প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী বলেছেন, আমরা যখন সেক্রেটারিয়েট গঠনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগের পথে যাত্রা শুরু করছি, তখন আমি বিচার বিভাগের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখবে— এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করি, বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে।
রবিবার (৪ জানুয়ারি) সংবর্ধনার জবাবে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এসব কথা বলেন। আপিল বিভাগের এক নম্বর বিচারকক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
বিচার অঙ্গনে আগত বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা ও কল্যাণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী জানিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি বারের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করতে চাই— বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনকে আহ্বান জানাই, যেন তারা আইনজীবীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করেন। এই মহান পেশার মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য আমি সব আইনজীবীর প্রতি আহ্বান জানাই। আদালত প্রাঙ্গণের ভেতরে ও বাইরে পেশাগত আচরণের ক্ষেত্রে আইনজীবীদের স্মরণ করিয়ে দেন প্রধান বিচারপতি। দেশকে বসবাসের জন্য একটি উত্তম স্থানে পরিণত করতে চেষ্টা করি, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শান্তি ও সমৃদ্ধির সঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে, প্রধান বিচারপতি উল্লেখ করেন।
আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, আদালতের মামলা জট কমাতে হলে— মিথ্যা মামলা দায়ের বন্ধ করতে হবে। বিচার বিভাগকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। সিন্ডিকেট মুক্ত করতে হবে। আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মানের লক্ষ্যে বিচার বিভাগের প্রতি নতুন প্রজন্ম এবং গণমানুষের যে আশা আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তার প্রতিফলন ঘটানো অত্যাবশ্যক।
প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে ব্যারিস্টার খোকন বলেন, আমরা আশা করি, আপনি বিচার বিভাগকে প্রভাবমুক্ত করে সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিত করবেন। নাগরিকের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। মামলা পরিচালনার দীর্ঘসূত্রতা দূর করবেন এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। সমাজের সব স্তরে বৈষম্য দূর করার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকবেন। গত ১৬ বছরের গুম, হত্যা, মিথ্যা মামলার ব্যাপারে আপনি আমলে আনবেন।
তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগের যেকোনও সিন্ডিকেট বন্ধ করতে হবে, দূর্নীর্তি বন্ধ করতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুনভাবে দেশ গড়ার প্রত্যয় ও বিচার বিভাগকে সংস্কারের মধ্য দিয়ে যে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ হাঁটছে, সেই যাত্রায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিকে সব সময় আপনার পাশে পাবেন।
এর আগে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বরত ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিচার বিভাগে সুবিচারের পরিবর্তে অবিচারই প্রাধান্য পেয়েছিল। এ সময় বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করা হয়। বিচার বিভাগ অনেকক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়নের হাতিয়ার হয়েছিল।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বিচারপ্রার্থী অসহায়, নিপীড়িত মানুষের আহাজারি আদালতের মনে আঁচর কাটতে পারেনি। ফলে বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদেছে। নারী, পুরুষ এবং শিশুদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিচার বিভাগ সেই অত্যাচারিত মানুষের পাশে ন্যায়ের ঝান্ডা নিয়ে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে।
আরশাদুর রউফ বলেন, জনগণের আশা-আকাংখার সর্বশেষ ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল আদালত। যার জন্য জুডিশিয়াল রিভিউয়ের ক্ষমতা উচ্চ আদালতের কাছে রাখা হয়েছে। কিন্তু বিগত স্বৈরশাসনের সময়ে সেখানে অসহায় মানুষের ঠাঁই হয়নি।
গত ১৫ বছরে বিচার বিভাগের রন্দ্রে রন্দ্রে দুর্নীতির সয়লাব বয়ে গিয়েছিল। বিচারের কারণবিহীন দীর্ঘসূত্রতা এবং উদ্দেশ্যমূলক অতি দ্রুত বিচার দুটোই বিচার বিভাগকে আশঙ্কায় ফেলে দিয়েছিল। বিচার বিভাগ তার স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছিল। ফলে বিচার বিভাগ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশার কবর রচিত হয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সফল বিপ্লবের পর এক অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে যায়। বিচার বিভাগ হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরে পায়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতি, সিনিয়র আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 

























