ঢাকা ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

শীতের সকালে ডালিতে জীবনের উষ্ণতা খোঁজেন পারভীন-পলিরা

ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় যখন প্রকৃতি জেগে ওঠে, শিশির ভেজা ঘাস আর কুয়াশা চাদরে মোড়া নদী তখন এক অন্যরকম রূপ নেয়। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে ভরে ওঠে চারপাশ। এই শান্ত, হিমশীতল পরিবেশে একদল নারী তাদের স্বপ্ন পূরণের তাগিদে ছুটে চলেন। তীব্র শীতকে উপেক্ষা করে, রং-বেরঙের পোশাকে নিজেদের মুড়ে, তারা নেমে পড়েন মাঠে। উদ্দেশ্য – মটর, বইট্টা, র‍্যায় তোলা এবং খেসারি, বুট সংগ্রহ করা। সাথে সবুজ লাউ-কুমড়ার শাক ভাঙাও তাদের কর্মতালিকার অংশ।

রাজশাহীর রাজপাড়া থানার ৭ নং ওয়ার্ডের শ্রীরামপুরের পারভীন-পলিদের জীবন এমনই কর্মব্যস্ততায় মোড়ানো। সূর্যের উষ্ণতা যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মন ভরে ওঠে ডালা ভর্তি তাজা শাক দেখে। এই শাক বিক্রি করেই তাদের সংসারে আগুন জ্বলে, বাজার থেকে আসে চাল-ডাল-তেল। সন্তানদের মুখে খাবার জোটে, তাদের স্কুলে পাঠানোর স্বপ্ন পূরণ হয়, আর বয়স্কদের জন্য কেনা যায় প্রয়োজনীয় ঔষধ।

প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত পর্যন্ত রাজশাহী মহানগরীর সি অ্যান্ড বি মোড়ে ১৪ জন উদ্যমী মায়ের দেখা মেলে। তারা ফুটপাতে পাটি পেতে বসেন, হাতে থাকে শাকের পসরা। কুচিকুচি করে কাটা তাজা শাকগুলো তারা বিক্রি করেন ক্রেতাদের কাছে। এই কাটা শাকগুলো দ্রুত রান্না করা যায় বলে শাক প্রেমীদের কাছে এর চাহিদা বেশ।

তারা বিভিন্ন ধরনের শাক বিভিন্ন দামে বিক্রি করেন। প্রতি কেজি বইট্টা শাক ৬০ টাকা, বুট শাক ১২০ টাকা, খেসারি শাক ১০০ টাকা, সরিষা শাক ৪০ টাকা, এবং রায় শাক ৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়। এছাড়া মেথি শাক ৩০ টাকা, মটর শাক ৩০ টাকা, সজনা শাক ২০-২৫ টাকা, লাউ শাক ৩০ টাকা, লাল শাক ২০ টাকা, এবং সবুজ শাক প্রতি আটি ২০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

সারাদিন শাক বিক্রি করে তাদের দৈনিক আয় ১২’শত থেকে ১৫’শত টাকা। এর মধ্যে কিছু শাক তাদের কিনেও আনতে হয়, যার মূল্য পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে তা দিয়েই চলে তাদের সংসার।

এই সংগ্রামী নারীদের একজন পলি খাতুন। সি অ্যান্ড বি মোড়ে জুলাই স্মৃতি স্তম্ভের সামনে তাকে শাক কাটতে ও বিক্রি করতে দেখা যায়। তিনি জানান, তারা শ্রীরামপুরের ১৪ জন নারী মিলে এখানে শাক বিক্রি করেন। প্রতিদিন ভোরে উঠে তারা শাক সংগ্রহ করেন, কখনো নিজেদের জমিতে হওয়া শাক, কখনো চরের শাক, আবার কখনো বাজার থেকে কিনে আনেন। সারাদিন বিক্রি করে রাতে বাড়ি ফেরেন। দিন শেষে যা উপার্জন করেন তা দিয়েই তাদের দিন কেটে যায়।

৪০ বছর বয়সী পারভীন বেগমও তাদেরই একজন। তিনি জানান, শীতের তীব্রতা তাদের কষ্ট দিলেও, নদীর পাড়ে বা চরে বেড়ে ওঠা শাক তাদের জীবনে সমৃদ্ধি এনে দেয়।

শাক কিনে বাড়ি ফিরছিলেন ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, শীতকালে সারা বছর ধরেই এখানে তাজা শাক পাওয়া যায়। বিক্রেতারা শাকগুলো সুন্দরভাবে কেটে বিক্রি করেন, ফলে বাড়িতে এনে কাটাকাটির কোনো ঝামেলা থাকে না। সহজে রান্না করে খাওয়া যায়। এছাড়া, এই বিষমুক্ত তাজা শাকের স্বাদও দারুণ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিশ্বব্যাপী বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ধাক্কা

শীতের সকালে ডালিতে জীবনের উষ্ণতা খোঁজেন পারভীন-পলিরা

আপডেট সময় : ১০:৩৯:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় যখন প্রকৃতি জেগে ওঠে, শিশির ভেজা ঘাস আর কুয়াশা চাদরে মোড়া নদী তখন এক অন্যরকম রূপ নেয়। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে ভরে ওঠে চারপাশ। এই শান্ত, হিমশীতল পরিবেশে একদল নারী তাদের স্বপ্ন পূরণের তাগিদে ছুটে চলেন। তীব্র শীতকে উপেক্ষা করে, রং-বেরঙের পোশাকে নিজেদের মুড়ে, তারা নেমে পড়েন মাঠে। উদ্দেশ্য – মটর, বইট্টা, র‍্যায় তোলা এবং খেসারি, বুট সংগ্রহ করা। সাথে সবুজ লাউ-কুমড়ার শাক ভাঙাও তাদের কর্মতালিকার অংশ।

রাজশাহীর রাজপাড়া থানার ৭ নং ওয়ার্ডের শ্রীরামপুরের পারভীন-পলিদের জীবন এমনই কর্মব্যস্ততায় মোড়ানো। সূর্যের উষ্ণতা যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মন ভরে ওঠে ডালা ভর্তি তাজা শাক দেখে। এই শাক বিক্রি করেই তাদের সংসারে আগুন জ্বলে, বাজার থেকে আসে চাল-ডাল-তেল। সন্তানদের মুখে খাবার জোটে, তাদের স্কুলে পাঠানোর স্বপ্ন পূরণ হয়, আর বয়স্কদের জন্য কেনা যায় প্রয়োজনীয় ঔষধ।

প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত পর্যন্ত রাজশাহী মহানগরীর সি অ্যান্ড বি মোড়ে ১৪ জন উদ্যমী মায়ের দেখা মেলে। তারা ফুটপাতে পাটি পেতে বসেন, হাতে থাকে শাকের পসরা। কুচিকুচি করে কাটা তাজা শাকগুলো তারা বিক্রি করেন ক্রেতাদের কাছে। এই কাটা শাকগুলো দ্রুত রান্না করা যায় বলে শাক প্রেমীদের কাছে এর চাহিদা বেশ।

তারা বিভিন্ন ধরনের শাক বিভিন্ন দামে বিক্রি করেন। প্রতি কেজি বইট্টা শাক ৬০ টাকা, বুট শাক ১২০ টাকা, খেসারি শাক ১০০ টাকা, সরিষা শাক ৪০ টাকা, এবং রায় শাক ৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়। এছাড়া মেথি শাক ৩০ টাকা, মটর শাক ৩০ টাকা, সজনা শাক ২০-২৫ টাকা, লাউ শাক ৩০ টাকা, লাল শাক ২০ টাকা, এবং সবুজ শাক প্রতি আটি ২০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

সারাদিন শাক বিক্রি করে তাদের দৈনিক আয় ১২’শত থেকে ১৫’শত টাকা। এর মধ্যে কিছু শাক তাদের কিনেও আনতে হয়, যার মূল্য পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে তা দিয়েই চলে তাদের সংসার।

এই সংগ্রামী নারীদের একজন পলি খাতুন। সি অ্যান্ড বি মোড়ে জুলাই স্মৃতি স্তম্ভের সামনে তাকে শাক কাটতে ও বিক্রি করতে দেখা যায়। তিনি জানান, তারা শ্রীরামপুরের ১৪ জন নারী মিলে এখানে শাক বিক্রি করেন। প্রতিদিন ভোরে উঠে তারা শাক সংগ্রহ করেন, কখনো নিজেদের জমিতে হওয়া শাক, কখনো চরের শাক, আবার কখনো বাজার থেকে কিনে আনেন। সারাদিন বিক্রি করে রাতে বাড়ি ফেরেন। দিন শেষে যা উপার্জন করেন তা দিয়েই তাদের দিন কেটে যায়।

৪০ বছর বয়সী পারভীন বেগমও তাদেরই একজন। তিনি জানান, শীতের তীব্রতা তাদের কষ্ট দিলেও, নদীর পাড়ে বা চরে বেড়ে ওঠা শাক তাদের জীবনে সমৃদ্ধি এনে দেয়।

শাক কিনে বাড়ি ফিরছিলেন ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, শীতকালে সারা বছর ধরেই এখানে তাজা শাক পাওয়া যায়। বিক্রেতারা শাকগুলো সুন্দরভাবে কেটে বিক্রি করেন, ফলে বাড়িতে এনে কাটাকাটির কোনো ঝামেলা থাকে না। সহজে রান্না করে খাওয়া যায়। এছাড়া, এই বিষমুক্ত তাজা শাকের স্বাদও দারুণ।