ঢাকা ০৫:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪৪:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ও শোকাতুর বিদায়ের সাক্ষী হলো জাতি। বছরের শেষ দিনে পুরো দেশকে অশ্রুসিক্ত করে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আজীবন যিনি ঐক্যের রাজনীতির কথা বলে গেছেন, তাঁর প্রস্থানও যেন পুরো জাতিকে এক অবিচ্ছেদ্য ঐক্যের সুতায় গেঁথে দিয়ে গেল। দলমত নির্বিশেষে কোটি মানুষের জানাজায় অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে, এ দেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি কতটা শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ধাপে ধাপে নিজের ত্যাগ ও আদর্শের মাধ্যমেই তিনি মানুষের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা অর্জন করেছেন।

বেগম জিয়া শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও আদর্শ এখনো অম্লান। বর্তমান সময়ের অস্থির ও অসহিষ্ণু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর পরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের নীতি অনুসরণ করা একান্ত জরুরি। প্রতিহিংসার উন্মত্ততা ও পেশিশক্তির দাপটের বিপরীতে তিনি হতে পারেন আমাদের প্রধান পথপ্রদর্শক। তাঁর আদর্শ ধারণ করার অর্থ এই নয় যে সবাইকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলে শামিল হতে হবে; বরং একজন নাগরিক হিসেবে ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, শালীনতা রক্ষা এবং প্রতিহিংসার বদলে ধৈর্য ও ত্যাগের রাজনীতির চর্চা করাই হলো তাঁর আদর্শকে লালন করা। কদর্য ও কুরুচিপূর্ণ ভাষার পরিবর্তে রুচিশীল ও মার্জিত রাজনীতির যে ধারা তিনি প্রবর্তন করেছেন, তা আজকের প্রজন্মের জন্য বিশেষভাবে অনুকরণীয়।

দীর্ঘ ৪৪ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় বেগম খালেদা জিয়া কখনোই বিরুদ্ধ মতকে শক্তি দিয়ে দমনের চেষ্টা করেননি। তাঁর নিজস্ব প্রখর রাজনৈতিক আদর্শ থাকলেও ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি তিনি সবসময় মমতা ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সংকটময় মুহূর্তে দেশের স্বার্থে যেকোনো শর্তহীন বৈঠকে বসা থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে ফেরার সিদ্ধান্ত—সবই তাঁর রাজনৈতিক উদারতার পরিচয় দেয়। এছাড়া ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন সরকারের অমানুষিক নির্যাতন ও দেশত্যাগের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করা তাঁকে ইতিহাসের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বিগত ১৭ বছর ধরে নানা জেল-জুলুম, মিথ্যা মামলা এবং উন্নত চিকিৎসায় বঞ্চনার শিকার হয়েও তিনি তাঁর নীতি থেকে একচুল নড়েননি। দীর্ঘ নির্যাতনের পরও তিনি প্রতিহিংসাপরায়ণ হননি বা প্রতিপক্ষের প্রতি কোনো বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করেননি। তাঁর এই আপসহীন সংগ্রাম ও অসীম ধৈর্য শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাংলাদেশের ঐক্যের প্রতীকে পরিণত করেছে। সামনের সাধারণ নির্বাচন যেন বেগম জিয়ার এই মহান আদর্শ বাস্তবায়নের একটি মঞ্চ হয়, সেটিই এখন দেশবাসীর প্রত্যাশা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কদর্য ভাষা বর্জন এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রচারণার মাধ্যমেই তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব। প্রতিহিংসার আগুনের বদলে যদি সম্প্রীতির দেশ গড়া যায়, তবেই বেগম খালেদা জিয়ার লালিত স্বপ্ন সার্থক হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষকদের অন্য পেশায় যুক্ত হতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি আবশ্যক: শিক্ষামন্ত্রী

জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ

আপডেট সময় : ১০:৪৪:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ও শোকাতুর বিদায়ের সাক্ষী হলো জাতি। বছরের শেষ দিনে পুরো দেশকে অশ্রুসিক্ত করে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আজীবন যিনি ঐক্যের রাজনীতির কথা বলে গেছেন, তাঁর প্রস্থানও যেন পুরো জাতিকে এক অবিচ্ছেদ্য ঐক্যের সুতায় গেঁথে দিয়ে গেল। দলমত নির্বিশেষে কোটি মানুষের জানাজায় অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে, এ দেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি কতটা শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ধাপে ধাপে নিজের ত্যাগ ও আদর্শের মাধ্যমেই তিনি মানুষের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা অর্জন করেছেন।

বেগম জিয়া শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও আদর্শ এখনো অম্লান। বর্তমান সময়ের অস্থির ও অসহিষ্ণু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর পরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের নীতি অনুসরণ করা একান্ত জরুরি। প্রতিহিংসার উন্মত্ততা ও পেশিশক্তির দাপটের বিপরীতে তিনি হতে পারেন আমাদের প্রধান পথপ্রদর্শক। তাঁর আদর্শ ধারণ করার অর্থ এই নয় যে সবাইকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলে শামিল হতে হবে; বরং একজন নাগরিক হিসেবে ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, শালীনতা রক্ষা এবং প্রতিহিংসার বদলে ধৈর্য ও ত্যাগের রাজনীতির চর্চা করাই হলো তাঁর আদর্শকে লালন করা। কদর্য ও কুরুচিপূর্ণ ভাষার পরিবর্তে রুচিশীল ও মার্জিত রাজনীতির যে ধারা তিনি প্রবর্তন করেছেন, তা আজকের প্রজন্মের জন্য বিশেষভাবে অনুকরণীয়।

দীর্ঘ ৪৪ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় বেগম খালেদা জিয়া কখনোই বিরুদ্ধ মতকে শক্তি দিয়ে দমনের চেষ্টা করেননি। তাঁর নিজস্ব প্রখর রাজনৈতিক আদর্শ থাকলেও ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি তিনি সবসময় মমতা ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সংকটময় মুহূর্তে দেশের স্বার্থে যেকোনো শর্তহীন বৈঠকে বসা থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে ফেরার সিদ্ধান্ত—সবই তাঁর রাজনৈতিক উদারতার পরিচয় দেয়। এছাড়া ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন সরকারের অমানুষিক নির্যাতন ও দেশত্যাগের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করা তাঁকে ইতিহাসের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বিগত ১৭ বছর ধরে নানা জেল-জুলুম, মিথ্যা মামলা এবং উন্নত চিকিৎসায় বঞ্চনার শিকার হয়েও তিনি তাঁর নীতি থেকে একচুল নড়েননি। দীর্ঘ নির্যাতনের পরও তিনি প্রতিহিংসাপরায়ণ হননি বা প্রতিপক্ষের প্রতি কোনো বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করেননি। তাঁর এই আপসহীন সংগ্রাম ও অসীম ধৈর্য শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাংলাদেশের ঐক্যের প্রতীকে পরিণত করেছে। সামনের সাধারণ নির্বাচন যেন বেগম জিয়ার এই মহান আদর্শ বাস্তবায়নের একটি মঞ্চ হয়, সেটিই এখন দেশবাসীর প্রত্যাশা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কদর্য ভাষা বর্জন এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রচারণার মাধ্যমেই তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব। প্রতিহিংসার আগুনের বদলে যদি সম্প্রীতির দেশ গড়া যায়, তবেই বেগম খালেদা জিয়ার লালিত স্বপ্ন সার্থক হবে।