অপরাধ দমন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি জোরদার করার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) ৩৩০ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তির একটি নতুন তালিকা প্রকাশ করেছে। এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা, দস্যুতা, অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি এবং হামলা-ভাঙচুরের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই ব্যক্তিরা মহানগরীর সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ‘গুরুতর ঝুঁকি’ সৃষ্টি করছে।
গতকাল শনিবার দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তালিকাটি প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে, তালিকাভুক্ত এই দুষ্কৃতকারীদের মহানগরী এলাকা থেকে অবিলম্বে বহিষ্কার করা হলো। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের এই এলাকায় প্রবেশ এবং অবস্থান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সিএমপি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, তালিকাভুক্ত কোনো ব্যক্তি এখন থেকে চট্টগ্রাম শহরের সীমানায় প্রবেশ করতে পারবে না। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং শহরে প্রবেশের যেকোনো চেষ্টা প্রতিহত করে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
চট্টগ্রাম পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ জানিয়েছেন, তালিকাভুক্তদের অধিকাংশই বর্তমানে পলাতক এবং তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি যে এই তালিকাভুক্ত কোনো ব্যক্তি চট্টগ্রাম শহরের সীমানায় প্রবেশ করতে পারবে না। তারা শহরে ঢুকতেই না পারলে বড় ধরনের নাশকতার সুযোগও কমে যাবে।”
আমিনুর রশিদ আরও জানান, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের গতিবিধি নিবিড়ভাবে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। শহরের প্রবেশ পথগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করা হয়েছে। কেউ ছদ্মবেশে বা বিকল্প পথে প্রবেশের চেষ্টা করলেও তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
সিএমপি সূত্রমতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নগরীতে ছিনতাই, সংগঠিত চাঁদাবাজি, মাদক পরিবহন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশের দাবি, এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ সক্রিয় রয়েছে।
সিএমপির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “এই ৩৩০ জনের বেশিরভাগই পলাতক। কেউ জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে, আবার কেউ শহরের বাইরে থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না।”
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে যে, কিছু অসাধু গোষ্ঠী চট্টগ্রামের বাইরে অবস্থান করে স্থানীয় চক্রগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে তালিকা হালনাগাদ করে নতুন এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
সিএমপি কর্তৃক প্রকাশিত তালিকায় হত্যা, অস্ত্র, মাদকসহ বিভিন্ন মামলার আসামিদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন, উল্লেখযোগ্যভাবে, ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার আসামী যুবলীগ ক্যাডার হেলাল আকবর চৌধুরী, আওয়ামী লীগের দিদারুল আলম মাসুম, সাইফুল ইসলাম রিমন, বর্তমানে কারাবন্দী সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ ও তার সহযোগী মোবারক হোসেন ইমন, সন্ত্রাসী রায়হান, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক ছাত্রদল নেতা বার্মা সাইফুল। এছাড়াও তালিকায় রয়েছেন চট্টগ্রাম ১০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু, সাবেক কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন, যুবলীগের দেবাশিস পাল দেবু, নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর, এবং সাবেক সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু।
এই ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। কেউ সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী দলের নেতা, কেউ রাজনৈতিক হামলা ও নাশকতার মামলার আসামী, আবার কেউ চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি চক্রের সদস্য। তালিকায় বেশ কয়েকজন পুরোনো সন্ত্রাসীও রয়েছেন যারা দীর্ঘদিন ধরে পলাতক।
চট্টগ্রাম নগরীর ১৭টি প্রবেশপথে অতিরিক্ত নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মোবাইল ট্র্যাকিং, মুখ শনাক্তকরণ ক্যামেরা (ফেসিয়াল রিকগনিশন) এবং বাস ও লঞ্চ টার্মিনালে বিশেষ নজরদারির মাধ্যমে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 






















