ঢাকা ০৫:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জয়শঙ্করের সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই বৈরিতার প্রকাশ

খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকা সফরের পর সম্পর্কের বরফ গলার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এক সপ্তাহ না পেরোতেই মিলিয়ে গেছে। বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগকে কেন্দ্র করে আইপিএল থেকে একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছে বিসিসিআই। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে ঢাকার প্রতি দিল্লির বৈরী মনোভাব আদতে অপরিবর্তিতই রয়েছে এবং তারা ক্রিকেটকে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা নিয়ে এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভারত হয়তো বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে যাচ্ছে। কিন্তু এর মাত্র কয়েক দিন পরই মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে দিল্লির কঠোর ও বৈরী অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ভারত মুখে সম্পর্কোন্নয়নের কথা বললেও বাস্তবে তারা বাংলাদেশকে একটি বৈরী রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের মতে, ভারতের বর্তমান সমাজব্যবস্থা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় এমনভাবে বদলে গেছে যে তারা একটি মুসলিমপ্রধান দেশকে সুপ্রতিবেশী হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। ক্রিকেট খেলাকে জিম্মি করে মোস্তাফিজকে যেভাবে টার্গেট করা হয়েছে, তা কোনো সুস্থ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উদাহরণ হতে পারে না।

বিসিসিআইয়ের সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া জানিয়েছেন, ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতির’ কারণে মোস্তাফিজকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মূলত উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠনগুলোর উসকানিতে বিজেপি ও শিবসেনার মতো দলগুলো এই দাবিতে সরব হয়। বিজেপি নেতা সঙ্গীত সোম ও শিবসেনা নেতা সঞ্জয় নিরুপম সরাসরি কেকেআর মালিক শাহরুখ খানকে হুমকি দিয়ে মোস্তাফিজকে বের করে দেওয়ার দাবি জানান। এমনকি কংগ্রেস নেত্রী সুপ্রিয়া শিরনাতেও এই বিতর্কে যোগ দিয়ে বিসিসিআই প্রধান জয় শাহর কাছে কৈফিয়ত তলব করেন।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামান মনে করেন, ভারত মূলত কৌশলগত কারণে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে, কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে চীন ও পাকিস্তান থেকে দূরে রাখা। জয়শঙ্করের চিঠি বা শ্রদ্ধা নিবেদন ছিল দিল্লির একটি ‘প্রতারণামূলক’ কৌশল। মোস্তাফিজের বহিষ্কারই প্রমাণ করে যে ভারত বাংলাদেশকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে রাজি নয়।

এদিকে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে দিল্লির এই পদক্ষেপগুলোকে রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত করার কিছু নেই। ভারতের এই চরমপন্থি আচরণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইছে তীব্র নিন্দার ঝড় এবং অনেক ক্ষেত্রে আইপিএল বয়কটের ডাক দেওয়া হচ্ছে।

৫টি প্রধান কারণ যা দিল্লির অনমনীয় মনোভাব প্রকাশ করে:

১. ক্রীড়ায় রাজনীতি: অক্রিকেটীয় কারণে আইপিএল থেকে বাংলাদেশি খেলোয়াড় বহিষ্কার।
২. তথ্য সন্ত্রাস: বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ভুয়‍া খবরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন।
৩. উগ্রবাদের তোষণ: উগ্রবাদী ধর্মীয় নেতাদের চাপের কাছে বিসিসিআই-এর নতি স্বীকার।
৪. রাজনৈতিক দ্বিমুখী নীতি: একদিকে বন্ধুত্বের চিঠি, অন্যদিকে সীমান্ত ও বাণিজ্যক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ।
৫. মনস্তাত্ত্বিক বৈরিতা: ভারতের সাধারণ জনগণের মধ্যে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়া।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষকদের অন্য পেশায় যুক্ত হতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি আবশ্যক: শিক্ষামন্ত্রী

জয়শঙ্করের সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই বৈরিতার প্রকাশ

আপডেট সময় : ০১:৩৪:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকা সফরের পর সম্পর্কের বরফ গলার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এক সপ্তাহ না পেরোতেই মিলিয়ে গেছে। বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগকে কেন্দ্র করে আইপিএল থেকে একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছে বিসিসিআই। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে ঢাকার প্রতি দিল্লির বৈরী মনোভাব আদতে অপরিবর্তিতই রয়েছে এবং তারা ক্রিকেটকে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা নিয়ে এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভারত হয়তো বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে যাচ্ছে। কিন্তু এর মাত্র কয়েক দিন পরই মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে দিল্লির কঠোর ও বৈরী অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ভারত মুখে সম্পর্কোন্নয়নের কথা বললেও বাস্তবে তারা বাংলাদেশকে একটি বৈরী রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের মতে, ভারতের বর্তমান সমাজব্যবস্থা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় এমনভাবে বদলে গেছে যে তারা একটি মুসলিমপ্রধান দেশকে সুপ্রতিবেশী হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। ক্রিকেট খেলাকে জিম্মি করে মোস্তাফিজকে যেভাবে টার্গেট করা হয়েছে, তা কোনো সুস্থ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উদাহরণ হতে পারে না।

বিসিসিআইয়ের সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া জানিয়েছেন, ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতির’ কারণে মোস্তাফিজকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মূলত উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠনগুলোর উসকানিতে বিজেপি ও শিবসেনার মতো দলগুলো এই দাবিতে সরব হয়। বিজেপি নেতা সঙ্গীত সোম ও শিবসেনা নেতা সঞ্জয় নিরুপম সরাসরি কেকেআর মালিক শাহরুখ খানকে হুমকি দিয়ে মোস্তাফিজকে বের করে দেওয়ার দাবি জানান। এমনকি কংগ্রেস নেত্রী সুপ্রিয়া শিরনাতেও এই বিতর্কে যোগ দিয়ে বিসিসিআই প্রধান জয় শাহর কাছে কৈফিয়ত তলব করেন।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামান মনে করেন, ভারত মূলত কৌশলগত কারণে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে, কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে চীন ও পাকিস্তান থেকে দূরে রাখা। জয়শঙ্করের চিঠি বা শ্রদ্ধা নিবেদন ছিল দিল্লির একটি ‘প্রতারণামূলক’ কৌশল। মোস্তাফিজের বহিষ্কারই প্রমাণ করে যে ভারত বাংলাদেশকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে রাজি নয়।

এদিকে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে দিল্লির এই পদক্ষেপগুলোকে রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত করার কিছু নেই। ভারতের এই চরমপন্থি আচরণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইছে তীব্র নিন্দার ঝড় এবং অনেক ক্ষেত্রে আইপিএল বয়কটের ডাক দেওয়া হচ্ছে।

৫টি প্রধান কারণ যা দিল্লির অনমনীয় মনোভাব প্রকাশ করে:

১. ক্রীড়ায় রাজনীতি: অক্রিকেটীয় কারণে আইপিএল থেকে বাংলাদেশি খেলোয়াড় বহিষ্কার।
২. তথ্য সন্ত্রাস: বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ভুয়‍া খবরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন।
৩. উগ্রবাদের তোষণ: উগ্রবাদী ধর্মীয় নেতাদের চাপের কাছে বিসিসিআই-এর নতি স্বীকার।
৪. রাজনৈতিক দ্বিমুখী নীতি: একদিকে বন্ধুত্বের চিঠি, অন্যদিকে সীমান্ত ও বাণিজ্যক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ।
৫. মনস্তাত্ত্বিক বৈরিতা: ভারতের সাধারণ জনগণের মধ্যে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়া।