ঢাকা ০৯:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির সেই ঐতিহাসিক ‘হুম গুডি’ খেলায় ফুলবাড়ীয়ায় লাখো মানুষের ঢল

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় জমিদারি আমলের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহ্যবাহী ‘হুম গুডি’ খেলাকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে উপজেলার তেলিগ্রাম বড়ইআটা গ্রামে আয়োজিত এই প্রাচীন খেলায় অংশ নিতে এবং তা উপভোগ করতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। ফুলবাড়ীয়া ছাড়াও ময়মনসিংহ সদর, মুক্তাগাছা ও ত্রিশাল উপজেলা থেকে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে ভিড় জমান।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় পৌনে তিনশ বছরের পুরনো এই খেলাটির সূচনা হয়েছিল তৎকালীন দুই জমিদারের মধ্যকার ভূমির সীমানা বিরোধকে কেন্দ্র করে। মুক্তাগাছার জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী এবং বৈলরের জমিদার হেম চন্দ্র রায়ের মধ্যে ‘তালুক ও পরগনা’র সীমানা নির্ধারণ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে এক অভিনব শক্তি পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, এই খেলায় যে জমিদারের প্রজারা জয়ী হবে, তাদের অঞ্চলের জমির পরিমাপ হবে সাড়ে ৬ শতাংশে এক কাঠা। অন্যদিকে, পরাজিত জমিদারের এলাকায় ১০ শতাংশে এক কাঠা হিসেবে জমি পরিমাপ করা হবে। ঐতিহাসিক সেই লড়াইয়ে মুক্তাগাছার জমিদারের প্রজারা জয়লাভ করায় আজও ওই অঞ্চলে সাড়ে ৬ শতাংশে কাঠা হিসেবে জমি কেনাবেচা হয়।

বুধবার সকাল থেকেই উৎসবের আমেজে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে হাজারো খেলোয়াড় খেলার মাঠে জড়ো হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে জনসমুদ্রে পরিণত হয় তেলিগ্রামের বড়ইআটা এলাকা। দুপুর ২টার দিকে লক্ষ্মীপুর গ্রামের দৌলত মোড়লের বাড়ি থেকে প্রায় ৪০ কেজি ওজনের পিতলের তৈরি ‘গুডি’টি বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে মিছিল করে খেলার নির্দিষ্ট সীমানায় নিয়ে আসা হয়। হুম গুডি স্মৃতি সংসদের সভাপতি নাট্যকার আবু বক্কর সিদ্দিক আনুষ্ঠানিকভাবে গুডিটি অবমুক্ত করার সাথে সাথেই শুরু হয় হাজারো মানুষের কাড়াকাড়ি।

খেলোয়াড়রা তাদের শারীরিক শক্তি ও বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে গুডিটি নিজ নিজ অঞ্চলের দিকে টেনে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই প্রতিযোগিতায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে খেলাটি সম্পন্ন হয়। খেলার নিয়ম অনুযায়ী, খেলোয়াড়রা গুডিটি নিয়ে নিজ এলাকায় যাওয়ার পথে এক পর্যায়ে কৌশলে তা লুকিয়ে ফেলেন এবং এর মাধ্যমেই খেলার সমাপ্তি ঘটে।

আয়োজকরা জানান, এটি কেবল একটি খেলা নয়, বরং এ অঞ্চলের মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ। পূর্বপুরুষদের এই ধারা বজায় রাখতে প্রতি বছরই পৌষের শেষ দিনে জাঁকজমকপূর্ণভাবে হুম গুডির আয়োজন করা হয়। এ বছর খেলাটি ২৬৭তম বছরে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই খেলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়, তা এক অনন্য ভ্রাতৃত্বের নিদর্শন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির সেই ঐতিহাসিক ‘হুম গুডি’ খেলায় ফুলবাড়ীয়ায় লাখো মানুষের ঢল

আপডেট সময় : ১০:০১:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় জমিদারি আমলের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহ্যবাহী ‘হুম গুডি’ খেলাকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে উপজেলার তেলিগ্রাম বড়ইআটা গ্রামে আয়োজিত এই প্রাচীন খেলায় অংশ নিতে এবং তা উপভোগ করতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। ফুলবাড়ীয়া ছাড়াও ময়মনসিংহ সদর, মুক্তাগাছা ও ত্রিশাল উপজেলা থেকে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে ভিড় জমান।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় পৌনে তিনশ বছরের পুরনো এই খেলাটির সূচনা হয়েছিল তৎকালীন দুই জমিদারের মধ্যকার ভূমির সীমানা বিরোধকে কেন্দ্র করে। মুক্তাগাছার জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী এবং বৈলরের জমিদার হেম চন্দ্র রায়ের মধ্যে ‘তালুক ও পরগনা’র সীমানা নির্ধারণ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে এক অভিনব শক্তি পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, এই খেলায় যে জমিদারের প্রজারা জয়ী হবে, তাদের অঞ্চলের জমির পরিমাপ হবে সাড়ে ৬ শতাংশে এক কাঠা। অন্যদিকে, পরাজিত জমিদারের এলাকায় ১০ শতাংশে এক কাঠা হিসেবে জমি পরিমাপ করা হবে। ঐতিহাসিক সেই লড়াইয়ে মুক্তাগাছার জমিদারের প্রজারা জয়লাভ করায় আজও ওই অঞ্চলে সাড়ে ৬ শতাংশে কাঠা হিসেবে জমি কেনাবেচা হয়।

বুধবার সকাল থেকেই উৎসবের আমেজে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে হাজারো খেলোয়াড় খেলার মাঠে জড়ো হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে জনসমুদ্রে পরিণত হয় তেলিগ্রামের বড়ইআটা এলাকা। দুপুর ২টার দিকে লক্ষ্মীপুর গ্রামের দৌলত মোড়লের বাড়ি থেকে প্রায় ৪০ কেজি ওজনের পিতলের তৈরি ‘গুডি’টি বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে মিছিল করে খেলার নির্দিষ্ট সীমানায় নিয়ে আসা হয়। হুম গুডি স্মৃতি সংসদের সভাপতি নাট্যকার আবু বক্কর সিদ্দিক আনুষ্ঠানিকভাবে গুডিটি অবমুক্ত করার সাথে সাথেই শুরু হয় হাজারো মানুষের কাড়াকাড়ি।

খেলোয়াড়রা তাদের শারীরিক শক্তি ও বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে গুডিটি নিজ নিজ অঞ্চলের দিকে টেনে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই প্রতিযোগিতায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে খেলাটি সম্পন্ন হয়। খেলার নিয়ম অনুযায়ী, খেলোয়াড়রা গুডিটি নিয়ে নিজ এলাকায় যাওয়ার পথে এক পর্যায়ে কৌশলে তা লুকিয়ে ফেলেন এবং এর মাধ্যমেই খেলার সমাপ্তি ঘটে।

আয়োজকরা জানান, এটি কেবল একটি খেলা নয়, বরং এ অঞ্চলের মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ। পূর্বপুরুষদের এই ধারা বজায় রাখতে প্রতি বছরই পৌষের শেষ দিনে জাঁকজমকপূর্ণভাবে হুম গুডির আয়োজন করা হয়। এ বছর খেলাটি ২৬৭তম বছরে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই খেলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়, তা এক অনন্য ভ্রাতৃত্বের নিদর্শন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।