ঢাকা ০৬:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

স্বর্ণের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি, অলংকারের বিকল্পে ঝুঁকছেন ভারতীয়রা

চলতি বছর স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে ভারতের ক্রেতাদের অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা গেছে। মুম্বাইয়ের গৃহিণী প্রাচি কদম যেখানে প্রায় দুদশক ধরে ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিগত রুচির মিশেলে প্রতি উৎসবে গয়না কিনতেন, এবার তিনি কেবল ১০ গ্রাম ওজনের একটা মুদ্রা কিনেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, গয়না আমি পছন্দ করি, কারণ এগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরা যায়। কিন্তু অলংকার গড়ানোর চার্জ হিসেবে অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ অর্থ খরচা এখন যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি।

তার এই সিদ্ধান্ত ভারতের বৃহত্তর এক পরিবর্তনের প্রতিফলন। কারণ কদমের মতো লাখ লাখ ভারতীয় আছেন, যারা উৎসবকালে স্বর্ণ ক্রয়কে শুভ মনে করেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনার বাজার রয়েছে দেশটিতে, যেখানে স্বর্ণের সাংস্কৃতিক ও আর্থিক গুরুত্ব গভীর। চলতি বছর দামের বৃদ্ধি ৪৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক প্রবৃদ্ধির পথে থাকায়, ক্রেতারা গয়নার বদলে ছোট মুদ্রা ও বারের দিকে ঝুঁকছেন।

নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে চাহিদা বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার কমানো এবং ডলারের দুর্বলতার কারণে বৈশ্বিক বাজারে চলতি বছর এখন পর্যন্ত সোনার দাম ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। ২৬ ডিসেম্বর প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম রেকর্ড চার হাজার ৫৪৯ দশমিক ৭ ডলারে পৌঁছায়।

ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে স্বর্ণের দাম চলতি বছর ৭৭ শতাংশ বেড়েছে, যা নিফটি ৫০ সূচকের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে। ডলারের বিপরীতে রুপির প্রায় ৫ শতাংশ অবমূল্যায়নও এতে ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা মোট চাহিদা কমে যাওয়ার চাপ কিছুটা সামাল দিচ্ছে এবং ২০২৬ সাল পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশ্বজুড়েই অলংকার কেনার হার কমছে।

অন্যদিকে, বহু মানুষের ক্ষেত্রে পরিবর্তন মানে গয়না পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং কম পরিমাণে কেনা। কলকাতার নিবেদিতা চক্রবর্তী বলেন, পরিবারের বাজেট দামের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তিনি হালকা ওজনের অলংকারের দিকে ঝুঁকছেন।

তিনি বলেন, একটি সোনার হার থেকে ছয় বা সাত গ্রাম ওজন কমালে লাখ টাকার বেশি সাশ্রয় হতে পারে।

দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতারা নকশা ও মূল্যের দিক থেকে আরও সচেতন হচ্ছেন বলে জানান পি এন গাডগিল জুয়েলার্সের চেয়ারম্যান সৌরভ গাডগিল। তার প্রতিষ্ঠান জুন মাসে হালকা ও কম ক্যারেটের গয়নার জন্য একটি নতুন সাব-ব্র্যান্ড চালু করেছে।

তিনি বলেন, ক্রেতারা এমন গয়না চান, যাতে দামের চাপ না নিয়ে স্বর্ণের মালিক হওয়া যায়। আধুনিক কারিগরি দক্ষতা হালকা গয়নাকে এখন আর শুধু প্রাথমিক স্তরের পণ্য নয়, বরং আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি) জানায়, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ভারতে মোট সোনার চাহিদা আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ কমেছে। এ সময় গয়নার চাহিদা ২৬ শতাংশ কমে ২৭৮ মেট্রিক টনে নেমেছে, বিপরীতে বিনিয়োগ চাহিদা ১৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৫ টনে। এই সময়ে মোট চাহিদার ৪০ শতাংশই ছিল বিনিয়োগ—যা ভারতীয় পরিবারের কাছে সোনার সম্পদ সংরক্ষণের ভূমিকা স্পষ্ট করে।

ইন্ডিয়া বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইবিজেএ) সভাপতি পৃথ্বীরাজ কোঠারি বলেন, অন্যান্য সম্পদের তুলনায় স্বর্ণ ভালো পারফরম্যান্স দেখানোয় ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগমূলক সোনার দিকে ঝোঁক অব্যাহত থাকতে পারে। তিনি বলেন, ক্রেতারা মূল্য আরও বৃদ্ধির আশায় মুদ্রা, বার বা গোল্ড ইটিএফ আকারে স্বর্ণ কিনছেন।

ডব্লিউজিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ভারতীয় বাজারে তালিকাভুক্ত স্বর্ণ-সমর্থিত এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) ৩৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ এসেছে। এর ফলে এসব ইটিএফের মোট ধারণক্ষমতা বেড়ে ৮৬ দশমিক ২ টনে দাঁড়িয়েছে।

শিল্প পরামর্শক সংস্থা মেটালস ফোকাস জানায়, ২০২৬ সাল পর্যন্ত ভারতের গয়নার চাহিদা দুর্বলই থাকবে। পূর্ণ বছরে গয়না ব্যবহারের পরিমাণ আরও ৯ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। স্বর্ণ কম সাশ্রয়ী হয়ে ওঠায় ক্রেতারা কম ক্যারেট ও হালকা ওজনের নকশার দিকে ঝুঁকছেন—যা একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

ডিপি অভূষণ লিমিটেডের চেয়ারম্যান সন্তোষ কাটারিয়া বলেন, বিশেষ করে তরুণ ক্রেতা ও কর্মজীবী পেশাজীবীদের মধ্যে ১৮ ক্যারেট ও ১৪ ক্যারেটসহ কম ক্যারেটের গয়না ক্রমেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, এ ধরনের গয়না বাজেটের মধ্যে থেকে আকর্ষণীয় নকশা উপভোগের সুযোগ দেয় এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্যও উপযোগী।

সূত্র: রয়টার্স

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মুন্সীগঞ্জ বার নির্বাচনে ১১ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল

স্বর্ণের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি, অলংকারের বিকল্পে ঝুঁকছেন ভারতীয়রা

আপডেট সময় : ০২:৩৪:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫

চলতি বছর স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে ভারতের ক্রেতাদের অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা গেছে। মুম্বাইয়ের গৃহিণী প্রাচি কদম যেখানে প্রায় দুদশক ধরে ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিগত রুচির মিশেলে প্রতি উৎসবে গয়না কিনতেন, এবার তিনি কেবল ১০ গ্রাম ওজনের একটা মুদ্রা কিনেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, গয়না আমি পছন্দ করি, কারণ এগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরা যায়। কিন্তু অলংকার গড়ানোর চার্জ হিসেবে অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ অর্থ খরচা এখন যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি।

তার এই সিদ্ধান্ত ভারতের বৃহত্তর এক পরিবর্তনের প্রতিফলন। কারণ কদমের মতো লাখ লাখ ভারতীয় আছেন, যারা উৎসবকালে স্বর্ণ ক্রয়কে শুভ মনে করেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনার বাজার রয়েছে দেশটিতে, যেখানে স্বর্ণের সাংস্কৃতিক ও আর্থিক গুরুত্ব গভীর। চলতি বছর দামের বৃদ্ধি ৪৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক প্রবৃদ্ধির পথে থাকায়, ক্রেতারা গয়নার বদলে ছোট মুদ্রা ও বারের দিকে ঝুঁকছেন।

নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে চাহিদা বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার কমানো এবং ডলারের দুর্বলতার কারণে বৈশ্বিক বাজারে চলতি বছর এখন পর্যন্ত সোনার দাম ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। ২৬ ডিসেম্বর প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম রেকর্ড চার হাজার ৫৪৯ দশমিক ৭ ডলারে পৌঁছায়।

ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে স্বর্ণের দাম চলতি বছর ৭৭ শতাংশ বেড়েছে, যা নিফটি ৫০ সূচকের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে। ডলারের বিপরীতে রুপির প্রায় ৫ শতাংশ অবমূল্যায়নও এতে ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা মোট চাহিদা কমে যাওয়ার চাপ কিছুটা সামাল দিচ্ছে এবং ২০২৬ সাল পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশ্বজুড়েই অলংকার কেনার হার কমছে।

অন্যদিকে, বহু মানুষের ক্ষেত্রে পরিবর্তন মানে গয়না পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং কম পরিমাণে কেনা। কলকাতার নিবেদিতা চক্রবর্তী বলেন, পরিবারের বাজেট দামের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তিনি হালকা ওজনের অলংকারের দিকে ঝুঁকছেন।

তিনি বলেন, একটি সোনার হার থেকে ছয় বা সাত গ্রাম ওজন কমালে লাখ টাকার বেশি সাশ্রয় হতে পারে।

দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতারা নকশা ও মূল্যের দিক থেকে আরও সচেতন হচ্ছেন বলে জানান পি এন গাডগিল জুয়েলার্সের চেয়ারম্যান সৌরভ গাডগিল। তার প্রতিষ্ঠান জুন মাসে হালকা ও কম ক্যারেটের গয়নার জন্য একটি নতুন সাব-ব্র্যান্ড চালু করেছে।

তিনি বলেন, ক্রেতারা এমন গয়না চান, যাতে দামের চাপ না নিয়ে স্বর্ণের মালিক হওয়া যায়। আধুনিক কারিগরি দক্ষতা হালকা গয়নাকে এখন আর শুধু প্রাথমিক স্তরের পণ্য নয়, বরং আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি) জানায়, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ভারতে মোট সোনার চাহিদা আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ কমেছে। এ সময় গয়নার চাহিদা ২৬ শতাংশ কমে ২৭৮ মেট্রিক টনে নেমেছে, বিপরীতে বিনিয়োগ চাহিদা ১৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৫ টনে। এই সময়ে মোট চাহিদার ৪০ শতাংশই ছিল বিনিয়োগ—যা ভারতীয় পরিবারের কাছে সোনার সম্পদ সংরক্ষণের ভূমিকা স্পষ্ট করে।

ইন্ডিয়া বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইবিজেএ) সভাপতি পৃথ্বীরাজ কোঠারি বলেন, অন্যান্য সম্পদের তুলনায় স্বর্ণ ভালো পারফরম্যান্স দেখানোয় ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগমূলক সোনার দিকে ঝোঁক অব্যাহত থাকতে পারে। তিনি বলেন, ক্রেতারা মূল্য আরও বৃদ্ধির আশায় মুদ্রা, বার বা গোল্ড ইটিএফ আকারে স্বর্ণ কিনছেন।

ডব্লিউজিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ভারতীয় বাজারে তালিকাভুক্ত স্বর্ণ-সমর্থিত এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) ৩৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ এসেছে। এর ফলে এসব ইটিএফের মোট ধারণক্ষমতা বেড়ে ৮৬ দশমিক ২ টনে দাঁড়িয়েছে।

শিল্প পরামর্শক সংস্থা মেটালস ফোকাস জানায়, ২০২৬ সাল পর্যন্ত ভারতের গয়নার চাহিদা দুর্বলই থাকবে। পূর্ণ বছরে গয়না ব্যবহারের পরিমাণ আরও ৯ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। স্বর্ণ কম সাশ্রয়ী হয়ে ওঠায় ক্রেতারা কম ক্যারেট ও হালকা ওজনের নকশার দিকে ঝুঁকছেন—যা একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

ডিপি অভূষণ লিমিটেডের চেয়ারম্যান সন্তোষ কাটারিয়া বলেন, বিশেষ করে তরুণ ক্রেতা ও কর্মজীবী পেশাজীবীদের মধ্যে ১৮ ক্যারেট ও ১৪ ক্যারেটসহ কম ক্যারেটের গয়না ক্রমেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, এ ধরনের গয়না বাজেটের মধ্যে থেকে আকর্ষণীয় নকশা উপভোগের সুযোগ দেয় এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্যও উপযোগী।

সূত্র: রয়টার্স