১.
অন্ধকারে একটা পাখি এসে কার্পাসের ডালে বসে।
আউলা বাতাস হুঁ হুঁ করে, মন ভেঙে যায়, কাউকে ঘর ভুলিয়ে অলক্ষ্য বাতাস কোন পথে সেই সময় নাই, তা থাকে অজানা। আপন-পর, কোনদিকে যে আসল ঘর, কোনটা ঠিক সময় আর কোনটা ঠিক পথ, সে সময় থাকে না ঠিক। এমনি কোনো এক অন্ধকার ঝড়ের রাতে মন্তাজুলকে ঘর ছেড়ে বাজারের দোকানে বসে থাকতে দেখা যায়। কেন এই গভীর রাতে সেখানে বসা, তা কেউ জানে না। দোকানের ঝাঁপি খুলতেই চোখেমুখে চিরচেনা পচাফলের ভাপসা মিষ্টি টক গন্ধ। ছোটবেলা থেকে এটাই তো তার প্রিয় গন্ধ। সে যাকে বলে— ‘ঘেরান’, এখানে ঢুকলে তার সময়জ্ঞান থাকে না।
২.
অন্ধকারে কার্পাসের ডালে আরো একটি পাখি এসে বসে।
দেশের অবস্থা খারাপ। গলির মুখে আর্মিরা দাঁড়ানো অস্ত্রসহ, সামনের টি অ্যান্ড টি বিল্ডিংয়ের গলিতে আর্মির ট্যাংক টহল দিচ্ছে। প্রথম কয়েকদিন তাও পুলিশে কাজ হয়েছে, এখন আর এই সরকার পতনের আন্দোলন কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। সবাই আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বা কোথাও নেমেছে ইতোমধ্যে। কেউ সরকারের পক্ষে অথবা কেউ বিপক্ষে। এমনি এক মফস্বল শহরে শুধু মন্তাজুলই সাহস করে উঠতে পারে না, কোনোভাবেই আন্দোলনে না নামার, কী সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে। সে শুধু পারে ফলের হিসাব কষতে। ফলের গায়ের রং তার পৃথিবীর আশ্চর্য সুন্দর রং মনে হয়। ফল বাদ দিয়ে সে হিসাব কষে কারফিউ আন্দোলনের আজকে কততম দিন। আরো কতদিন চলে তার ঠিক নেই। মফস্বল শহরে সবাই বসে আছে বাসায়, কাজ নেই। এসময় ভাত ডালের ব্যবস্থা করাই মুশকিল, সেখানে ফল কেনা বিলাসিতা। নারী-পুরুষ সবাই আটকা, কারণ বাইরে আর্মি পুলিশ সবাই বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। বাসার পুরুষরা তাদের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় সিংহের মতো দুপুরে হাজির হতে পারছে না গরম ভাতের জন্য। স্ত্রীদের সামনে কপালের ঘাম মুছতে বা ক্লান্তি দূর করতে, লেবুর শরবত চাইতে পারছে না, কারণ তারা তো বাসাতেই অবস্থান করছে। অপরদিকে, বাসার স্ত্রী বা নারীরাও সকাল থেকে তাদের বুকের ওড়না খুলে ঘরের কাজ করতে পারছে না বা পছন্দের চ্যানেলে কোনো সিরিয়াল দেখতে পারছে না। ইতোমধ্যে তা বাসার পুরুষ সদস্যের, স্বামী নামক সিংহের দখলে। তারা গম্ভীরভাবে দেশের সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি, কারফিউ, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শোনায় মনোযোগী। আরো অবাক বিষয়, ঘরের স্ত্রী বা নারীরা দিনে ওড়না পরে ঘুরে বেড়ায়, অকারণে জোরে হাসি দিতে দ্বিধায় ভুগছে। আবার এরাই রাতে স্বামী নামক সিংহের সামনে বিবস্ত্র হয়। দুজন একসাথে হেসে উঠে তাদের গোপন প্রয়োজনীয় কার্যসম্পাদনের পর, কিন্তু দিনের আলোতে এই মুহূর্তে তারা পরস্পরের কাছে অচেনা। ঠিক যেন কোনো তরুণীর বাগান করার শখ অথচ টবের সংকট। তাই সে এক টবের ভিতরেই টাইমফুল, সন্ধ্যামালতী সব কুড়িয়ে এনে লাগিয়ে দিয়েছে। টাইমফুল সকালে আর, সন্ধ্যামালতী সন্ধ্যায়— যে যার মতো ফোটে চুপ হয়ে যাবে, দুটি ফুলের নীরব সহ অবস্থান। তরুণী এই মুহূর্তে ঈশ্বর, টাইমফুল আর সন্ধ্যামালতী হলো নারী-পুরুষ। তরুণীর দুটি ফুলের মতো ঈশ্বরের কাছেও নর-নারী; সিংহের মতো গর্জন করা পুরুষ এবং বুকে ওড়না দেওয়া স্ত্রী সবই গুরুত্বপূর্ণ। সবাই ফুল দিচ্ছে যার যার সময়ে, যার যার সীমারেখায়।
৩.
অন্ধকারে কার্পাসের ডালে পাখি দুটি এদিক-ওদিক তাকায়।
মন্তাজুল আজকের গভীর রাতে একটা আপেল হাতে নিয়ে দেখে আর তার ছেলেটার কথা ভাবে। ছেলে নিখোঁজ। শোনা যায়, স্ত্রী রানিই লুকিয়ে রেখেছে ছেলেকে। এরপর ভাইদের নিয়ে ছেলে খোঁজার মিথ্যা নাটক করছে। মিথ্যা মামলা সাজানো হয়েছে। ঢাকায় পাঠাল ভালো পড়ালেখার জন্য। সেই ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ল, বাসায় নিয়ে আসা হলো। সেই অসুস্থ শরীর নিয়ে বিশ্রামের পরিবর্তে ছেলে গোপনে করল প্রেম এবং বিয়ে। শুক্রবারের এক সকালে যখন মন্তাজুল রুটি, আলুভাজি খাচ্ছিল আর রানি পান চিবচ্ছিল, সে সময় টিয়া পাখির মতো লাল ঠোঁটের এক মেয়ে নিয়ে ছেলে বাসায় এসে খুশি মনে হাজির। টিয়া পাখির লাল ঠোঁটের এই মেয়েকে রানি মেনে নিতে পারল না, কারণ মেয়ের বাবার নামে আঠারোটি মামলা। বিশাল ‘ডাকাইত’। সাহসে মন্তাজুলের ঠিক বিপরীত। টিয়া পাখির ঠোঁট মেয়ে আর রানির ভিতর দিনরাত কথা কাটাকাটি লেগেই থাকল। এক মাসের ভিতর মেয়েটাকে একদিন মারধর করে, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলো আর ছেলেকে গোপনে সরিয়ে ফেলা হলো। দুইপক্ষই মামলা করল। এইযে এতকিছু হয়ে গেল, মন্তাজুলের উপস্থিতি কোথাও নেই। সে শুধু নীরব দর্শক। কখনোই ছিল না কারণ তার আয় রোজকারে সংসারে চলে না। ছেলের সাথে মায়ের কথা হয় ঠিকঠাক, প্রতিদিন রানির ভাইবোন বাসায় আসে অথবা রানিই দেখা করে গোপন আলাপ হয়। তাকে কেউ ডাকে না। সে কোনার রুমে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে।
মেয়েটার ইদানীং বয়স বাড়ছে। সে একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করে। ওকে নিয়েও ইদানীং বাজে কথা শোনা যায়। এইতো কদিন আগে সে হেঁটে যাচ্ছিল তখন পিছন থেকে একজন বলে উঠেছে— “দ্যাখ দ্যাখ মাইগ্যা পুরুষটা যায়”। আরেকজন বলে উঠেছে সে সময়— “কী দরকার রে ভাই, শুধু শুধু ফল-ফাকড়ার দোকানে বইস্যা আর সময় নষ্ট কইর্যা। তারচেয়ে ঐহানে ফল সরাইয়্যা মাইয়্যাডার একটা পার্মানেন ব্যবস্থা কইর্যা দেলেই তো হয়। ওসব পার্টটাইম কইর্যা কী পোষায়।” মন্তাজুল মাথা নিচু করে শোনে, হেঁটে চলে যায় কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না। করবেই বা কীভাবে? বয়স্ক মেয়ে, সে বিয়ে দিতে পারে না। শোনা যায়, ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামমাত্র, সেখানে ভালো আয় নেই। মালিক তার পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের জন্য এই ব্যবস্থা করেছে। পুলিশের লোকজনও জানে। মাঝেমধ্যে তারাও আসে এখানকার কাজ করা মেয়েদের কাছে। আজকে এই ঝড়ের রাতে, দোকানের পচে যাওয়া ফলগুলোর কথা ভাবে। মনে করে, সাধারণ ফলই তো। এগুলো পচে আর এমন কী? তার সংসার নামক বৃক্ষের সব ফলগুলোই তো গোড়াসহ পচে গিয়েছে। হয়ত বাহির থেকে সবাই দেখে ঠিকঠাক, আসলে কিছুই ঠিকঠাক নেই।
৪.
অন্ধকারে কার্পাসের ডালে পাখি দুটি কাছে এসেও দূরে সরে যায়।
ইদানীং রানির সৌন্দর্য চর্চা বেড়ে কয়েকগুণ হয়ে গিয়েছে। মুখের যে মেস্তা জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি খেয়ে হয়েছে, সেটা ঢাকতে সে দিনরাত আপ্রাণ চেষ্টা করে, মুখে এটাসেটা মেখে বসে থাকে একটু অবসর পেলেই। তার খসখসে চামড়ায় সে নাইট ক্রিম মেখে ঘ্রাণ নিয়ে ঘোরে পুরো ঘরময়। দুহাত ভর্তি করে আঙুলের ডগায়, হাতের তারায় ভর্তি করে মেহেদি দেয়। কারণে অকারণে হেসে ফেলে খিলখিল করে মুখ ভর্তি পান নিয়ে। ঘামাচি ভর্তি পিঠে কারো নখের আচড়কে সে তার পোষা বিড়ালের আঁচড় বলে। রানির এরকম আচরণ ছিল ঠিক তাদের বিয়ের পর। মন্তাজুল রাতে ঘরে ফেরার সময় টুকটাক ছোট সাদা প্যাকেটে করে দোকানের ফল নিয়ে ফিরত রানির জন্য। মন্তাজুলের অন্ধ মা তখনো থাকত তাদের সাথে। এরপর রানির দিন দিন বিরক্তি বাড়তে থাকে। মাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে। সেখানেই শেষ বয়সে স্ট্রোক করে পড়েছিল মাস তিনেক। নিজের পায়খানার ভিতরে শুয়ে থাকতে হয়েছে। দুর্গন্ধে কেউ কাছে আসত না, দেখার কেউ ছিল না। মন্তাজুল দুতিনদিন পরপর যেত। পরিষ্কার করে খাইয়ে-দাইয়ে আসত। আর একজন দেখত, মন্তাজুলের এলাকার এক ভাই। কিন্তু এভাবে আর কয়দিন? নদী পার হয়ে গ্রামের বাড়িতে এতদূর যাওয়া আসা করতে করতে মন্তাজুলেরও শরীর ভেঙে পড়ছিল। শেষ পর্যন্ত এলাকার ভাই বলল খতম দোয়া পড়ানোর কথা। সুস্থ হলে হবে আর নাহয় মারা যাবে। খতম দোয়া পড়ানোরও দিন পনেরো পর এক শীতের ভোরে মন্তাজুল গিয়ে ঘরের দরজা খুলে দেখে একটা শীর্ণকায় শরীর শক্ত হয়ে পড়ে আছে। মুখ হা করা, সেখানে মাছিরা উড়ছে। চোখের দুটো মণি বের হয়ে আছে। দেখেই মনে হয় আজরাইল কী জানটা কবচ করার সময় খুব বেশি কষ্ট পেয়েছিল। আহারে মা! এই মা মন্তাজুলকে নিয়ে কত কষ্টই না করেছে। বাবা মারা গেল, সেও তো এই ফলের ব্যাবসা। লাভ-ক্ষতি, কোনোমতে আধপেটা খেয়ে জীবন। তারপরও মা কোনোদিন বাবার উপর রাগ করত না। নিজেও খুব পরিশ্রম করত। একাত্তরে মিলিটারিরা আসল এলাকায়, মন্তাজুলের বাবার দোকানে নিয়মিত আসত। বাবা মাথায় টুপি পড়ে থাকত। আল্লাহ খোদার নাম নিত। একদিন এক পাকসেনা মজা করে বাবার লুঙ্গি তুলে ফেলল। তখনি যা ধরার পড়ার পড়ল। যে কয়জন পাকসেনা ছিলো সবাই হো হো করে হেসে ফেলল, মন্তাজুলের ভীতু বাবা মাথা নিচু করে থাকল, একসময় হাউমাউ করে কেঁদে পাকসেনাদের পা জড়িয়ে ধরল। তাদের অট্টহাসিতে আশেপাশের সবার মুখ শুকিয়ে গেল। মুখে বলল— “ইয়ে মালাউন কা বাচ্চা! ফির সর পর টোপি পেহন লিয়া হ্যায়।” সবার সামনে গুলি করে মেরে ফেলল বাবাকে। কেউ ভয়ে আর সেই লাশের কাছে আসে না। গভীর রাতে দেখা যায় মা ছেলে দুজন মিলে দোকানের ভিতর মাটি খুঁড়তে, ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে। সেই লাশ ধামাচাপা দিতে। পরদিন খুব ভোরে দেখা যায় আক্তার মোল্লার কাছে মা ছেলে দুজন মুসলমান হচ্ছে। বিগত রাতের দোকানের লেপাপোঁছা করে আসা মাটির মেঝে একসময় শুকিয়ে যায়, যুদ্ধও শেষ হয়। কিশোর মন্তাজুলকে আবার একই জায়গা একই দোকানে দেখা যায়। তবে নতুন মুসলমান নামে। মা আর ছেলে মিলে অনেক দীর্ঘ পথ তারা পাড়ি দেয়। যেদিন সে মায়ের লাশটা দেখতে পায় ঘর খুলেই প্রথমে, সেদিন দীর্ঘক্ষণ কাউকে না জানিয়ে মায়ের পাশে শুয়ে থাকে, সেই ছোটোবেলার মতো। তার হুঁশ থাকে না, প্রস্রাব পায়খানার দুর্গন্ধ আর কিছুই সেদিন বোধ হয় না। সে গল্প করে মায়ের সাথে ছোটোবেলার মতো কি কি বিক্রি, লাভ-ক্ষতি হয়েছে। এক সময় গল্প থামিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদে। তার মনে হয়, এত বছরের সুখ-দুঃখের সাথী মাও তাকে সাথে করে নিয়ে চলে গিয়েছে। এভাবে কতক্ষণ পার হয়, সে জানে না। যখন হুঁশ হয়, তখন রোদ উঠে গিয়েছে। আশেপাশের সবাই জানে, একবারে কবর দিয়ে বাড়ি ফেরে। ফেরার পরে ঘুমের ভিতরেও কেঁদে ওঠে। রানি বা ছেলেমেয়েরা কেউ গুরুত্ব তো দেয়ই না উলটো হাসাহাসি করে। রানি পান ভরা মুখে বলে— “পুরুষ মাইনসের আবার এতচোক্ষে পানি, তুমি দেহি মাইয়্যা মানুস ফেল মারবা।”
৫.
অন্ধকারে কার্পাসের ডালে বসা পাখি দুটির মধ্যে স্ত্রী পাখিটি আগে উড়ে চলে যায়, বনিবনা হয় না।
আজকে রানির নাইট ডিউটি, মন্তাজুলের হঠাৎ তাকে দেখতে মন চায়। সেই বিয়ের পরের কথা মনে হয়। হুটহাট অস্থিরতায় যখন-তখন চলে যেত। এখন এই লক ডাউনেও হাসপাতালগুলো ঠিকই খোলা। কী মনে করে সে শার্ট গায়ে চাপায়, বের হয়। বাইরের আবহাওয়া ভালো না। তার ভিতরে অস্থির লাগে। হাসপাতালে পৌছাতে সময় লাগে না, প্রায় দৌড়ে পৌঁছায়। রানি সবসময় যে ডাক্তারের সাথে ওটি করে, তাকে বা রানিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওটি বা ওয়ার্ডে কোথাও নেই। লকডাউনে আরো এই খারাপ আবহাওয়ায় সেরকম ওটিও নেই, ফাঁকা। শেষপর্যন্ত সে ডাক্তারের নাম মনে করে হাতড়ে তিনতলায় ওঠে। পা ভার হয়ে গলা শুকিয়ে আসে। রুমের কাছে যেতেই বাতি নেভানো কিন্তু দরজায় কান পেতে রাখলেই হাসির শব্দ শুনতে পায়। যে হাসির শব্দ গভীর রাতে গলা জড়িয়ে, সংসার শুরুর পর কারণে অকারণে শোনা যেত রানির কাছ থেকে। মনে হত এই হাসিতে পৃথিবীর সব সুগন্ধি ফুল সহ যেসব ফুলে ঘ্রাণ নেই, তারও ঘ্রাণ পাওয়া যায়…মন্তাজুল শক্তিহীন হাতে দরজায় কড়া নাড়ে, ধাক্কা দেয়। ভিতরের নারী-পুরুষ দুজনের কথা-হাসি থেমে যায়। তাদের বিরক্তিও প্রকাশ পায় ক্রমাগত দরজায় কড়া নাড়ায়। এ সময় পুরুষ কণ্ঠ দরজার কাছে এগোতে এগোতে বলে— “মতি হারামজাদারে কইসিলাম কেউ যেন ঝামেলা না করে ঘণ্টা দুই। হালায় মনে হয় সিগারেট ফুঁকতে গেসে।” বলে খালি গায়েই এসে দরজা খুলে একটু ফাঁক করে। মন্তাজুল একটুও সময় না দিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ভিতরে ঢুকে বিবস্ত্র রানিকে দেখতে পায়, যে কিনা তাড়াতাড়ি হাসপাতালের সিল দেওয়া সাদা চাদরটা টেনে নেয়।
৬.
অন্ধকারে কার্পাসের ডালে বসা পুরুষ পাখিটি হয় রাতের মতোই নিঃসঙ্গ।
মন্তাজুল যে গতিতে ঢোকে আবার দুজনকে অবাক করে দিয়ে দৌড়ে বের হয়ে যায়। সে দৌড়াতে থাকলো নিশুতি রাতে নির্জন রাস্তায়, লকডাউনের ফাঁকা রাস্তায়, ঝড়-বাতাসের ধুলো উড়া রাস্তায়। তার কোনো হুঁশ থাকে না। এ সময় রাস্তায় উড়ে যাওয়া শুকনো হলদে পাতার মতো সেও থাকে হালকা। তার বারবারই মনে হয় আরেকটু পথ দৌড়ালেই সে মায়ের কাছে পৌঁছাবে। তারপর আর কোনো চিন্তা নেই। সেই ছোটোবেলায় মা আর সে যেমন একসাথে পড়া শিখেছিল— “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ।” সন্ধ্যা নামে নামে এমন সময় চারপাশ থেকে আজান দিত— “হাইয়্যা আলাস সালাহ, হাইয়্যা আলাল ফালাহ…আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর।” মা তাকে টুপি পরে মসজিদে পাঠাত, মসজিদে যাওয়ার পথে সে দেখত আকাশে সব উড়ন্ত পাখির রংই কালো। তারা কই যায়? কেন যায়? প্রশ্ন নিয়ে ঢুকত মসজিদে। প্রায় সব দোয়াই পারত না তখনো কালিমা তৈয়বা ছাড়া। সেটাই বারবার বিড়বিড় করে পড়ত পুরো নামাজে। আজকেও এই গভীর রাতে দৌড়ানোর সময় তার মা, সন্ধ্যার আকাশে উড়ন্ত কালো পাখিরা আর মুখে কালিমা তৈয়বা একসাথে ভর করে।
সেই রাতে এরপর তাকে এই দোকানে এসে বসে থাকতে দেখা যায়। ঐ সময় তার আর নতুন করে কিছু হারাবার হিসাব করা অর্থহীন মনে হয়। পরদিন প্রথমে কেউ খেয়াল করে না। আরো লক ডাউনে বাজার চুপচাপ। খুব ভোরে কিছু কুকুরকে দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বাজারের চৌকিদার কয়েকবার তাড়িয়ে দিয়েই লাভ হয় না। সে বাড়ি চলে যায়। এরপর ঝাড়ুদার এসেও একই অবস্থা দেখে। এক সময় সন্দেহ হয়। সে দোকানের কাছে এগোয়। ঝাঁপি বাহির থেকে খোলা। সে সাবধানে তোলে। দেখে সিলিং ফ্যানের সাথে একটি ঝুলন্ত মরদেহ। সেটি আর কারো নয়; মন্তাজুলের। সে সময় আর কারো খবর জানা যায় না। মন্তাজুলের হাসপাতালে কাজ করা স্ত্রী রানি কিংবা পার্লারে কাজ করা মেয়ে, টিয়া পাখি ঠোঁটের ছেলের বউ কিংবা পলাতক ছেলে…
রিপোর্টারের নাম 

























