বহুল আলোচিত সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. হামিদুল আলম মিলনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদ গোপনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে। একই অভিযোগে তার তিন বোন এবং স্ত্রীর নামেও মামলা হয়েছে। মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে এই মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুদকের বগুড়া জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে এই মামলাগুলো দায়ের করেন। দুদকের অভিযোগ, ডিআইজি মিলনের বিরুদ্ধে ৬১ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ৫৬ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, প্রথম মামলায় ডিআইজি মিলনের পাশাপাশি তার তিন বোন মোছা. আজিজা সুলতানা, মোছা. আরেফা সালমা ও মোছা. শিরিন শবনমকে আসামি করা হয়েছে। দ্বিতীয় মামলায় ডিআইজি মিলনের স্ত্রী মোছা. শাহাজাদী আলম লিপিকে প্রধান আসামি করা হয়েছে এবং ডিআইজি মিলনকে সহায়তাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
দুদকের তদন্তে জানা গেছে, ডিআইজি মিলন প্রায় ৮ কোটি ৯৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি অর্জন করেছেন, যা মূলত দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ। তিনি মানিলন্ডারিংয়ের সঙ্গে জড়িত অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ তার মা ও বোনদের নামে জমি ক্রয় দেখিয়ে পরবর্তীতে হেবা সূত্রে নিজের নামে রূপান্তর করে অবৈধ উৎস গোপন করেছেন। এই কাজে তার মা সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে, মিলনের মা মৃত্যুবরণ করায় তাকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদাধিকার ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ডিআইজি মিলন জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৬১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুদকের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, তিনি ২৭ কোটি ৬০ লাখ ৩ হাজার ৯০৫ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তার নিজের এবং তার তিন বোনের সহায়তায় ৮ কোটি ৯৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও স্থানান্তরের অভিযোগও আনা হয়েছে।
অন্যদিকে, ডিআইজি মিলনের স্ত্রী শাহাজাদী আলম লিপির বিরুদ্ধেও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তিনি কমিশন দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ২৬ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৯৭ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন এবং ১৯ কোটি ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৮ টাকার সম্পদের উৎস গোপন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি স্বামীর ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে আরও প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা সম্পদ হস্তান্তরে সহায়তা করেছেন। শাহাজাদী আলম লিপি অবশ্য এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
দুদকের দাখিল করা তথ্য অনুযায়ী, শাহাজাদী আলম লিপি কমিশন দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে অসৎ উদ্দেশ্যে ১৯ কোটি ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৮ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য এবং উৎস গোপন করে মিথ্যা হিসাব ও ভিত্তিহীন ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা ও স্বামীর ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এবং অবৈধ সহায়তায় ২৬ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৯৭ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।
শাহাজাদী আলম লিপির মোট নিট সম্পদের বিপরীতে গ্রহণযোগ্য আয় তুলনামূলকভাবে অপ্রতুল হওয়ায় তার নামে ২৪ কোটি ৫০ লাখ ১২ হাজার ৩৫৪ টাকা মূল্যের জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত সম্পদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এতে সহায়তার অভিযোগে তার স্বামী মো. হামিদুল আলমকেও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও, অবৈধ আয়ের অর্থ দিয়ে শাশুড়ির নামে সম্পত্তি ক্রয় করে পরে হেবার মাধ্যমে নিজের নামে নেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা মূল্যের সম্পদের উৎস আড়াল করার অভিযোগও রয়েছে।
দুদকের বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মাহফুজ ইকবাল জানিয়েছেন, দুদকের দায়ের করা এই মামলাগুলোর তদন্ত দুদক নিজেই করবে।
উল্লেখ্য, শাহাজাদী আলম লিপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেলেও যাচাই-বাছাইয়ে তা বাতিল হয়। পরবর্তীতে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও ডিআইজি হামিদুল আলম সরকারি ছুটি নিয়ে স্ত্রীর নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। এই অভিযোগে গত বছরের ৫ আগস্ট তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এছাড়াও, শাহাজাদী আলম লিপির বিরুদ্ধে অতীতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যার অভিযোগে একটি মামলাও রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























