গত ২২ ডিসেম্বর ফ্লোরিডার মার–এ–লাগোতে নিজের ব্যক্তিগত বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন কথা বলছিলেন, তখন তার আলোচনার কেন্দ্রে ছিল রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ। সেখানে তিনি নিজের নামে নতুন শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ তৈরির ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি দাবি করেন, তিনি এ পর্যন্ত আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি।
সেই সংবাদ সম্মেলনেই ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে ‘অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় জেনারেল’ হিসেবে অভিহিত করেন। ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানের প্রধান এবং একজন অত্যন্ত সম্মানিত জেনারেল, তিনি একজন ফিল্ড মার্শাল এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১ কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন, হয়তো তার চেয়েও বেশি।
গত জুন থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ বার আসিম মুনিরের প্রকাশ্যে প্রশংসা করেছেন দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরা ট্রাম্প। অক্টোবরে মিসরের শারম আল–শেখ শান্তি সম্মেলনেও তিনি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে মুনিরকে ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে সম্বোধন করেন। ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত উষ্ণতা ২০২৫ সালে পাকিস্তানের ভূ–রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধিতে আসিম মুনিরের কেন্দ্রীয় ভূমিকারই ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সশস্ত্র সংঘাত ছিল ইসলামাবাদের কূটনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনের প্রধান অনুঘটক। এপ্রিল মাসে ভারত–শাসিত কাশ্মীরে এক হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর দিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ৭ মে ভারত পাকিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালায়, যার জবাবে পাকিস্তান ভারতের অন্তত ছয়টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে। ১০ মে দুই দেশ একে অপরের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পর্দার অন্তরালের কূটনীতিতে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়। যদিও ভারত দাবি করে এটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফল, কিন্তু ট্রাম্প গত কয়েক মাসে অন্তত অর্ধশতবার দাবি করেছেন যে তিনিই এই যুদ্ধবিরতি করিয়েছেন। পাকিস্তানের সাবেক মন্ত্রী খুররম দস্তগীর খানের মতে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভারতের অনীহা আসিম মুনির ও শাহবাজ শরিফকে ট্রাম্পের আরও কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
পাকিস্তান একসময় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র থাকলেও গত কয়েক বছরে সেই সম্পর্কে ভাটা পড়েছিল। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প পাকিস্তানকে ‘মিথ্যাবাদী ও প্রতারক’ বললেও দ্বিতীয় মেয়াদে তার সুর সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত মার্চে কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ট্রাম্প ২০২১ সালে কাবুল বিমানবন্দরে অ্যাবে গেট বোমা হামলার অন্যতম মূল হোতাকে গ্রেফতারে সহায়তার জন্য পাকিস্তানকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে মুনিরের ক্রমবর্ধমান প্রভাব তাকে একজন ‘সৈনিক–কূটনীতিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গত এক বছরে পাকিস্তান শুধু নিরাপত্তার গণ্ডি ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রিপ্টো মাইনিং ও খনিজ সম্পদের মতো অর্থনৈতিক বিষয়েও আলোচনা শুরু করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের পরিবর্তনের পর ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে এবং গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল হিসেবে ইশাক দার ঢাকা সফর করেছেন।
মে মাসের সংঘাতের পর আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় ঘটনা। এরপর ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ (সিডিএফ) পদ তৈরি করে নৌ ও বিমানবাহিনীকেও তার কর্তৃত্বের অধীনে আনা হয়। যদিও এই পদক্ষেপটি বিরোধী দল ও সমালোচকদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এটি সামরিক বাহিনীর সংস্কার ও সংহতির জন্য প্রয়োজন ছিল।
আন্তর্জাতিকভাবে আসিম মুনির যখন সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করছেন বা গাজায় শান্তিরক্ষী বাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন, তখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ চিত্রটি বেশ জটিল। ২০২৫ সালে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে সহিংসতা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইমরান খানের কারাবাস এবং বিরোধী দলের ওপর দমন–পীড়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা রয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মারিয়া রশিদের মতে, মে মাসের সংঘাত আসিম মুনিরকে ভারতের বিরুদ্ধে নিজের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ করে দিয়েছে। বিদেশের মাটিতে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ‘সাফল্য’ প্রচার করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো অস্বস্তিকর বিষয়গুলোকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
সূত্র: আল–জাজিরা
রিপোর্টারের নাম 
























