ঢাকা ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিশ্বব্যাপী বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ধাক্কা

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) সংক্রান্ত ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যুক্ত মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বর্তমানে বেড়ে ২ হাজার ৬০২টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের এই সংখ্যাগত বিস্তারের বিপরীতে দেশে নতুন করে আসা ফ্রেশ বা মূলধন বিনিয়োগের গতি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্যাদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে আসা মোট এফডিআই প্রবাহের সবচেয়ে বড় অংশই অর্জিত হচ্ছে অতীতে বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানের অর্জিত মুনাফা বা পুনর্নিয়োগ (Reinvestment) থেকে; কোনো নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগের হিসেবে নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যের বরাতে সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রতিদিন জানায় যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে সর্বমোট ২ হাজার ৬০২টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এফডিআই সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক রিপোর্টিং ব্যবস্থার আওতায় নিবন্ধিত রয়েছে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া দেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিবেশে বিদেশি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের বিস্তারকে নির্দেশ করলেও, প্রকৃতপক্ষে নতুন বিনিয়োগ আসার হার অত্যন্ত সীমিত।

তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে স্পষ্ট দেখা যায়, বিগত ২০২৫ সালে দেশে আসা মোট প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের মধ্যে প্রায় ৪৪ দশমিক ১৫ শতাংশই এসেছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়ের টাকা থেকে। এর সহজ অর্থ হলো—বাংলাদেশে আগে থেকেই যেসব বিদেশি বিনিয়োগকারী ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তাঁরা তাঁদের অর্জিত বার্ষিক লভ্যাংশ বা লাভের বড় অংশ নিজ দেশে ফিরিয়ে না নিয়ে এখানেই পুনরায় বিনিয়োগ করছেন। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ নতুনভাবে বাজারে আসা ইক্যুইটি মূলধনের (New Equity Capital) অংশ ছিল মাত্র ৩১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এর বাইরে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের (Inter-company Loans) অংশ প্রায় ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা মূলত বিদেশের মূল বা মাতৃপ্রতিষ্ঠান থেকে স্থানীয় শাখাকে দেওয়া আর্থিক সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হয়।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রবাহে এক ধরনের বড় বৈষম্য স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী মোট এফডিআই প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গিয়ে প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। তবে এই বৈশ্বিক বিনিয়োগের সিংহভাগ অংশই ধাবিত হয়েছে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৪৩ শতাংশ। এর সম্পূর্ণ বিপরীতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সার্বিক এফডিআই প্রবাহ প্রায় ২ শতাংশ কমে গিয়েছে। ফলে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য উদীয়মান উন্নয়নশীল দেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন বিদেশি মূলধন আকর্ষণের কাজটি দিন দিন আরও বেশি কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে।

সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ইতিবাচক উপস্থিতি ও ক্ষেত্র প্রসারিত হলেও নতুন মূলধন বা সরাসরি অর্থ প্রবাহের গতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দেশে অবস্থানরত বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগের ওপর জাতীয় নির্ভরতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা স্বল্পমেয়াদি অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় আকারের শিল্পায়ন ও নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কার উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা।

এই সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা চালানো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নতুন কোনো ‘ফ্রেশ টাকা’ বা বড় ইক্যুইটি মূলধন না আসাটা আমাদের অর্থনীতি ও নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

বর্তমানে প্রাপ্ত বিনিয়োগের সিংহভাগ অংশই আসছে পুরোনো বিদেশি উদ্যোক্তাদের পুনঃবিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে। বিশ্বব্যাপী উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের প্রতিযোগিতা বহুলাংশে বেড়ে গেছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে বিপুল কর্মসংস্থান ও টেকসই বড় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে কেবল পুরোনো কোম্পানির ভরসায় বসে না থেকে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা সহজীকরণের (Ease of Doing Business) মাধ্যমে দ্রুত নতুন নতুন বিশ্বমানের বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জমি দখল, ঘুষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীদের নিয়ে অনৈতিক কাজের গোপন তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিশ্বব্যাপী বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ধাক্কা

আপডেট সময় : ১০:৩২:০০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) সংক্রান্ত ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যুক্ত মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বর্তমানে বেড়ে ২ হাজার ৬০২টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের এই সংখ্যাগত বিস্তারের বিপরীতে দেশে নতুন করে আসা ফ্রেশ বা মূলধন বিনিয়োগের গতি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্যাদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে আসা মোট এফডিআই প্রবাহের সবচেয়ে বড় অংশই অর্জিত হচ্ছে অতীতে বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানের অর্জিত মুনাফা বা পুনর্নিয়োগ (Reinvestment) থেকে; কোনো নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগের হিসেবে নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যের বরাতে সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রতিদিন জানায় যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে সর্বমোট ২ হাজার ৬০২টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এফডিআই সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক রিপোর্টিং ব্যবস্থার আওতায় নিবন্ধিত রয়েছে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া দেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিবেশে বিদেশি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের বিস্তারকে নির্দেশ করলেও, প্রকৃতপক্ষে নতুন বিনিয়োগ আসার হার অত্যন্ত সীমিত।

তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে স্পষ্ট দেখা যায়, বিগত ২০২৫ সালে দেশে আসা মোট প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের মধ্যে প্রায় ৪৪ দশমিক ১৫ শতাংশই এসেছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়ের টাকা থেকে। এর সহজ অর্থ হলো—বাংলাদেশে আগে থেকেই যেসব বিদেশি বিনিয়োগকারী ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তাঁরা তাঁদের অর্জিত বার্ষিক লভ্যাংশ বা লাভের বড় অংশ নিজ দেশে ফিরিয়ে না নিয়ে এখানেই পুনরায় বিনিয়োগ করছেন। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ নতুনভাবে বাজারে আসা ইক্যুইটি মূলধনের (New Equity Capital) অংশ ছিল মাত্র ৩১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এর বাইরে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের (Inter-company Loans) অংশ প্রায় ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা মূলত বিদেশের মূল বা মাতৃপ্রতিষ্ঠান থেকে স্থানীয় শাখাকে দেওয়া আর্থিক সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হয়।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রবাহে এক ধরনের বড় বৈষম্য স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী মোট এফডিআই প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গিয়ে প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। তবে এই বৈশ্বিক বিনিয়োগের সিংহভাগ অংশই ধাবিত হয়েছে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৪৩ শতাংশ। এর সম্পূর্ণ বিপরীতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সার্বিক এফডিআই প্রবাহ প্রায় ২ শতাংশ কমে গিয়েছে। ফলে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য উদীয়মান উন্নয়নশীল দেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন বিদেশি মূলধন আকর্ষণের কাজটি দিন দিন আরও বেশি কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে।

সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ইতিবাচক উপস্থিতি ও ক্ষেত্র প্রসারিত হলেও নতুন মূলধন বা সরাসরি অর্থ প্রবাহের গতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দেশে অবস্থানরত বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগের ওপর জাতীয় নির্ভরতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা স্বল্পমেয়াদি অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় আকারের শিল্পায়ন ও নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কার উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা।

এই সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা চালানো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নতুন কোনো ‘ফ্রেশ টাকা’ বা বড় ইক্যুইটি মূলধন না আসাটা আমাদের অর্থনীতি ও নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

বর্তমানে প্রাপ্ত বিনিয়োগের সিংহভাগ অংশই আসছে পুরোনো বিদেশি উদ্যোক্তাদের পুনঃবিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে। বিশ্বব্যাপী উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের প্রতিযোগিতা বহুলাংশে বেড়ে গেছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে বিপুল কর্মসংস্থান ও টেকসই বড় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে কেবল পুরোনো কোম্পানির ভরসায় বসে না থেকে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা সহজীকরণের (Ease of Doing Business) মাধ্যমে দ্রুত নতুন নতুন বিশ্বমানের বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে হবে।