ঢাকা ০৭:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: ১৫ বছরের দীর্ঘসূত্রতা নাকি অন্তহীন মানবিক সংকট?

মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছেই না। বর্তমান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ২০১৭ সালেই যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, আজ তা এক রূঢ় বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তখন তিনি বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে অন্তত ১৫ বছরের প্রস্তুতির প্রয়োজন এবং ১-২ বছরের মধ্যে তারা ফিরে যাবে এমনটা ভাবা ভুল। তাঁর সেই হিসাব অনুযায়ী, ২০৩২ সালের আগে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ক্রমাগত সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে এক নতুন ও ভয়াবহ মানবিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।

গত এক বছরে নতুন করে আরও ১ লাখ ৩৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যা প্রত্যাবাসনের স্বপ্নকে আরও ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। রাখাইন রাজ্যে টেকসই পরিবেশ তৈরি না হওয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর ধীরে ধীরে অন্য বৈশ্বিক সংকটে সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক ‘টিকিং টাইম বোমা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও বড় বড় উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার প্রকৃত প্রাপ্তি এখন পর্যন্ত শূন্য। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুবার প্রত্যাবাসন শুরুর তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হলেও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা এবং রাখাইনে নিরাপত্তার অভাবে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরতে রাজি হয়নি। বর্তমানে মিয়ানমারের জান্তা সরকার আট লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে এক লাখ ৮০ হাজার জনকে ফেরত নেওয়ার যোগ্য বলে শনাক্ত করেছে এবং আরও ৭০ হাজার জনের তথ্য যাচাই-বাছাই করছে। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান তীব্র লড়াই সেই প্রক্রিয়াকে কার্যত অচল করে দিয়েছে। রাখাইন রাজ্যের বর্তমান মানবিক পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়; সেখানে খাদ্য, বিদ্যুৎ ও মৌলিক সম্পদের চরম ঘাটতি রয়েছে, যা প্রত্যাবাসনের জন্য কোনোভাবেই অনুকূল নয়।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, এটি এখন আর কেবল মানবিক সমস্যা নয়, বরং একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি। ক্যাম্পগুলোতে থাকা ৫ থেকে ৭ লাখ তরুণ যখন দেখবে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই বা তারা একটি ঘেরাটোপের মধ্যে আটকা পড়ে আছে, তখন তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা চরম হুমকিতে পড়ছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জন্য প্রয়োজনীয় ৯৪ কোটি মার্কিন ডলারের মাত্র ৬০ শতাংশ সহায়তা পাওয়া গেছে। এই অর্থ সংকট অব্যাহত থাকলে ক্যাম্পের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও জীবন রক্ষাকারী পরিষেবাগুলো অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের সঙ্গেও সংঘাত তৈরি করতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন এবং জাতিসংঘ মহাসচিবকেও ক্যাম্প পরিদর্শনে নিয়ে এসেছেন। তবে মাঠ পর্যায়ে কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। মিয়ানমারে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির মনে করেন, এই সমস্যার সমাধান সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং পরাশক্তিগুলোর ভূমিকার ওপর। দ্রুত কোনো কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি না হলে তৌহিদ হোসেনের সেই ‘১৫ বছরের প্রস্তুতির’ ভবিষ্যদ্বাণী হয়তো এক দীর্ঘস্থায়ী তিক্ত বাস্তবতায় রূপ নিতে যাচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সিনেমা হলের বন্ধের স্রোতে আশার আলো: ঈদে আসছে তিন নতুন মাল্টিপ্লেক্স

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: ১৫ বছরের দীর্ঘসূত্রতা নাকি অন্তহীন মানবিক সংকট?

আপডেট সময় : ০২:৩০:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছেই না। বর্তমান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ২০১৭ সালেই যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, আজ তা এক রূঢ় বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তখন তিনি বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে অন্তত ১৫ বছরের প্রস্তুতির প্রয়োজন এবং ১-২ বছরের মধ্যে তারা ফিরে যাবে এমনটা ভাবা ভুল। তাঁর সেই হিসাব অনুযায়ী, ২০৩২ সালের আগে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ক্রমাগত সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে এক নতুন ও ভয়াবহ মানবিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।

গত এক বছরে নতুন করে আরও ১ লাখ ৩৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যা প্রত্যাবাসনের স্বপ্নকে আরও ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। রাখাইন রাজ্যে টেকসই পরিবেশ তৈরি না হওয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর ধীরে ধীরে অন্য বৈশ্বিক সংকটে সরে যাওয়ায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক ‘টিকিং টাইম বোমা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও বড় বড় উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার প্রকৃত প্রাপ্তি এখন পর্যন্ত শূন্য। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুবার প্রত্যাবাসন শুরুর তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হলেও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা এবং রাখাইনে নিরাপত্তার অভাবে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরতে রাজি হয়নি। বর্তমানে মিয়ানমারের জান্তা সরকার আট লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে এক লাখ ৮০ হাজার জনকে ফেরত নেওয়ার যোগ্য বলে শনাক্ত করেছে এবং আরও ৭০ হাজার জনের তথ্য যাচাই-বাছাই করছে। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান তীব্র লড়াই সেই প্রক্রিয়াকে কার্যত অচল করে দিয়েছে। রাখাইন রাজ্যের বর্তমান মানবিক পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়; সেখানে খাদ্য, বিদ্যুৎ ও মৌলিক সম্পদের চরম ঘাটতি রয়েছে, যা প্রত্যাবাসনের জন্য কোনোভাবেই অনুকূল নয়।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, এটি এখন আর কেবল মানবিক সমস্যা নয়, বরং একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি। ক্যাম্পগুলোতে থাকা ৫ থেকে ৭ লাখ তরুণ যখন দেখবে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই বা তারা একটি ঘেরাটোপের মধ্যে আটকা পড়ে আছে, তখন তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা চরম হুমকিতে পড়ছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জন্য প্রয়োজনীয় ৯৪ কোটি মার্কিন ডলারের মাত্র ৬০ শতাংশ সহায়তা পাওয়া গেছে। এই অর্থ সংকট অব্যাহত থাকলে ক্যাম্পের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও জীবন রক্ষাকারী পরিষেবাগুলো অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের সঙ্গেও সংঘাত তৈরি করতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন এবং জাতিসংঘ মহাসচিবকেও ক্যাম্প পরিদর্শনে নিয়ে এসেছেন। তবে মাঠ পর্যায়ে কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। মিয়ানমারে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির মনে করেন, এই সমস্যার সমাধান সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং পরাশক্তিগুলোর ভূমিকার ওপর। দ্রুত কোনো কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি না হলে তৌহিদ হোসেনের সেই ‘১৫ বছরের প্রস্তুতির’ ভবিষ্যদ্বাণী হয়তো এক দীর্ঘস্থায়ী তিক্ত বাস্তবতায় রূপ নিতে যাচ্ছে।