ঢাকা ০১:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ আকাশ প্রতিরক্ষায় কী পরিবর্তন আনবে?

যুদ্ধবিমান ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ (মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট-এমআরসিএ) কিনতে ইতালির প্রতিষ্ঠান লিওনার্দো এসপিএ’র সঙ্গে একটি লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বা সম্মতিপত্র সই করেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর মাধ্যমে আকাশ প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে বড় পদক্ষেপ নিলো বাংলাদেশ সরকার।

ধারণা করা হচ্ছে, এই সম্মতিপত্র সইয়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের চীন এবং রাশিয়া নির্ভরতা থেকে সরে এসে ইউরোপীয় প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকতে পারে বাংলাদেশ। এটি ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অধীনে (বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা) বিমানবাহিনীর সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগগুলোর একটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতালি থেকে কতগুলো যুদ্ধবিমান কেনা হতে পারে সে বিষয়ে এলওআই সইয়ের মাধ্যমে আলোচনা শুরু হলো। তবে সংখ্যা, মূল্য এবং কনফিগারেশনের ওপর নির্ভর করবে সরকারের অনুমোদন এবং পরবর্তী মূল্যায়ন।

গত মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) বিমানবাহিনীর সদর দফতরে হওয়া এলওআই সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল আহসানসহ দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত বলেন, ‘ইউরোফাইটার কেনা বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় অগ্রগতি আনবে। এতে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাও মিলবে।’

তিনি বলেন, ‘ইউরোফাইটার আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষায় অনুপ্রেরণার কাজ করবে। এতে বিমানবাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে এবং আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় বাংলাদেশকে সক্ষম ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে তুলে ধরবে।’

ইউরোফাইটার টাইফুন কী?

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হতে যাওয়া নতুন এই যুদ্ধবিমান সম্পর্কে ইউরোফাইটারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধবিমান বিশ্বের সবচেয়ে সক্ষম ৪.৫ জেনারেশন মাল্টিরোল যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। এটি বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক সুইংরোল কমব্যাট বিমান। বিশ্বের নয়টি দেশের বিমানবাহিনীর কাছে এই যুদ্ধবিমান রয়েছে।

দুই ইঞ্জিনের ইউরোফাইটার টাইফুন সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে সক্ষম। রয়েছে ডেল্টা উইং, ক্যানার্ড এবং এয়ার-টু-এয়ার ও এয়ার-টু-গ্রাউন্ড উভয় মিশনে সক্ষমতা। বর্তমানে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, অস্ট্রিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান ও কাতারের কাছে এই যুদ্ধবিমান রয়েছে।

এয়ার-টু-এয়ার ও এয়ার-টু-গ্রাউন্ড উভয় মিশনের সক্ষমতা রয়েছে এই যুদ্ধবিমানের (সংগৃহীত ছবি)এয়ার-টু-এয়ার ও এয়ার-টু-গ্রাউন্ড উভয় মিশনের সক্ষমতা রয়েছে এই যুদ্ধবিমানের (সংগৃহীত ছবি)

উন্নত সেন্সর স্যুটে রয়েছে এইএসএ রাডার (অত্যাধুনিক রাডার প্রযুক্তি), ইনফ্রারেড ট্র্যাকিং এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম। এছাড়াও এটিতে আছে দূরপাল্লার বিভিআর মিসাইল (আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র) প্রযুক্তি, অ্যান্টিশিপ মিসাইল, গাইডেড বোমা, প্রিসিশন স্ট্রাইক অস্ত্র এবং রিয়েল-টাইম ব্যাটেলফিল্ড ডেটা প্রক্রিয়াকরণ। সব মিলিয়ে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এটি ভয়ংকর অস্ত্র।

তবে বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের চাহিদার ওপর নির্ভর করে কনফিগারেশন আলাদা হতে পারে।

বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা

ইউরোফাইটার বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্য একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের আকাশ শক্তি মূলত ‘চীনা এফ-৭’ ভ্যারিয়েন্ট এবং অল্প সংখ্যক রাশিয়ান ‘মিগ-২৯’-এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। এগুলো প্ল্যাটফর্ম রেঞ্জ, টিকে থাকার সক্ষমতা, অ্যাভিওনিক্স এবং রক্ষণাবেক্ষণে নানান রকমের সীমাবদ্ধতায় ভুগছে।

দুই ইঞ্জিনের ইউরোফাইটার টাইফুন সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে সক্ষম (সংগৃহীত ছবি)দুই ইঞ্জিনের ইউরোফাইটার টাইফুন সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে সক্ষম (সংগৃহীত ছবি)

বিমান বাহিনীতে ‘টাইফুন’ যুক্ত হলে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষার পরিধি আরও অনেক বিস্তৃত হবে। জাতীয় আকাশসীমায় হুমকি আসার আগেই এর দূরপাল্লার সেন্সর এবং বিভিআর মিসাইল মোকাবিলা করার সক্ষমতা রাখে। এছাড়াও এটি বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করবে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্পদ ও বাণিজ্য রুট সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট

যুদ্ধবিমান টাইফুন কেনার আলোচনা এমন সময়ে হচ্ছে, যখন দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভারত রাফাল যুক্ত করেছে। পাকিস্তান ‘জেএফ-১৭’ উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে। মিয়ানমারও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিমান বাহিনী আধুনিকায়ন করেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশ্চিমা দেশের যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়াবে। ফলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় সংহতি আনবে।

এ বিষয়ে বিমান বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, ফ্রান্সের তৈরি এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জঙ্গি বিমান রাফালের সমপর্যায়ের শক্তিশালী বলে ধরা হয় টাইফুনকে। যা ‘জেএফ-১৭’-এর চেয়ে অনেক উন্নত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাফাল ফ্রান্স-নির্ভর, আর টাইফুন ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ প্ল্যাটফর্ম, ফলে একক দেশের ওপর নির্ভরতা কম।

আর্থিক ও শিল্প সহযোগিতা

সম্ভাব্য চুক্তির সুনির্দিষ্ট মূল্য জানা না গেলেও, ধারণা করা হচ্ছে একটি টাইফুনের দাম হতে পারে ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন ইউরোর মধ্যে (কনফিগারেশনের ওপর ভিত্তি করে)। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা এবং সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও থাকতে পারে।

এই যুদ্ধবিমানের কারণে বিমান বাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে (সংগৃহীত ছবি)এই যুদ্ধবিমানের কারণে বিমান বাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে (সংগৃহীত ছবি)

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইতালির পক্ষ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা (এমআরও), পাইলট ও টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণ এবং টেকনোলজি পার্টনারশিপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সরকারের উচ্চপর্যায় অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।

তবে ইউরোফাইটার টাইফুনে বাংলাদেশের আগ্রহকে বিমান বাহিনী আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিমান বাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতায় যুগান্তকারী উন্নয়ন আনতে পারে, কৌশলগত অংশীদারিত্ব বিস্তৃত করবে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য আঞ্চলিক আকাশশক্তির কাঠামোয় বাংলাদেশের অবস্থান বদলে দেবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ আকাশ প্রতিরক্ষায় কী পরিবর্তন আনবে?

আপডেট সময় : ০২:৩৩:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

যুদ্ধবিমান ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ (মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট-এমআরসিএ) কিনতে ইতালির প্রতিষ্ঠান লিওনার্দো এসপিএ’র সঙ্গে একটি লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বা সম্মতিপত্র সই করেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর মাধ্যমে আকাশ প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে বড় পদক্ষেপ নিলো বাংলাদেশ সরকার।

ধারণা করা হচ্ছে, এই সম্মতিপত্র সইয়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের চীন এবং রাশিয়া নির্ভরতা থেকে সরে এসে ইউরোপীয় প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকতে পারে বাংলাদেশ। এটি ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অধীনে (বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা) বিমানবাহিনীর সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগগুলোর একটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতালি থেকে কতগুলো যুদ্ধবিমান কেনা হতে পারে সে বিষয়ে এলওআই সইয়ের মাধ্যমে আলোচনা শুরু হলো। তবে সংখ্যা, মূল্য এবং কনফিগারেশনের ওপর নির্ভর করবে সরকারের অনুমোদন এবং পরবর্তী মূল্যায়ন।

গত মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) বিমানবাহিনীর সদর দফতরে হওয়া এলওআই সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল আহসানসহ দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত বলেন, ‘ইউরোফাইটার কেনা বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় অগ্রগতি আনবে। এতে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাও মিলবে।’

তিনি বলেন, ‘ইউরোফাইটার আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষায় অনুপ্রেরণার কাজ করবে। এতে বিমানবাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে এবং আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় বাংলাদেশকে সক্ষম ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে তুলে ধরবে।’

ইউরোফাইটার টাইফুন কী?

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হতে যাওয়া নতুন এই যুদ্ধবিমান সম্পর্কে ইউরোফাইটারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধবিমান বিশ্বের সবচেয়ে সক্ষম ৪.৫ জেনারেশন মাল্টিরোল যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। এটি বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক সুইংরোল কমব্যাট বিমান। বিশ্বের নয়টি দেশের বিমানবাহিনীর কাছে এই যুদ্ধবিমান রয়েছে।

দুই ইঞ্জিনের ইউরোফাইটার টাইফুন সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে সক্ষম। রয়েছে ডেল্টা উইং, ক্যানার্ড এবং এয়ার-টু-এয়ার ও এয়ার-টু-গ্রাউন্ড উভয় মিশনে সক্ষমতা। বর্তমানে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, অস্ট্রিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান ও কাতারের কাছে এই যুদ্ধবিমান রয়েছে।

এয়ার-টু-এয়ার ও এয়ার-টু-গ্রাউন্ড উভয় মিশনের সক্ষমতা রয়েছে এই যুদ্ধবিমানের (সংগৃহীত ছবি)এয়ার-টু-এয়ার ও এয়ার-টু-গ্রাউন্ড উভয় মিশনের সক্ষমতা রয়েছে এই যুদ্ধবিমানের (সংগৃহীত ছবি)

উন্নত সেন্সর স্যুটে রয়েছে এইএসএ রাডার (অত্যাধুনিক রাডার প্রযুক্তি), ইনফ্রারেড ট্র্যাকিং এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম। এছাড়াও এটিতে আছে দূরপাল্লার বিভিআর মিসাইল (আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র) প্রযুক্তি, অ্যান্টিশিপ মিসাইল, গাইডেড বোমা, প্রিসিশন স্ট্রাইক অস্ত্র এবং রিয়েল-টাইম ব্যাটেলফিল্ড ডেটা প্রক্রিয়াকরণ। সব মিলিয়ে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এটি ভয়ংকর অস্ত্র।

তবে বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের চাহিদার ওপর নির্ভর করে কনফিগারেশন আলাদা হতে পারে।

বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা

ইউরোফাইটার বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্য একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের আকাশ শক্তি মূলত ‘চীনা এফ-৭’ ভ্যারিয়েন্ট এবং অল্প সংখ্যক রাশিয়ান ‘মিগ-২৯’-এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। এগুলো প্ল্যাটফর্ম রেঞ্জ, টিকে থাকার সক্ষমতা, অ্যাভিওনিক্স এবং রক্ষণাবেক্ষণে নানান রকমের সীমাবদ্ধতায় ভুগছে।

দুই ইঞ্জিনের ইউরোফাইটার টাইফুন সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে সক্ষম (সংগৃহীত ছবি)দুই ইঞ্জিনের ইউরোফাইটার টাইফুন সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে সক্ষম (সংগৃহীত ছবি)

বিমান বাহিনীতে ‘টাইফুন’ যুক্ত হলে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষার পরিধি আরও অনেক বিস্তৃত হবে। জাতীয় আকাশসীমায় হুমকি আসার আগেই এর দূরপাল্লার সেন্সর এবং বিভিআর মিসাইল মোকাবিলা করার সক্ষমতা রাখে। এছাড়াও এটি বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করবে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্পদ ও বাণিজ্য রুট সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট

যুদ্ধবিমান টাইফুন কেনার আলোচনা এমন সময়ে হচ্ছে, যখন দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভারত রাফাল যুক্ত করেছে। পাকিস্তান ‘জেএফ-১৭’ উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে। মিয়ানমারও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিমান বাহিনী আধুনিকায়ন করেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশ্চিমা দেশের যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়াবে। ফলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় সংহতি আনবে।

এ বিষয়ে বিমান বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, ফ্রান্সের তৈরি এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জঙ্গি বিমান রাফালের সমপর্যায়ের শক্তিশালী বলে ধরা হয় টাইফুনকে। যা ‘জেএফ-১৭’-এর চেয়ে অনেক উন্নত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাফাল ফ্রান্স-নির্ভর, আর টাইফুন ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ প্ল্যাটফর্ম, ফলে একক দেশের ওপর নির্ভরতা কম।

আর্থিক ও শিল্প সহযোগিতা

সম্ভাব্য চুক্তির সুনির্দিষ্ট মূল্য জানা না গেলেও, ধারণা করা হচ্ছে একটি টাইফুনের দাম হতে পারে ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন ইউরোর মধ্যে (কনফিগারেশনের ওপর ভিত্তি করে)। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা এবং সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও থাকতে পারে।

এই যুদ্ধবিমানের কারণে বিমান বাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে (সংগৃহীত ছবি)এই যুদ্ধবিমানের কারণে বিমান বাহিনীর প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে (সংগৃহীত ছবি)

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইতালির পক্ষ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা (এমআরও), পাইলট ও টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণ এবং টেকনোলজি পার্টনারশিপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সরকারের উচ্চপর্যায় অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।

তবে ইউরোফাইটার টাইফুনে বাংলাদেশের আগ্রহকে বিমান বাহিনী আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিমান বাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতায় যুগান্তকারী উন্নয়ন আনতে পারে, কৌশলগত অংশীদারিত্ব বিস্তৃত করবে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য আঞ্চলিক আকাশশক্তির কাঠামোয় বাংলাদেশের অবস্থান বদলে দেবে।