বাংলাদেশে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী না হলে এবং ‘না’ জয়যুক্ত হলে আবারও ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন ঘটবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সুশীল সমাজের একাংশ। তাদের মতে, ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন ঠেকাতে ও দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই গণভোটের আয়োজন। সম্প্রতি ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’ আয়োজিত ‘গণভোট ২০২৬ কী ও কেন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এই বিতর্ক সামনে আসে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের অন্য প্রতিনিধিরা বলছেন, গণভোটের ফলাফল ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন ঠেকানোর একটি পূর্বশর্ত হলেও এটি একমাত্র শর্ত নয়। তাদের মতে, ফ্যাসিবাদ মূলত আচরণগত পরিবর্তন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার মধ্য দিয়েই ফিরে আসে।
সাবেক ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শরীফুজ্জামান শরীফ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, “‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে ফ্যাসিবাদের ফিরে আসা বা তাকে রুখে দেওয়া সম্ভব নয়। ফ্যাসিবাদ তৈরি হয় সরকারের জনবিচ্ছিন্নতা, প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং আচরণের ভেতর থেকে।” তিনি গণভোটের বর্তমান পদ্ধতিকে দার্শনিকগতভাবে সমর্থন করেন না জানিয়ে বলেন, “যে পদ্ধতিতে সংবিধান পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, তা সংবিধানসম্মত নয়, বরং অবৈধ। সরকার কখনও গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে না। এতে পক্ষপাতিত্বের শঙ্কা থাকে এবং সরকার তার পুরো শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ফলাফল প্রভাবিত করতে পারে।” তিনি আরও ধারণা করেন, ফ্যাসিস্ট বলতে তৎকালীন আওয়ামী লীগকে চিহ্নিত করেই এই কাজটি করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক প্রকাশিত জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি দলের ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন বন্ধ করা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ গঠন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য সৃষ্টি এবং অপরাধীদের ক্ষমা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিতকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা রয়েছে। বিএনপি এই সনদে সই করলেও ৯টি প্রস্তাবে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) জানিয়েছে।
গোলটেবিল অনুষ্ঠানের শুরুতে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গণভোটের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত করেন এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে দেশবাসীর সুবিধাগুলো তুলে ধরেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “‘হ্যাঁ’তে ভোট না দিলে দেশ ভবিষ্যতে আবারও ফ্যাসিবাদীদের হাতে চলে যাবে। এ জন্য পরিবার থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদেরও গণভোটের সুবিধা সম্পর্কে বোঝাতে হবে।” তিনি ‘ফ্যাসিজমের মধ্য দিয়ে পূর্ববর্তী সব সরকার গিয়েছে’ উল্লেখ করে বলেন, “‘হ্যাঁ’ ভোটে যদি না জেতে, তাহলে ফ্যাসিবাদ ফিরবেই।” তিনি শেখ হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণকে নির্বাচনের মাধ্যমে হলেও, আমৃত্যু প্রধানমন্ত্রী থাকার আকাঙ্ক্ষা এবং পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের চেষ্টা, নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়ন ও পঞ্চদশ সংশোধনের সমালোচনা করেন। এটিকে তিনি ক্যান্সারের মতো উল্লেখ করে বলেন, আক্রান্ত হওয়ার পর নির্মূল না করলে তা ছড়িয়ে পড়বে এবং পুরনো পথে হেঁটে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা যাবে না।
ড. মজুমদার কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন, যেমন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার। তার মতে, ‘না’ ভোট জিতলে এই জরুরি সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো সম্ভব হবে না এবং পুরনো প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। তবে তিনি এও স্বীকার করেন যে, শুধু এসব বদলালেই যে সব ঠিক হয়ে যাবে, এমনটা নয়, কারণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে এবং সহনশীলতার অভাব প্রকট। গণভোটকে তিনি এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটি চেষ্টা হিসেবে দেখেন।
এদিকে, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজও গণভোটকে ‘বাংলাদেশ যাতে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় আর ফিরে না যায়, সে জন্যই এবারের গণভোট’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি কৃষি বিভাগের ১৭ হাজার কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীকে গণভোট বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেন, “এই সুযোগ আগামী ৫ কিংবা ১০ বছরে আর আসবে না। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কীভাবে চলবে, তা ঠিক করে দেওয়ার এই সুযোগকে কাজে লাগাতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
ফ্যাসিজমকে বিলুপ্ত করতে ‘হ্যাঁ’ ভোটের ভূমিকা প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটি একটি পূর্বশর্ত, আবশ্যক ও অপরিহার্য। কিন্তু যথেষ্ট নয়। মূল বিষয় হলো চর্চা। গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন হলেও, যদি তা চর্চায় আনা না যায়, তাহলে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না। তিনি বলেন, “আমাদের দেশে এর আগেও সংবিধান সংশোধন হয়েছে, কিন্তু তা বারবার লঙ্ঘিতও হয়েছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আইন থাকলেও আইনের সবচেয়ে বেশি ব্যত্যয়ও এখানেই দেখা যায়। তাই জুলাই আন্দোলন ও জুলাই সনদের চেতনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হলেই কেবল প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব।”
রিপোর্টারের নাম 

























