বাংলাদেশে গত দেড় দশকে ঘটে যাওয়া গুমের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল শাসনের একটি সুপরিকল্পিত হাতিয়ার। ‘জোরপূর্বক গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন’ গতকাল রোববার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র—যেখানে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আনুমানিক চার থেকে ছয় হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। কমিশন ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টিকে গুমের ‘সম্ভাব্য’ মামলা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদন গ্রহণকালে প্রধান উপদেষ্টা একে ‘পৈশাচিকতার ডকুমেন্টেশন’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, গণতন্ত্রের লেবাস পরে একটি জাতি হিসেবে আমরা কতটা নিচে নামতে পারি, এটি তারই প্রমাণ।
তদন্তে গুমের পেছনে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি গুমের নির্দেশদাতা ছিলেন। এছাড়া তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। প্রতিবেদনে ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম এবং আবদুল্লাহিল আমান আযমীর মতো হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিদের গুমের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি গুমের শিকার ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে প্রতিবেশী দেশে হস্তান্তরের (রেন্ডিশন) মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্যাটাগরি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফিরে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই জামায়াত-শিবিরের এবং ২২ শতাংশ বিএনপির নেতাকর্মী। আবার যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের ৬৮ শতাংশ বিএনপির সঙ্গে যুক্ত। এটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমনে গুমকে একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। নির্যাতনের স্থান হিসেবে ‘আয়নাঘর’ ছাড়াও বরিশালের বলেশ্বর নদী, বুড়িগঙ্গা ও মুন্সীগঞ্জকে লাশ গুমের প্রধান এলাকা হিসেবে ম্যাপিং করেছে কমিশন। বিশেষ করে বলেশ্বর নদীতে শত শত ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলে দেওয়ার পৈশাচিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে দায়ী সংস্থাগুলোর মধ্যে ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে র্যাব, ২৩ শতাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ এবং ১৪.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ডিবি পুলিশের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই নৃশংসতার বিচার এবং ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য কঠোর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন। কমিশনের সদস্যরা ভিকটিমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই প্রতিবেদন কেবল অতীতের ক্ষত উন্মোচন নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে।
রিপোর্টারের নাম 






















