ঢাকা ০৯:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

বছরজুড়ে উদ্বেগ-বিবৃতি: সরকারের অবস্থানের সমালোচনায় মানবাধিকারকর্মীরা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০৭:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

জাতীয়-আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গত দেড় বছরে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নানা সময়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। এর মধ‍্যে আছে—সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক, র‍্যাব বিলুপ্তি, হয়রানিজনিত হত‍্যা মামলা। এ ধরনের বিবৃতির মধ‍্যেও একই ধরনের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি দেখে প্রশ্ন উঠেছে—মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিবৃতিতে কি আদৌ কান দিচ্ছে সরকার। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সংলাপ বা বৈঠকের মাধ্যমে মতামত শুনেছে। কিন্তু বাস্তবে এখনও নীতিগত পরিবর্তনের গতি খুবই ধীর। তাদের কেউ কেউ বলছেন, দেশি এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকে যে সতর্কতা উচ্চারণ করা হচ্ছে বা যে ধরনের ঘটনার নিন্দা জানানো হচ্ছে, এর কোনোটার ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে দৃশ্যমান বা কার্যকর শক্তিশালী কোনও পদক্ষেপ দেখছেন না মানবাধিকারকর্মীরা।

চলতি বছরের শুরুতেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) প্রতিবেদন বলেছে, শুধু সরকারের পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, ‘সিস্টেমিক সংস্কার’ জরুরি, না হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারা চলতেই থাকবে। নিরাপত্তা বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার জবাবদিহি ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। জুলাই মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বিচার গ্রেফতার, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে দায়মুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে গতি না থাকার কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

তারা বলেছে, যদিও সরকার ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি’ দিয়েছে, কিন্তু ‘কাঠামোগত পরিবর্তন’ ছাড়াই পুনরাবৃত্তি সম্ভব। এছাড়া ভিন্নমত দমনে আগের সরকারের মতো এখনও বিশেষ ক্ষমতা আইনে শত শত লোককে গ্রেফতার করা হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মামলা-গ্রেফতার, গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির কর্মসূচি ঘিরে হতাহতের ঘটনা এবং সম্প্রতি রংপুরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাটের ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনটিতে।

তবে এইচআরডব্লিউয়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে ‘একপেশে’ বলে মন্তব‍্য করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। যখন সংস্থাটি দাবি করে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯২ হাজার ৪৮টি মামলা করেছে পুলিশ, যার বেশিরভাগই হত্যার অভিযোগে। এ বছর সংস্থাটি উদ্বেগ জানিয়ে বলে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থকদের গ্রেফতারে সম্প্রতি সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে কর্মরত জাতিসংঘের মানবাধিকার দলের নির্বিচারে আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানানো উচিত বলেও উল্লেখ করেন তারা। এছাড়া জাতিসংঘের ওই দলের উচিত হবে মানবাধিকার রক্ষা ও রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য কর্তৃপক্ষকে উৎসাহিত করা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকায় একটি আলোচনা সভা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাংবাদিককে আটকের ঘটনাও তুলে ধরা হয়। অক্টোবরে বাংলাদেশে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থকদের গ্রেফতারে সম্প্রতি সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার বাড়াচ্ছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়। 

এদিকে আরেক আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে সংগঠনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক আঞ্চলিক গবেষক তাকবির হুদা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন পুরোপুরি মেনে চলার জন্য অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রত্যাহার বা উল্লেখযোগ্যভাবে সংশোধনের আহ্বান জানাচ্ছে।’

২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশে পদ্ধতিগত সংস্কারের মধ্যে মানবাধিকার নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ তার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অবস্থান করছে। দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর গত আট মাসের বেশি সময় ধরে একটি নতুন ভবিষ্যতের দিকে পথ তৈরি করতে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে দৃঢ় তদারকি ও জবাবদিহি বাড়াতে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) সংস্কার করতে হবে। এছাড়া দেশের মানবাধিকার সংগঠনের মধ‍্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্র প্রতিটি লঙ্ঘনের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

সরকার কি কিছু শুনতে পাচ্ছে?

একের পর এক ঘটনা ধরে বিবৃতি দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো, অন্তর্বর্তী সরকার তার পরিপ্রেক্ষিতে কোনও ব‍্যবস্থা নিয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নে মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, সরকারের মধ‍্যে মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রশ্নে ‘এড়িয়ে যাওয়া’র প্রবণতা আছে। কখনও কখনও বিবৃতির পরপরই ক্ষেত্রবিশেষে পরিবর্তন দেখে মনে হতে পারে সরকার আমলে নিয়ে ব‍্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু সেটা সর্বজনীন প্রয়োগ হতে না দেখে বোঝা যায়, এর সঙ্গে সরকারের আমলে নেওয়া যুক্ত নয়।

সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সংলাপ বা বৈঠকের মাধ্যমে মতামত শুনেছে উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী ফয়জুল কবীর বলেন, ‘‘তবে বাস্তবে এখনও নীতিগত পরিবর্তনের গতি খুবই ধীর। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ঘাটতি এখনও স্পষ্ট। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলার বার্তা দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আচরণে তার প্রতিফলন যথেষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কেননা, এখনও হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর মতো অভিযোগগুলো আমাদের শুনতে হচ্ছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নাগরিকদের মধ্যে আস্থা স্থাপন, যা শুধু প্রতিশ্রুতিতে নয়, অবশ্যই তা স্পষ্ট পদক্ষেপে প্রমাণ করতে হবে। সন্ত্রাসবিরোধী, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও ডিজিটাল আইনের অপব্যবহার বন্ধ করা, ঢালাও মামলাগুলোতে স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই সেই আস্থার ভিত্তি হতে পারে।’’

মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, ‘‘বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রচুর পরিমাণে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটেছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ হয়েছে— সেগুলো যে সম্পূর্ণরূপে এখন বন্ধ হয়ে গেছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই বলা যাবে না। সেটা এখন নানান প্রক্রিয়ায় আসলে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার হরণের ঘটনা, বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হওয়ার পরেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ড. ইউনূস সরকারের আমলে প্রায় ৪০ জনের ওপরে ব্যক্তিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। বেশির ভাগই হেফাজতে থাকা অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। এগুলো আসলে নিঃসন্দেহে একটা খারাপ লক্ষণ এবং একইসঙ্গে যদি আপনি চিন্তা করেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা করতো, তার রিপ্লেসমেন্ট হয়েছে ‘মব ভায়োলেন্সের’ মধ্য দিয়ে। মব ভায়োলেন্সের মধ্য দিয়ে তো আমরা প্রায় এক বছরের ওপরে দুই থেকে আড়াইশত ঘটনা দেখতে পাচ্ছি এবং এর মধ্য দিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাটাও কিন্তু যথেষ্ট মাত্রায় বেশি, যা ৫০-এর ওপরে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কি তাহলে এখন ‘মব জাস্টিসে রূপান্তরিত হয়েছে?’’ তিনি বলেন, ‘‘আমাদের এখনকার মানবাধিকার সুরক্ষার বাস্তবতায় বিবৃতি এবং একইসঙ্গে যে প্রতিবাদ, সেগুলোর একটা হয়তো গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু এটা আসলে কতটুকু কার্যকর এবং তার প্রেক্ষাপটে সেগুলোর মধ্য দিয়ে কী পরিমাণ ব‍্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটা আসলে স্পষ্ট না।’’

তার মতে, দ্বিতীয় বিষয়টা হলো, আইন আদালতে বিচার ব্যবস্থা, শাসন রক্ষা করার ক্ষেত্রে, সেগুলোও তো আসলে মবের শিকার হচ্ছে। সুতরাং, বিচার প্রক্রিয়াও আসলে ব্যাপক মাত্রায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিচারালয়ের মাঝে বিভিন্ন ধরনের হট্টগোল, গণ্ডগোল, আদালত অবমাননার ঘটনা পর্যন্ত আমরা নানাভাবে দেখতে পাচ্ছি। সেখানে যিনি ও যারা অভিযুক্ত অপরাধী তাদের বিষয়ে আসলে কী ধরনের কী পরিমাণ সাহায্য-সহযোগিতা করা হচ্ছে, বা মানবাধিকার রক্ষা করবার ক্ষেত্রে ভূমিকা, মানবাধিকার সংগঠন এবং ব্যক্তি পর্যায়ে মানবাধিকারকর্মীরা রাখতে পারছেন—সেটাও এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। তো সব মিলিয়ে মানবাধিকার হরণের রাজনীতি, মানবতাবিরোধী অপরাধের রাজনীতি, যেটা বিগত সময়গুলোতে হয়েছে হাসিনার আমলে, সেই রাজনীতিটা এখনও একরকমভাবে চলছে।

আমরা অনেক কথাবার্তা বলছি বা বিভিন্ন সংগঠন দেশি এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকে নানা সতর্কবার্তা উচ্চারিত হলেও খুব কার্যকর ও শক্তিশালী কোনও পদক্ষেপ নিতে দেখছি না, উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সদস্য নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পর মানুষের একটা আশা আকাঙ্ক্ষা ছিল— মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, দেশ গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরু করবে। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে যে মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখন পর্যন্ত বলার সুযোগ নেই যে মানবাধিকার পরিস্থিতি আমাদের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছেছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পর আমরা দেখলাম সংখ্যালঘুদের ওপরে নির্যাতন হতে, বাড়িঘরে আক্রমণ হতে, দেখেছি মব কালচারের নামে, মব সন্ত্রাসের নামে মানুষকে হেনস্তা করতে, নির্যাতন করতে, হত্যা করতে, মব সন্ত্রাস করে চাঁদাবাজি করতে, হাজার হাজার মামলায় হাজার হাজার লোককে আসামি করা হয়েছে, যা পূর্বের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ ফ্যাসিস্ট চলে গেছে, কিন্তু ফ্যাসিস্টের যে চেহারা, মানে ফ্যাসিস্টের যে কর্মকাণ্ড, সেই কাজগুলো এখনও হচ্ছে। আমরা দেখছি এখনও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটছে এবং সেই সংখ্যা যাই হোক না কেন, ঘটনাগুলো ঘটছে। আমরা এখনও দেখছি ঢাকা শহরের আশপাশে নদীতে লাশ ভাসছে। আগে বুলেটবিদ্ধ লাশ দেখতাম, এখন বুলেটবিদ্ধ না, কিন্তু লাশ ভাসছে এবং সেই সংখ্যাও তুলনামূলক কম না। ৫ আগস্টের পরে বাংলাদেশটা হবে গণতন্ত্রের, বাংলাদেশটা হবে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার, সেই জায়গায় মানুষ কিন্তু ক্রমান্বয়ে হতাশ হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, তারপর একদলের সঙ্গে আরেক দলের সংঘাত, এটা কিন্তু চলমান এবং এটাতে সমাজ এক ধরনের অস্থিরতার মধ্যে পড়ে গেছে। দেশ এক ধরনের অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে।’’

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আর্চারি ফেডারেশনে আর্থিক স্বচ্ছতা ফেরাতে গিয়ে কোষাধ্যক্ষ অপসারিত

বছরজুড়ে উদ্বেগ-বিবৃতি: সরকারের অবস্থানের সমালোচনায় মানবাধিকারকর্মীরা

আপডেট সময় : ০৮:০৭:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫

জাতীয়-আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গত দেড় বছরে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নানা সময়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। এর মধ‍্যে আছে—সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক, র‍্যাব বিলুপ্তি, হয়রানিজনিত হত‍্যা মামলা। এ ধরনের বিবৃতির মধ‍্যেও একই ধরনের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি দেখে প্রশ্ন উঠেছে—মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিবৃতিতে কি আদৌ কান দিচ্ছে সরকার। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সংলাপ বা বৈঠকের মাধ্যমে মতামত শুনেছে। কিন্তু বাস্তবে এখনও নীতিগত পরিবর্তনের গতি খুবই ধীর। তাদের কেউ কেউ বলছেন, দেশি এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকে যে সতর্কতা উচ্চারণ করা হচ্ছে বা যে ধরনের ঘটনার নিন্দা জানানো হচ্ছে, এর কোনোটার ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে দৃশ্যমান বা কার্যকর শক্তিশালী কোনও পদক্ষেপ দেখছেন না মানবাধিকারকর্মীরা।

চলতি বছরের শুরুতেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) প্রতিবেদন বলেছে, শুধু সরকারের পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, ‘সিস্টেমিক সংস্কার’ জরুরি, না হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারা চলতেই থাকবে। নিরাপত্তা বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার জবাবদিহি ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। জুলাই মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বিচার গ্রেফতার, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে দায়মুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে গতি না থাকার কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

তারা বলেছে, যদিও সরকার ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি’ দিয়েছে, কিন্তু ‘কাঠামোগত পরিবর্তন’ ছাড়াই পুনরাবৃত্তি সম্ভব। এছাড়া ভিন্নমত দমনে আগের সরকারের মতো এখনও বিশেষ ক্ষমতা আইনে শত শত লোককে গ্রেফতার করা হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মামলা-গ্রেফতার, গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির কর্মসূচি ঘিরে হতাহতের ঘটনা এবং সম্প্রতি রংপুরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাটের ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনটিতে।

তবে এইচআরডব্লিউয়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে ‘একপেশে’ বলে মন্তব‍্য করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। যখন সংস্থাটি দাবি করে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯২ হাজার ৪৮টি মামলা করেছে পুলিশ, যার বেশিরভাগই হত্যার অভিযোগে। এ বছর সংস্থাটি উদ্বেগ জানিয়ে বলে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থকদের গ্রেফতারে সম্প্রতি সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে কর্মরত জাতিসংঘের মানবাধিকার দলের নির্বিচারে আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানানো উচিত বলেও উল্লেখ করেন তারা। এছাড়া জাতিসংঘের ওই দলের উচিত হবে মানবাধিকার রক্ষা ও রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য কর্তৃপক্ষকে উৎসাহিত করা।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকায় একটি আলোচনা সভা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাংবাদিককে আটকের ঘটনাও তুলে ধরা হয়। অক্টোবরে বাংলাদেশে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থকদের গ্রেফতারে সম্প্রতি সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার বাড়াচ্ছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়। 

এদিকে আরেক আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে সংগঠনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক আঞ্চলিক গবেষক তাকবির হুদা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন পুরোপুরি মেনে চলার জন্য অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রত্যাহার বা উল্লেখযোগ্যভাবে সংশোধনের আহ্বান জানাচ্ছে।’

২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশে পদ্ধতিগত সংস্কারের মধ্যে মানবাধিকার নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ তার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অবস্থান করছে। দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর গত আট মাসের বেশি সময় ধরে একটি নতুন ভবিষ্যতের দিকে পথ তৈরি করতে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে দৃঢ় তদারকি ও জবাবদিহি বাড়াতে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) সংস্কার করতে হবে। এছাড়া দেশের মানবাধিকার সংগঠনের মধ‍্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্র প্রতিটি লঙ্ঘনের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

সরকার কি কিছু শুনতে পাচ্ছে?

একের পর এক ঘটনা ধরে বিবৃতি দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো, অন্তর্বর্তী সরকার তার পরিপ্রেক্ষিতে কোনও ব‍্যবস্থা নিয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নে মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, সরকারের মধ‍্যে মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রশ্নে ‘এড়িয়ে যাওয়া’র প্রবণতা আছে। কখনও কখনও বিবৃতির পরপরই ক্ষেত্রবিশেষে পরিবর্তন দেখে মনে হতে পারে সরকার আমলে নিয়ে ব‍্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু সেটা সর্বজনীন প্রয়োগ হতে না দেখে বোঝা যায়, এর সঙ্গে সরকারের আমলে নেওয়া যুক্ত নয়।

সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সংলাপ বা বৈঠকের মাধ্যমে মতামত শুনেছে উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী ফয়জুল কবীর বলেন, ‘‘তবে বাস্তবে এখনও নীতিগত পরিবর্তনের গতি খুবই ধীর। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ঘাটতি এখনও স্পষ্ট। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলার বার্তা দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আচরণে তার প্রতিফলন যথেষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কেননা, এখনও হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর মতো অভিযোগগুলো আমাদের শুনতে হচ্ছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নাগরিকদের মধ্যে আস্থা স্থাপন, যা শুধু প্রতিশ্রুতিতে নয়, অবশ্যই তা স্পষ্ট পদক্ষেপে প্রমাণ করতে হবে। সন্ত্রাসবিরোধী, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও ডিজিটাল আইনের অপব্যবহার বন্ধ করা, ঢালাও মামলাগুলোতে স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই সেই আস্থার ভিত্তি হতে পারে।’’

মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, ‘‘বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রচুর পরিমাণে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটেছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ হয়েছে— সেগুলো যে সম্পূর্ণরূপে এখন বন্ধ হয়ে গেছে, সেটা আসলে কোনোভাবেই বলা যাবে না। সেটা এখন নানান প্রক্রিয়ায় আসলে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার হরণের ঘটনা, বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হওয়ার পরেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ড. ইউনূস সরকারের আমলে প্রায় ৪০ জনের ওপরে ব্যক্তিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। বেশির ভাগই হেফাজতে থাকা অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। এগুলো আসলে নিঃসন্দেহে একটা খারাপ লক্ষণ এবং একইসঙ্গে যদি আপনি চিন্তা করেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা করতো, তার রিপ্লেসমেন্ট হয়েছে ‘মব ভায়োলেন্সের’ মধ্য দিয়ে। মব ভায়োলেন্সের মধ্য দিয়ে তো আমরা প্রায় এক বছরের ওপরে দুই থেকে আড়াইশত ঘটনা দেখতে পাচ্ছি এবং এর মধ্য দিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাটাও কিন্তু যথেষ্ট মাত্রায় বেশি, যা ৫০-এর ওপরে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কি তাহলে এখন ‘মব জাস্টিসে রূপান্তরিত হয়েছে?’’ তিনি বলেন, ‘‘আমাদের এখনকার মানবাধিকার সুরক্ষার বাস্তবতায় বিবৃতি এবং একইসঙ্গে যে প্রতিবাদ, সেগুলোর একটা হয়তো গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু এটা আসলে কতটুকু কার্যকর এবং তার প্রেক্ষাপটে সেগুলোর মধ্য দিয়ে কী পরিমাণ ব‍্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটা আসলে স্পষ্ট না।’’

তার মতে, দ্বিতীয় বিষয়টা হলো, আইন আদালতে বিচার ব্যবস্থা, শাসন রক্ষা করার ক্ষেত্রে, সেগুলোও তো আসলে মবের শিকার হচ্ছে। সুতরাং, বিচার প্রক্রিয়াও আসলে ব্যাপক মাত্রায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিচারালয়ের মাঝে বিভিন্ন ধরনের হট্টগোল, গণ্ডগোল, আদালত অবমাননার ঘটনা পর্যন্ত আমরা নানাভাবে দেখতে পাচ্ছি। সেখানে যিনি ও যারা অভিযুক্ত অপরাধী তাদের বিষয়ে আসলে কী ধরনের কী পরিমাণ সাহায্য-সহযোগিতা করা হচ্ছে, বা মানবাধিকার রক্ষা করবার ক্ষেত্রে ভূমিকা, মানবাধিকার সংগঠন এবং ব্যক্তি পর্যায়ে মানবাধিকারকর্মীরা রাখতে পারছেন—সেটাও এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। তো সব মিলিয়ে মানবাধিকার হরণের রাজনীতি, মানবতাবিরোধী অপরাধের রাজনীতি, যেটা বিগত সময়গুলোতে হয়েছে হাসিনার আমলে, সেই রাজনীতিটা এখনও একরকমভাবে চলছে।

আমরা অনেক কথাবার্তা বলছি বা বিভিন্ন সংগঠন দেশি এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকে নানা সতর্কবার্তা উচ্চারিত হলেও খুব কার্যকর ও শক্তিশালী কোনও পদক্ষেপ নিতে দেখছি না, উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সদস্য নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পর মানুষের একটা আশা আকাঙ্ক্ষা ছিল— মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, দেশ গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরু করবে। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে যে মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখন পর্যন্ত বলার সুযোগ নেই যে মানবাধিকার পরিস্থিতি আমাদের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছেছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পর আমরা দেখলাম সংখ্যালঘুদের ওপরে নির্যাতন হতে, বাড়িঘরে আক্রমণ হতে, দেখেছি মব কালচারের নামে, মব সন্ত্রাসের নামে মানুষকে হেনস্তা করতে, নির্যাতন করতে, হত্যা করতে, মব সন্ত্রাস করে চাঁদাবাজি করতে, হাজার হাজার মামলায় হাজার হাজার লোককে আসামি করা হয়েছে, যা পূর্বের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ ফ্যাসিস্ট চলে গেছে, কিন্তু ফ্যাসিস্টের যে চেহারা, মানে ফ্যাসিস্টের যে কর্মকাণ্ড, সেই কাজগুলো এখনও হচ্ছে। আমরা দেখছি এখনও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটছে এবং সেই সংখ্যা যাই হোক না কেন, ঘটনাগুলো ঘটছে। আমরা এখনও দেখছি ঢাকা শহরের আশপাশে নদীতে লাশ ভাসছে। আগে বুলেটবিদ্ধ লাশ দেখতাম, এখন বুলেটবিদ্ধ না, কিন্তু লাশ ভাসছে এবং সেই সংখ্যাও তুলনামূলক কম না। ৫ আগস্টের পরে বাংলাদেশটা হবে গণতন্ত্রের, বাংলাদেশটা হবে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার, সেই জায়গায় মানুষ কিন্তু ক্রমান্বয়ে হতাশ হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, তারপর একদলের সঙ্গে আরেক দলের সংঘাত, এটা কিন্তু চলমান এবং এটাতে সমাজ এক ধরনের অস্থিরতার মধ্যে পড়ে গেছে। দেশ এক ধরনের অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে।’’