ঢাকা ০৩:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

এনবিআর কর্মকর্তার ঘুষ বাণিজ্যে ১৬০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:১২:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের বিশেষ আশীর্বাদে ছোট পদে থেকেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পেয়েছিলেন তৎকালীন দ্বিতীয় সচিব নিয়াজ মোর্শেদ। এনবিআর সূত্র অনুযায়ী, এই ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি ১০ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সরকারের প্রায় ১৬০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি করেছেন। এই গুরুতর অভিযোগের তদন্ত শুরু হলেও নিয়াজের ‘অদৃশ্য ক্ষমতায়’ তা ধামাচাপা পড়ে আছে। বর্তমানে তিনি পদোন্নতি পেয়ে ব্রাসেলসে কমার্শিয়াল কাউন্সেলরের লোভনীয় পদে আসীন হয়েছেন, যা আয়কর বিভাগের সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিএসআরএম লিমিটেড ও বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেডের ১০ জন বিদেশি বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রির বিপরীতে উৎসে কর দেননি, যা তৎকালীন আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ছিল। হাবিব ব্যাংক কর কেটে না রাখায় বাংলাদেশ ব্যাংক আপত্তি জানালে ২০২০ সালের জুলাইয়ে এনবিআরকে চিঠি দেয়। এনবিআরের করনীতি শাখা সে বিষয়ে ব্যাখ্যায় স্পষ্ট বলেছিল, প্রত্যয়নপত্র ছাড়া করমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে না এবং উৎসে কর না কাটলে জরিমানা কার্যকর হবে।

বিএসআরএমের পক্ষ থেকে তৎকালীন কর উপদেষ্টা হুমায়রা সাইদার কাছ থেকে ১০ কোটি টাকার উৎকোচের চুক্তি করার পর নিয়াজ মোর্শেদ দাপ্তরিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজ অধিক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে ২০২২ সালের অক্টোবরে বৃহৎ করদাতা ইউনিটকে (এলটিইউ) আইনের ভুল ব্যাখ্যা দেন। এই বেআইনি মতামতের ফলে সরকার প্রায় ১৫৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা কর হারিয়েছে। এনবিআরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন যে, এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার এখতিয়ার আন্তর্জাতিক কর শাখার নয়, এটি করনীতি শাখার দায়িত্ব।

নিয়াজের এই অবৈধ কাজে তৎকালীন আন্তর্জাতিক কর শাখার সদস্য একেএম বদিউল আলম এবং এলটিইউ কমিশনার মো. ইকবাল হোসেনের যোগসাজশ ছিল। ঘুষের বিনিময়ে নিয়াজের অবৈধ কাজের অনুসন্ধানে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) কাজ শুরু করলেও, পরে এনবিআর চেয়ারম্যানের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক করের দায়িত্বরত সদস্য মো. লুৎফুল আজীমকে। নিয়াজের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় এই তদন্ত ধামাচাপা পড়ে আছে বলে আয়কর কর্মকর্তারা মনে করছেন।

নানা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও নিয়াজ মোর্শেদ বর্তমানে যুগ্ম কর কমিশনার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন এবং চার বছরের জন্য ব্রাসেলসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর পদে নিয়োগ পেয়েছেন। আয়কর কর্মকর্তারা এই ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, নিয়াজের মতো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা প্রশ্রয় পেলে সৎ কর্মকর্তারা বঞ্চিত হবেন।

তবে এ বিষয়ে নিয়াজ মোর্শেদ তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এখানে ক্ষমতার অপব্যবহার বা নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি। বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রত্যয়ন দেয় আন্তর্জাতিক কর শাখা… আমরা সেটার ব্যাখ্যা দিয়েছি এবং নিয়মানুসারে যথাযথ কর আরোপ করা হয়েছিল। তাছাড়া আমি ছিলাম তখন জুনিয়র অফিসার, এটা আমার মাধ্যমে কিভাবে হবে?”

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

এলপিজি আমদানিতে বিশেষ ঋণসুবিধা: ২৭০ দিন পর্যন্ত বাকিতে আনার সুযোগ

এনবিআর কর্মকর্তার ঘুষ বাণিজ্যে ১৬০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

আপডেট সময় : ০৩:১২:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের বিশেষ আশীর্বাদে ছোট পদে থেকেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পেয়েছিলেন তৎকালীন দ্বিতীয় সচিব নিয়াজ মোর্শেদ। এনবিআর সূত্র অনুযায়ী, এই ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি ১০ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সরকারের প্রায় ১৬০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি করেছেন। এই গুরুতর অভিযোগের তদন্ত শুরু হলেও নিয়াজের ‘অদৃশ্য ক্ষমতায়’ তা ধামাচাপা পড়ে আছে। বর্তমানে তিনি পদোন্নতি পেয়ে ব্রাসেলসে কমার্শিয়াল কাউন্সেলরের লোভনীয় পদে আসীন হয়েছেন, যা আয়কর বিভাগের সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিএসআরএম লিমিটেড ও বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেডের ১০ জন বিদেশি বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রির বিপরীতে উৎসে কর দেননি, যা তৎকালীন আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ছিল। হাবিব ব্যাংক কর কেটে না রাখায় বাংলাদেশ ব্যাংক আপত্তি জানালে ২০২০ সালের জুলাইয়ে এনবিআরকে চিঠি দেয়। এনবিআরের করনীতি শাখা সে বিষয়ে ব্যাখ্যায় স্পষ্ট বলেছিল, প্রত্যয়নপত্র ছাড়া করমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে না এবং উৎসে কর না কাটলে জরিমানা কার্যকর হবে।

বিএসআরএমের পক্ষ থেকে তৎকালীন কর উপদেষ্টা হুমায়রা সাইদার কাছ থেকে ১০ কোটি টাকার উৎকোচের চুক্তি করার পর নিয়াজ মোর্শেদ দাপ্তরিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজ অধিক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে ২০২২ সালের অক্টোবরে বৃহৎ করদাতা ইউনিটকে (এলটিইউ) আইনের ভুল ব্যাখ্যা দেন। এই বেআইনি মতামতের ফলে সরকার প্রায় ১৫৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা কর হারিয়েছে। এনবিআরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন যে, এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার এখতিয়ার আন্তর্জাতিক কর শাখার নয়, এটি করনীতি শাখার দায়িত্ব।

নিয়াজের এই অবৈধ কাজে তৎকালীন আন্তর্জাতিক কর শাখার সদস্য একেএম বদিউল আলম এবং এলটিইউ কমিশনার মো. ইকবাল হোসেনের যোগসাজশ ছিল। ঘুষের বিনিময়ে নিয়াজের অবৈধ কাজের অনুসন্ধানে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) কাজ শুরু করলেও, পরে এনবিআর চেয়ারম্যানের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক করের দায়িত্বরত সদস্য মো. লুৎফুল আজীমকে। নিয়াজের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় এই তদন্ত ধামাচাপা পড়ে আছে বলে আয়কর কর্মকর্তারা মনে করছেন।

নানা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও নিয়াজ মোর্শেদ বর্তমানে যুগ্ম কর কমিশনার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন এবং চার বছরের জন্য ব্রাসেলসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর পদে নিয়োগ পেয়েছেন। আয়কর কর্মকর্তারা এই ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, নিয়াজের মতো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা প্রশ্রয় পেলে সৎ কর্মকর্তারা বঞ্চিত হবেন।

তবে এ বিষয়ে নিয়াজ মোর্শেদ তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এখানে ক্ষমতার অপব্যবহার বা নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি। বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রত্যয়ন দেয় আন্তর্জাতিক কর শাখা… আমরা সেটার ব্যাখ্যা দিয়েছি এবং নিয়মানুসারে যথাযথ কর আরোপ করা হয়েছিল। তাছাড়া আমি ছিলাম তখন জুনিয়র অফিসার, এটা আমার মাধ্যমে কিভাবে হবে?”