ঢাকা ০১:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

তফসিল ঘোষণার পর সাময়িক স্বস্তি এলেও ব্যবসায়ীদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বাংলাদেশের ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তা মহলে এক ধরনের সাময়িক স্বস্তি ফিরে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি তাঁদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন যে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাঁরা নির্বিঘ্নে তাঁদের শিল্প-কারখানা চালু রাখতে পারবেন কিনা। তবে তাঁরা আশা করছেন যে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। শনিবার গণমাধ্যমকে দেওয়া তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা জানান ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পর ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ স্বস্তি আসবে কেবল একটি সুন্দর, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরই। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোটের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই উদ্বিগ্ন। ট্রাম্প ট্যারিফের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং সার্বিক পরিস্থিতিতে ক্রেতারা তাদের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আগামী মার্চ-এপ্রিলে তৈরি পোশাকের অর্ডার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে। মাহমুদ হাসান বাবু জানান, স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন; তাঁরা নতুন বিনিয়োগের চিন্তা তো করছেনই না, বরং ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত কিভাবে টিকে থাকবেন, সেই চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে যেভাবেই হোক একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন দরকার, যার মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসবে। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তার কারণে ইতোমধ্যে অনেক বিদেশি ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে তাদের অর্ডার অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে, যা গত কয়েক মাসের রপ্তানি আয়ের তথ্য পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি, বিশেষ করে শ্রমিক অসন্তোষ যথাযথভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি, যার ফলে অর্ডার কমে গেছে এবং এই অবস্থা এখনও চলছে। তাঁর মতে, নির্বাচনের আগে নতুন বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে; তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে পরবর্তী পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে দেশের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশ চেম্বার অফ ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন—এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি জানান, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সবাই সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন, কিন্তু দুপুরের ঘটনার (ওসমান হাদির ওপর হামলা) পর আবার নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়েছে যে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে কিনা এবং ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে কিনা। তাঁর মতে, সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার আগ পর্যন্ত এই শঙ্কা থেকেই যাবে। নির্বাচনের পরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরে এলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আবারও স্বাভাবিক হবে বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, গত দেড় বছরের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা প্রচণ্ড হতাশায় ও নিরুপায় দিন কাটিয়েছেন, কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ব্যবসায়ীরা আশা করে না। তিনি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করছেন, তবে শুক্রবার ওসমান হাদির ওপর হামলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির ইঙ্গিত বহন করে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পরে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলেও রাতারাতি বিনিয়োগের মন্দা কাটবে না। তাঁর মতে, ব্যাংকে পর্যাপ্ত টাকা নেই এবং বিগত সরকারের আমলে ব্যাংকগুলো ফাঁকা করে ফেলা হয়েছে, ফলে এখন ব্যাংকগুলোর চলতেই কষ্ট হচ্ছে; উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়া কঠিন। জ্বালানি সংকটও সহসা কাটার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে, পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরলে বিনিয়োগের মন্দা কাটতে পারে, তবে এজন্য দুই থেকে তিন বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

তফসিল ঘোষণার পর সাময়িক স্বস্তি এলেও ব্যবসায়ীদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ

আপডেট সময় : ০১:৫৯:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বাংলাদেশের ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তা মহলে এক ধরনের সাময়িক স্বস্তি ফিরে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি তাঁদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন যে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাঁরা নির্বিঘ্নে তাঁদের শিল্প-কারখানা চালু রাখতে পারবেন কিনা। তবে তাঁরা আশা করছেন যে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। শনিবার গণমাধ্যমকে দেওয়া তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা জানান ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পর ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ স্বস্তি আসবে কেবল একটি সুন্দর, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরই। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোটের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই উদ্বিগ্ন। ট্রাম্প ট্যারিফের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং সার্বিক পরিস্থিতিতে ক্রেতারা তাদের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আগামী মার্চ-এপ্রিলে তৈরি পোশাকের অর্ডার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে। মাহমুদ হাসান বাবু জানান, স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন; তাঁরা নতুন বিনিয়োগের চিন্তা তো করছেনই না, বরং ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত কিভাবে টিকে থাকবেন, সেই চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে যেভাবেই হোক একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন দরকার, যার মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসবে। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তার কারণে ইতোমধ্যে অনেক বিদেশি ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে তাদের অর্ডার অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে, যা গত কয়েক মাসের রপ্তানি আয়ের তথ্য পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি, বিশেষ করে শ্রমিক অসন্তোষ যথাযথভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি, যার ফলে অর্ডার কমে গেছে এবং এই অবস্থা এখনও চলছে। তাঁর মতে, নির্বাচনের আগে নতুন বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে; তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে পরবর্তী পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে দেশের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশ চেম্বার অফ ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন—এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি জানান, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সবাই সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন, কিন্তু দুপুরের ঘটনার (ওসমান হাদির ওপর হামলা) পর আবার নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়েছে যে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে কিনা এবং ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে কিনা। তাঁর মতে, সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার আগ পর্যন্ত এই শঙ্কা থেকেই যাবে। নির্বাচনের পরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরে এলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আবারও স্বাভাবিক হবে বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, গত দেড় বছরের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা প্রচণ্ড হতাশায় ও নিরুপায় দিন কাটিয়েছেন, কারণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ব্যবসায়ীরা আশা করে না। তিনি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করছেন, তবে শুক্রবার ওসমান হাদির ওপর হামলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির ইঙ্গিত বহন করে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পরে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলেও রাতারাতি বিনিয়োগের মন্দা কাটবে না। তাঁর মতে, ব্যাংকে পর্যাপ্ত টাকা নেই এবং বিগত সরকারের আমলে ব্যাংকগুলো ফাঁকা করে ফেলা হয়েছে, ফলে এখন ব্যাংকগুলোর চলতেই কষ্ট হচ্ছে; উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়া কঠিন। জ্বালানি সংকটও সহসা কাটার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে, পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরলে বিনিয়োগের মন্দা কাটতে পারে, তবে এজন্য দুই থেকে তিন বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।