ঢাকা ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভারতে কি ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বলা অবৈধ? চলছে মামলা ও ধরপাকড়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৩৮:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫
  • ৩৩ বার পড়া হয়েছে

ভারতে গত মাসে বিভিন্ন বাজার এবং বাড়িতে পুলিশি অভিযান চালানো হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্যে বেশ কিছু মুসলিম যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বাড়িঘরও ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

পোস্টার, টি-শার্ট বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ (আমি মুহাম্মদকে ভালোবাসি) লেখাটিই এই ধরপাকড়ের মূল কারণ। কর্তৃপক্ষ এই স্লোগানটিকে ‘সর্বজনীন শৃঙ্খলা ভঙ্গ’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

অলাভজনক সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস’ (APCR) জানিয়েছে, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রমতে, প্রায় দুই হাজার পাঁচশরও বেশি মুসলিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যে কমপক্ষে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত ৪ সেপ্টেম্বর উত্তর প্রদেশের কানপুর শহরে ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের সময় একটি ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা বোর্ড টাঙানো হয়েছিল। স্থানীয় কিছু হিন্দু গোষ্ঠী এই বোর্ড নিয়ে সমালোচনা শুরু করে। তারা অভিযোগ করে যে, এটি উৎসবে নতুন সংযোজন, যা উত্তর প্রদেশের ধর্মীয় উৎসবে নতুন কিছু যোগ করার ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন।

তবে অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আরও গুরুতর ধারায় মামলা করেছে। এই ধারা প্রয়োগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। কানপুর ঘটনার পর দেশজুড়ে এর সমালোচনা ও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে তেলেঙ্গানা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড ও জম্মু-কাশ্মীরেও। অনেকে সোশ্যাল মিডিয়া এবং টি-শার্টে এই ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ স্লোগানটি ব্যবহার করেন।

কানপুর থেকে প্রায় ২৭০ কিলোমিটার দূরে বরেলির একটি বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে (২৬ সেপ্টেম্বর)। সেখানে স্থানীয় ইমাম তৌকির রাজা ও তার আত্মীয়-সহকর্মীসহ ৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই এলাকায় অভিযুক্তদের অন্তত চারটি ভবন ধ্বংস করা হয়েছে।

গত কয়েক বছর ধরে ভারতে অনেক মুসলিমের বাড়িঘর এভাবেই ধ্বংসের শিকার হয়েছে—অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো আগাম নোটিশ বা আদালতের আদেশ ছাড়াই।

ভারতের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা (আর্টিকেল ২৫) এবং মুক্ত মতপ্রকাশের অধিকার (আর্টিকেল ১৯(১)(এ)) রক্ষা করে—যদি না তা হিংসা বা ঘৃণার উসকানি দেয়। কিন্তু ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে পুলিশ সাধারণত একই সঙ্গে জনসমাগম, দুষ্টতা বা ধর্মীয় উত্তেজনা উসকানোর ধারাও প্রয়োগ করেছে—যা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট বা টি-শার্টের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।

এপিসিআর-এর জাতীয় সমন্বয়কারী নাদিম খান প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতের অনেক জায়গায় অনেক দিন ধরে হিন্দু দেবতাদের অস্ত্রসহ ছবি প্রচলিত—সেগুলো কি মুসলিমদের উদ্বিগ্ন বা হুমকিস্বরূপ বলা হবে? তিনি বলেন, সরকার কোনো ধর্মকেই এইভাবে অপরাধের আওতায় আনতে পারে না।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বোর্ড চেয়ার আকার প্যাটেল বলেছেন, ‘আই লাভ মুহাম্মদ’—যা শান্তিপূর্ণ এবং ঘৃণা-উস্কানিমুক্ত—এমন স্লোগানের বিরুদ্ধে দমন আইন প্রয়োগ করা কেবল সংবিধানের লঙ্ঘনই নয়, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেরও পরিপন্থী। তিনি বলেন, ‘পাবলিক অর্ডার’ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তা যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে হবে, কোনোভাবেই পুরো ধর্মীয় পরিচয়কে চেপে দেওয়া যাবে না।

সমালোচকরা বলছেন, ২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে লক্ষ্যভিত্তিক আইনগত ও সামাজিক চাপ বেড়েছে, এই ঘটনা তারই সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। গত ১১ বছরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণাসূচক বক্তব্যের ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৬৬৮টি নথিভুক্ত ঘটনা থেকে এই সংখ্যা ২০২৪ সালে ১,১৬৫-এ পৌঁছেছে (প্রায় ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি)। অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে অথবা নির্বাচনের আগে যেখানে উত্তেজনা বাড়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলি মনে করেন, একটি সম্পূর্ণ ‘ইকোসিস্টেম’ কাজ করছে—যা সাজানো সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার সাংগঠনিক প্রচার পর্যন্ত বিস্তৃত—যাতে কোনো স্থানীয় বিবাদ দ্রুত জাতীয় ইস্যুতে রূপ নিতে পারে।

বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াই বলেছেন, ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বিতর্কটি মূলত রাজনৈতিক, ধর্মীয় নয়। ভারতের তরুণ মুসলিমদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, কারণ তারা মনে করেন আইনি ও সামাজিক নিয়ম সকলের ওপর সমানভাবে প্রয়োগ হয় না। অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকে তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক। বিশ্লেষক আসিম আলি মনে করেন, এই ধরণের দমন-নীতি তরুণদের আরও বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

ভারতে কি ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বলা অবৈধ? চলছে মামলা ও ধরপাকড়

আপডেট সময় : ০৫:৩৮:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫

ভারতে গত মাসে বিভিন্ন বাজার এবং বাড়িতে পুলিশি অভিযান চালানো হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্যে বেশ কিছু মুসলিম যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বাড়িঘরও ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

পোস্টার, টি-শার্ট বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ (আমি মুহাম্মদকে ভালোবাসি) লেখাটিই এই ধরপাকড়ের মূল কারণ। কর্তৃপক্ষ এই স্লোগানটিকে ‘সর্বজনীন শৃঙ্খলা ভঙ্গ’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

অলাভজনক সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস’ (APCR) জানিয়েছে, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রমতে, প্রায় দুই হাজার পাঁচশরও বেশি মুসলিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যে কমপক্ষে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত ৪ সেপ্টেম্বর উত্তর প্রদেশের কানপুর শহরে ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের সময় একটি ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা বোর্ড টাঙানো হয়েছিল। স্থানীয় কিছু হিন্দু গোষ্ঠী এই বোর্ড নিয়ে সমালোচনা শুরু করে। তারা অভিযোগ করে যে, এটি উৎসবে নতুন সংযোজন, যা উত্তর প্রদেশের ধর্মীয় উৎসবে নতুন কিছু যোগ করার ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন।

তবে অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আরও গুরুতর ধারায় মামলা করেছে। এই ধারা প্রয়োগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। কানপুর ঘটনার পর দেশজুড়ে এর সমালোচনা ও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে তেলেঙ্গানা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড ও জম্মু-কাশ্মীরেও। অনেকে সোশ্যাল মিডিয়া এবং টি-শার্টে এই ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ স্লোগানটি ব্যবহার করেন।

কানপুর থেকে প্রায় ২৭০ কিলোমিটার দূরে বরেলির একটি বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে (২৬ সেপ্টেম্বর)। সেখানে স্থানীয় ইমাম তৌকির রাজা ও তার আত্মীয়-সহকর্মীসহ ৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই এলাকায় অভিযুক্তদের অন্তত চারটি ভবন ধ্বংস করা হয়েছে।

গত কয়েক বছর ধরে ভারতে অনেক মুসলিমের বাড়িঘর এভাবেই ধ্বংসের শিকার হয়েছে—অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো আগাম নোটিশ বা আদালতের আদেশ ছাড়াই।

ভারতের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা (আর্টিকেল ২৫) এবং মুক্ত মতপ্রকাশের অধিকার (আর্টিকেল ১৯(১)(এ)) রক্ষা করে—যদি না তা হিংসা বা ঘৃণার উসকানি দেয়। কিন্তু ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে পুলিশ সাধারণত একই সঙ্গে জনসমাগম, দুষ্টতা বা ধর্মীয় উত্তেজনা উসকানোর ধারাও প্রয়োগ করেছে—যা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট বা টি-শার্টের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।

এপিসিআর-এর জাতীয় সমন্বয়কারী নাদিম খান প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতের অনেক জায়গায় অনেক দিন ধরে হিন্দু দেবতাদের অস্ত্রসহ ছবি প্রচলিত—সেগুলো কি মুসলিমদের উদ্বিগ্ন বা হুমকিস্বরূপ বলা হবে? তিনি বলেন, সরকার কোনো ধর্মকেই এইভাবে অপরাধের আওতায় আনতে পারে না।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বোর্ড চেয়ার আকার প্যাটেল বলেছেন, ‘আই লাভ মুহাম্মদ’—যা শান্তিপূর্ণ এবং ঘৃণা-উস্কানিমুক্ত—এমন স্লোগানের বিরুদ্ধে দমন আইন প্রয়োগ করা কেবল সংবিধানের লঙ্ঘনই নয়, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেরও পরিপন্থী। তিনি বলেন, ‘পাবলিক অর্ডার’ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তা যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে হবে, কোনোভাবেই পুরো ধর্মীয় পরিচয়কে চেপে দেওয়া যাবে না।

সমালোচকরা বলছেন, ২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে লক্ষ্যভিত্তিক আইনগত ও সামাজিক চাপ বেড়েছে, এই ঘটনা তারই সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। গত ১১ বছরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণাসূচক বক্তব্যের ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৬৬৮টি নথিভুক্ত ঘটনা থেকে এই সংখ্যা ২০২৪ সালে ১,১৬৫-এ পৌঁছেছে (প্রায় ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি)। অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে অথবা নির্বাচনের আগে যেখানে উত্তেজনা বাড়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলি মনে করেন, একটি সম্পূর্ণ ‘ইকোসিস্টেম’ কাজ করছে—যা সাজানো সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার সাংগঠনিক প্রচার পর্যন্ত বিস্তৃত—যাতে কোনো স্থানীয় বিবাদ দ্রুত জাতীয় ইস্যুতে রূপ নিতে পারে।

বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াই বলেছেন, ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বিতর্কটি মূলত রাজনৈতিক, ধর্মীয় নয়। ভারতের তরুণ মুসলিমদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, কারণ তারা মনে করেন আইনি ও সামাজিক নিয়ম সকলের ওপর সমানভাবে প্রয়োগ হয় না। অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকে তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক। বিশ্লেষক আসিম আলি মনে করেন, এই ধরণের দমন-নীতি তরুণদের আরও বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।