আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে বইছে ভোটের হাওয়া। তবে এবারের নির্বাচনে জনসেবার লড়াইয়ের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এসেছে প্রার্থীদের বিপুল পরিমাণ সম্পদের খতিয়ান। প্রবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চলের নির্বাচনী রাজনীতিতে বরাবরের মতোই অর্থের প্রভাব বেশ স্পষ্ট। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সিলেটের ছয়টি আসনে চূড়ান্ত লড়াইয়ে থাকা ৪০ জন প্রার্থীর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ ২২ জনই কোটিপতি।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলার ছয়টি আসনে প্রাথমিকভাবে ৪৭ জন মনোনয়ন দাখিল করলেও যাচাই-বাছাই ও আপিল শেষে বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ৪০ জন প্রার্থী। এই প্রার্থীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বিত্তশালীদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদুর রহমান। এছাড়া বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীদের একটি বড় অংশই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক।
হলফনামার তথ্যমতে, প্রার্থীদের মধ্যে ২২ জন কোটিপতির তালিকায় রয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির ও জোটের আটজন এবং জামায়াতে ইসলামীর পাঁচজন প্রার্থী রয়েছেন। বাকিরা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। পেশার দিক থেকে প্রার্থীদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। এছাড়া তালিকায় রয়েছেন প্রবাসী, আইনজীবী, শিক্ষক ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।
সম্পদের হিসাবে সবার ওপরে থাকা সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী জাহিদুর রহমানের মোট সম্পদের পরিমাণ ৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন সিলেট-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তার ও তার স্ত্রীর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৯ কোটি টাকা। এছাড়া সাবেক সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীরও রয়েছে ১৫ কোটি টাকার বেশি স্থাবর সম্পদ।
আসনভিত্তিক সম্পদের চিত্র:
সিলেট-১: এই আসনে সবচেয়ে বিত্তবান প্রার্থী বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ১৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এই পরিবারটি ৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক। তবে বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের ৮৪০ কোটি টাকার ঋণ থাকলেও তারা খেলাপি নন। এই আসনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আনোয়ার হোসেন, যার দম্পতির মোট সম্পদ প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা। এছাড়া জামায়াতের মাওলানা হাবিবুর রহমান ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের শামীম মিয়াও কোটিপতির তালিকায় রয়েছেন।
সিলেট-২: এ আসনের সাত প্রার্থীর মধ্যে চারজন কোটিপতি। বিএনপির তাহসিনা রুশদীর ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা নিয়ে শীর্ষে রয়েছেন। এছাড়া খেলাফত মজলিসের মুনতাসির আলী, জামায়াতের আব্দুল হান্নান ও জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরীও কোটি টাকার মালিক।
সিলেট-৩: এই আসনে সাত প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই কোটিপতি। সম্পদের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুছলেহ উদ্দিন রাজু (৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা)। বিএনপির আব্দুল মালিকের চেয়ে তার প্রবাসী স্ত্রীর সম্পদ বেশি, যা প্রায় ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এছাড়া জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান ও খেলাফত মজলিসের দিলওয়ার হোসাইনেরও কোটি টাকার উপরে সম্পদ রয়েছে।
সিলেট-৪: ছয় প্রার্থীর মধ্যে তিনজন কোটিপতি। বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরীর নিজস্ব সম্পদ ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রীর সম্পদ ৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এছাড়া জামায়াতের জয়নাল আবেদীন ও এনসিপির রাশেদ উল আলমও কোটিপতি।
সিলেট-৫: এই আসনের পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে দুজন কোটিপতি। স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশিদের ১ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের ১ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।
সিলেট-৬: এই আসনে প্রার্থীদের মধ্যে সম্পদের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি। গণঅধিকার পরিষদের জাহিদুর রহমানের ৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকার পাশাপাশি বিএনপির ফয়সল আহমদ চৌধুরীর ১১ কোটি ১৬ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। এছাড়া জামায়াতের সেলিম উদ্দিন ও বিএনপির এমরান আহমদ চৌধুরীও কোটিপতির তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।
হলফনামা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিলেটের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ যেমন বাড়ছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রার্থীদের সম্পদের পরিমাণ। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে প্রার্থীদের এই বিপুল সম্পদ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও, শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে এর প্রভাব কতটুকু পড়ে—তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত।
রিপোর্টারের নাম 























