাতালটিতে সিজারিয়ান অপারেশনসহ সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯টি জুনিয়র কনসালটেন্ট পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন। তবে এই ১০ জনের মধ্যেও শিশু বিভাগের ডা. আলাউদ্দিন এবং প্যাথলোজি বিভাগের ডা. নাবিলা নুজহাত দীর্ঘ দিন ধরে অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত। ডা. আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে এবং ডা. নাবিলা নুজহাতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে।

হাসপাতালের গাইনি বিভাগ ও অপারেশন থিয়েটারের চিত্র আরও ভয়াবহ। জানা গেছে, গাইনি কনসালটেন্ট ডা. সাবরিনা মেহের গত বছরের জুন মাস থেকে কর্মস্থলে অনিয়মিত। ফলে গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে এখানে কোনো সিজারিয়ান অপারেশন হচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ডা. সাবরিনা মেহের মাসে মাত্র এক-দুই দিন হাসপাতালে আসেন। তবে গাইনি চিকিৎসকের দাবি, অপারেশন থিয়েটার প্রস্তুত না থাকায় তিনি অস্ত্রোপচার করতে পারছেন না। যদিও হাসপাতাল প্রশাসন বলছে, চিকিৎসক নিয়মিত উপস্থিত থাকলে একদিনের মধ্যেই অপারেশন থিয়েটার চালু করা সম্ভব। বর্তমানে ওই চিকিৎসকের বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

বর্তমানে হাসপাতালটিতে মেডিসিন, অর্থোপেডিক, চক্ষু, নাক-কান-গলা (ইএনটি), চর্ম ও যৌনসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। মাত্র সাতজন চিকিৎসক দিয়ে চলছে পুরো হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম। এমনকি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাও শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রায়ই ছুটিতে থাকেন। ফলে আবাসিক মেডিকেল অফিসারসহ মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর পুরো হাসপাতালের চাপ পড়ছে।

ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এই হাসপাতালে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত অসংখ্য রোগী আসেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জরুরি অস্ত্রোপচারের সুবিধা না থাকায় মুমূর্ষু রোগীদের রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল বা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার সময় পথেই রোগীর মৃত্যু ঘটছে। এছাড়া প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ রোগী সেবা নিতে এলেও চিকিৎসকের অভাবে তাদের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) জানিয়েছেন, শুধু গোয়ালন্দ নয়, পার্শ্ববর্তী রাজবাড়ী সদরের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষও এখানে সেবা নিতে আসেন। রোগীর চাপের কারণে অনেক সময় মেঝেতেও শয্যা দিতে হয়। সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধের মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে, বাকিটা রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন বলছে, গাইনি চিকিৎসক নিয়মিত না আসায় অপারেশন থিয়েটারটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। নতুন বিসিএস থেকে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলে এই সংকট কিছুটা লাঘব হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত এই জনবল সংকট নিরসন ও অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।