ঢাকা ০৫:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ‘রিসেট’ কতটা সম্ভব?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০১:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ২৬ বার পড়া হয়েছে

অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে উৎখাতের পর প্রথম নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস অরের মতে, কয়েক দশক ধরে চলে আসা ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’র চলমান চক্র এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কারের আশাকে ম্লান করে দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের এখন দরকার একটি গণতান্ত্রিক ‘রিসেট’ কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কি সেই পরিবর্তন আনতে পারবে?

নির্বাচন ও জুলাই সনদের গণভোট

নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি রমজান শুরুর আগেই সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার জন্য তিনি চাপের মুখে আছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল হতে পারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ক্ষমতায় ফেরা, যার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় দুই দশক ধরে লন্ডনে নির্বাসিত।

নির্বাচনের পর নতুন সরকার জুলাই সনদে ২৫টি রাজনৈতিক দলের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। এসব সংস্কার অনুমোদনের প্রশ্নে জনসমর্থন যাচাই হবে ফেব্রুয়ারির গণভোটে।

প্রতিশোধের রাজনীতির চক্র

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিয়েতিগজ বাজপেয়ি মনে করেন, “বাস্তবে পরিবর্তনের চেয়ে ধারাবাহিকতাই বেশি থাকবে।”

  • সহিংসতার পুনরাবৃত্তি: বাজপেয়ি বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসজুড়ে প্রায়ই সহিংস প্রতিশোধের রাজনীতি দেখা গেছে, প্রকৃত জাতীয় পুনর্মিলনের দিকে তেমন কোনো অগ্রগতি আমরা দেখিনি। বরং পেন্ডুলামকে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দুলতে দেখেছি কেবল।”
  • আওয়ামী লীগের ওপর শুদ্ধি অভিযান: তিনি উল্লেখ করেন, হাসিনা সরকারের সময় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ওপর নিপীড়ন দেখা গেছে, আর এখন আওয়ামী লীগের ওপর শুদ্ধি অভিযান চলছে। প্রশ্ন হলো, “এই চক্র কীভাবে ভাঙা যাবে?”
  • প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা: বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনের আগে রাষ্ট্রের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান স্বাধীন ও কার্যকর ছিল। কিন্তু এখন দেশের আমলাতন্ত্র এবং একসময়কার স্বাধীনভাবে কাজ করা বহু প্রতিষ্ঠান যা শাসন ও জবাবদিহির নিশ্চয়তা দিত, সেগুলো ফাঁপা হয়ে গেছে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও উদ্বেগ

  • বিএনপি-জামায়াত জোট: এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাওমি হোসেন মনে করেন, সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল হল বিএনপির জয়, আর জামায়াতে ইসলামী হবে প্রধান বিরোধী দল। তবে তিনি এও বলেন, বিএনপি খুবই অজনপ্রিয় এবং মানুষ “নাক চেপে ভোট দেবে,” কারণ তারা দলটির পূর্বের সহিংসতা ও দুর্নীতি মনে রেখেছে।
  • শেখ হাসিনার নির্বাসন ও মৃত্যুদণ্ড: নভেম্বরে বাংলাদেশে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তিনি ভারত সরকারের সুরক্ষায় নির্বাসনে রয়েছেন এবং তাকে প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা খুবই কম।
  • নির্বাচনের বৈধতা: ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। অনেকের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত ভোটের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতির দিক থেকেও বাংলাদেশের অবস্থা নাজুক। প্রবৃদ্ধির গতি কমলেও দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত এবং জ্বালানি পুরোটাই আমদানি করতে হয়। সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে সরে এসে চীন, পাকিস্তান ও তুরস্কের দিকে ঝোঁকাও কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নাওমি হোসেন বলেন, “বাংলাদেশের সরকারগুলোর বৈধতা অনেকাংশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে। দরিদ্রদের সহায়তা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য খুব বেশি রাজস্ব ব্যয়ের সুযোগ নতুন সরকারের হাতে থাকবে না।” তাঁর মতে, বিএনপি আওয়ামী লীগের স্বজনপ্রীতিপূর্ণ পুঁজিবাদের মডেল অনুসরণ করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে তাদের সংযত হওয়ার একমাত্র বড় অনুঘটক হতে পারে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থানের আশঙ্কা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ: সিপিডি’র মতে, ঘুরে দাঁড়াতে গভীর সংস্কার প্রয়োজন

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ‘রিসেট’ কতটা সম্ভব?

আপডেট সময় : ০৯:০১:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫

অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে উৎখাতের পর প্রথম নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস অরের মতে, কয়েক দশক ধরে চলে আসা ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’র চলমান চক্র এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কারের আশাকে ম্লান করে দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের এখন দরকার একটি গণতান্ত্রিক ‘রিসেট’ কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কি সেই পরিবর্তন আনতে পারবে?

নির্বাচন ও জুলাই সনদের গণভোট

নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি রমজান শুরুর আগেই সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার জন্য তিনি চাপের মুখে আছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল হতে পারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ক্ষমতায় ফেরা, যার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় দুই দশক ধরে লন্ডনে নির্বাসিত।

নির্বাচনের পর নতুন সরকার জুলাই সনদে ২৫টি রাজনৈতিক দলের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। এসব সংস্কার অনুমোদনের প্রশ্নে জনসমর্থন যাচাই হবে ফেব্রুয়ারির গণভোটে।

প্রতিশোধের রাজনীতির চক্র

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক চিয়েতিগজ বাজপেয়ি মনে করেন, “বাস্তবে পরিবর্তনের চেয়ে ধারাবাহিকতাই বেশি থাকবে।”

  • সহিংসতার পুনরাবৃত্তি: বাজপেয়ি বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসজুড়ে প্রায়ই সহিংস প্রতিশোধের রাজনীতি দেখা গেছে, প্রকৃত জাতীয় পুনর্মিলনের দিকে তেমন কোনো অগ্রগতি আমরা দেখিনি। বরং পেন্ডুলামকে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দুলতে দেখেছি কেবল।”
  • আওয়ামী লীগের ওপর শুদ্ধি অভিযান: তিনি উল্লেখ করেন, হাসিনা সরকারের সময় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ওপর নিপীড়ন দেখা গেছে, আর এখন আওয়ামী লীগের ওপর শুদ্ধি অভিযান চলছে। প্রশ্ন হলো, “এই চক্র কীভাবে ভাঙা যাবে?”
  • প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা: বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনের আগে রাষ্ট্রের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান স্বাধীন ও কার্যকর ছিল। কিন্তু এখন দেশের আমলাতন্ত্র এবং একসময়কার স্বাধীনভাবে কাজ করা বহু প্রতিষ্ঠান যা শাসন ও জবাবদিহির নিশ্চয়তা দিত, সেগুলো ফাঁপা হয়ে গেছে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও উদ্বেগ

  • বিএনপি-জামায়াত জোট: এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাওমি হোসেন মনে করেন, সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল হল বিএনপির জয়, আর জামায়াতে ইসলামী হবে প্রধান বিরোধী দল। তবে তিনি এও বলেন, বিএনপি খুবই অজনপ্রিয় এবং মানুষ “নাক চেপে ভোট দেবে,” কারণ তারা দলটির পূর্বের সহিংসতা ও দুর্নীতি মনে রেখেছে।
  • শেখ হাসিনার নির্বাসন ও মৃত্যুদণ্ড: নভেম্বরে বাংলাদেশে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তিনি ভারত সরকারের সুরক্ষায় নির্বাসনে রয়েছেন এবং তাকে প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা খুবই কম।
  • নির্বাচনের বৈধতা: ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। অনেকের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত ভোটের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতির দিক থেকেও বাংলাদেশের অবস্থা নাজুক। প্রবৃদ্ধির গতি কমলেও দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত এবং জ্বালানি পুরোটাই আমদানি করতে হয়। সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে সরে এসে চীন, পাকিস্তান ও তুরস্কের দিকে ঝোঁকাও কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নাওমি হোসেন বলেন, “বাংলাদেশের সরকারগুলোর বৈধতা অনেকাংশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে। দরিদ্রদের সহায়তা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য খুব বেশি রাজস্ব ব্যয়ের সুযোগ নতুন সরকারের হাতে থাকবে না।” তাঁর মতে, বিএনপি আওয়ামী লীগের স্বজনপ্রীতিপূর্ণ পুঁজিবাদের মডেল অনুসরণ করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে তাদের সংযত হওয়ার একমাত্র বড় অনুঘটক হতে পারে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থানের আশঙ্কা।