ঢাকা ১২:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬

বাণিজ্য চুক্তি ও অভিবাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শর্ত

ঢাকায় দুই দিনের ব্যস্ত সফর শেষ করেছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী সেক্রেটারি পল কাপুর। তাঁর এই সফরে অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রী, রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হওয়া বৈঠকগুলোতে প্রধান দুটি ইস্যু—বাণিজ্য চুক্তি ও অবৈধ অভিবাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান ও সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ঠিক দুই দিন আগে স্বাক্ষরিত হওয়া বিশেষ বাণিজ্য চুক্তিটি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত অবৈধ বাংলাদেশিদের দ্রুততম সময়ে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জোর দিয়েছে ওয়াশিংটন।

বাণিজ্য চুক্তির কঠিন শর্ত ও বোয়িং ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের জন্য ১৯ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে বড় ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। চুক্তির ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শুধু তাই নয়, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে পাঁচ বছরে অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম এবং বিপুল পরিমাণ সয়াবিন ও তুলা আমদানির শর্তও রাখা হয়েছে, যার বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার।

সামরিক সরঞ্জাম ও অ-বাজার অর্থনীতির ওপর বিধিনিষেধ: চুক্তিতে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও ঢাকাকে ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকে থাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ নির্দিষ্ট কিছু দেশ (যাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি) থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত করার চেষ্টা করবে বলে চুক্তিতে বলা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, বাংলাদেশ যদি চীন, রাশিয়া বা ভিয়েতনামের মতো ‘অ-বাজার’ অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে নতুন করে কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী, তবে ওয়াশিংটন এই চুক্তি বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। এতে ২০২৫ সালে ঘোষিত উচ্চ শুল্ক হার আবারও পুনর্বহাল হতে পারে।

৫ হাজার অবৈধ বাংলাদেশিকে ফেরানোর চাপ: বাণিজ্যের পাশাপাশি অভিবাসন ইস্যুতেও কোনো ছাড় দিতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে প্রায় ৫ হাজার অবৈধ বাংলাদেশিকে সে দেশ থেকে ফেরত পাঠাতে চায় ওয়াশিংটন। ইতোমধ্যে ৩২৭ জন বাংলাদেশি নাগরিককে হাতে-পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় সামরিক বিমানে করে দেশে পাঠানো হয়েছে, যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে পল কাপুর এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত করার তাগিদ দেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই নাগরিকদের ‘মর্যাদাহানি’ না করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন, এই চুক্তিতে ‘এন্ট্রি ক্লজ’ এবং ‘এক্সিট ক্লজ’ রয়েছে, ফলে সরকার চাইলে ৬০ দিনের নোটিশ দিয়ে বেরিয়ে আসার সুযোগও রাখে। তবে যুক্তরাষ্ট্র চায় কোনো বাধা ছাড়াই এই চুক্তি দ্রুত কার্যকর হোক। জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার পর এক ব্যক্তির আত্মহত্যার অভিযোগ

বাণিজ্য চুক্তি ও অভিবাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শর্ত

আপডেট সময় : ০৯:৩৬:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬

ঢাকায় দুই দিনের ব্যস্ত সফর শেষ করেছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী সেক্রেটারি পল কাপুর। তাঁর এই সফরে অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রী, রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হওয়া বৈঠকগুলোতে প্রধান দুটি ইস্যু—বাণিজ্য চুক্তি ও অবৈধ অভিবাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান ও সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ঠিক দুই দিন আগে স্বাক্ষরিত হওয়া বিশেষ বাণিজ্য চুক্তিটি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত অবৈধ বাংলাদেশিদের দ্রুততম সময়ে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জোর দিয়েছে ওয়াশিংটন।

বাণিজ্য চুক্তির কঠিন শর্ত ও বোয়িং ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের জন্য ১৯ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে বড় ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। চুক্তির ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শুধু তাই নয়, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে পাঁচ বছরে অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম এবং বিপুল পরিমাণ সয়াবিন ও তুলা আমদানির শর্তও রাখা হয়েছে, যার বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার।

সামরিক সরঞ্জাম ও অ-বাজার অর্থনীতির ওপর বিধিনিষেধ: চুক্তিতে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও ঢাকাকে ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকে থাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ নির্দিষ্ট কিছু দেশ (যাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি) থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত করার চেষ্টা করবে বলে চুক্তিতে বলা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, বাংলাদেশ যদি চীন, রাশিয়া বা ভিয়েতনামের মতো ‘অ-বাজার’ অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে নতুন করে কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী, তবে ওয়াশিংটন এই চুক্তি বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। এতে ২০২৫ সালে ঘোষিত উচ্চ শুল্ক হার আবারও পুনর্বহাল হতে পারে।

৫ হাজার অবৈধ বাংলাদেশিকে ফেরানোর চাপ: বাণিজ্যের পাশাপাশি অভিবাসন ইস্যুতেও কোনো ছাড় দিতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে প্রায় ৫ হাজার অবৈধ বাংলাদেশিকে সে দেশ থেকে ফেরত পাঠাতে চায় ওয়াশিংটন। ইতোমধ্যে ৩২৭ জন বাংলাদেশি নাগরিককে হাতে-পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় সামরিক বিমানে করে দেশে পাঠানো হয়েছে, যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে পল কাপুর এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত করার তাগিদ দেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই নাগরিকদের ‘মর্যাদাহানি’ না করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন, এই চুক্তিতে ‘এন্ট্রি ক্লজ’ এবং ‘এক্সিট ক্লজ’ রয়েছে, ফলে সরকার চাইলে ৬০ দিনের নোটিশ দিয়ে বেরিয়ে আসার সুযোগও রাখে। তবে যুক্তরাষ্ট্র চায় কোনো বাধা ছাড়াই এই চুক্তি দ্রুত কার্যকর হোক। জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে।