লন্ডনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বারা টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল এখন কার্যত সরকারের কঠোর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মুখে। কাউন্সিলের কর্তৃত্ব মেয়রকে পাশ কাটিয়ে কমিশনারের হাতে চলে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। পূর্ব লন্ডনের ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের বৃহত্তম বসতি এই বারা এবং এর নেতৃত্বে আছেন যুক্তরাজ্যে একমাত্র নির্বাচিত ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুসারে, সম্প্রতি কাউন্সিলের বাইরের অডিটর সংস্থা ইওয়াই কাউন্সিলের কার্যকারিতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক উন্নতির অভাব চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, সরকারের বিধিবদ্ধ হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও কাউন্সিল প্রশাসন সংকটের গভীরতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কারের গতি আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইওয়াই-এর প্রতিবেদনে কাউন্সিলের দশটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, শীর্ষ তিন সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট পদে ঘনঘন পরিবর্তন, স্থায়ী প্রধান অর্থ কর্মকর্তা নিয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা এবং ক্রয় প্রক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ তদন্তে দীর্ঘদিনের ত্রুটিপূর্ণ চর্চা। ইওয়াই-এর পার্টনার স্টিফেন রিড বলেছেন, এসব সমস্যার অনেকগুলোই দীর্ঘদিনের, বহু বছর ধরে বিদ্যমান।
কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী স্টিফেন হ্যালসি বলেছেন, তারা প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর সঙ্গে ‘পুরোপুরি একমত’ এবং সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করছেন।
টাওয়ার হ্যামলেটসে লুৎফুর রহমানের উত্থান এক বিতর্কে ঘেরা ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক অধ্যায়। সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায় জন্ম নেওয়া এই নেতা অল্প বয়সে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। আইন পেশায় যুক্ত হওয়ার পর ২০০২ সালে লেবার পার্টির হয়ে স্পিটালফিল্ডস ও বাংলাটাউন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি কাউন্সিলের লেবার গ্রুপের নেতা ছিলেন।
২০১০ সালে লেবারের মনোনয়ন বিতর্কে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রথম নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হন এবং ব্রিটেনের প্রথম মুসলিম নির্বাহী মেয়র হন। ২০১৪ সালে ‘টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্ট’ পার্টির ব্যানারে পুনর্নির্বাচিত হলেও ২০১৫ সালে নির্বাচনি প্রতারণা ও দুর্নীতির অভিযোগে আদালত ফল বাতিল করে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ করেন। ২০২২ সালে নিষেধাজ্ঞা শেষে ‘এস্পায়ার পার্টি’র ব্যানারে বিপুল ভোটে আবার মেয়র পদে ফেরেন।
চলমান তদন্ত ও সমালোচনা টাওয়ার হ্যামলেটসের বাসিন্দাদের, বিশেষ করে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারার রাজনৈতিক পরিবেশ বারবার বিতর্কে জড়িয়েছে। অবিরাম সরকারি নজরদারি একটি পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর নেতিবাচক ছায়া ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে এবং স্থানীয় গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে।
১৯৯৯ সালের লোকাল গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী আরও কঠোর হস্তক্ষেপের পথ খোলা রয়েছে। বর্তমানে কম আক্রমণাত্মক ‘দূত’ নিয়োগ করা হলেও পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে কমিশনার নিয়োগ। কমিশনাররা আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ক্রয় ও সম্পত্তি নিষ্পত্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নিজেদের হাতে নিতে পারবেন। যা কার্যত মেয়র রহমান ও তার পরিষদের ক্ষমতা কেড়ে নেবে। দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার না হলে ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগেই এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
সেক্রেটারি অব স্টেট স্টিভ রিড এমপি (সাবেক ল্যামবেথ কাউন্সিল নেতা) দুর্বল কাউন্সিলের প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
ইওয়াই-এর ফি সহ সরকারি হস্তক্ষেপের সব খরচ কাউন্সিলকেই বহন করতে হচ্ছে। অর্থাৎ স্থানীয় করদাতার পকেট থেকেই আসছে। এর বড় অংশ আসে পার্কিং জরিমানা থেকে। ২০২২ সালের হিসাবে টাওয়ার হ্যামলেটস প্রতিদিন গড়ে ২৪ হাজার ৩৯৫ পাউন্ড আয় করে এ খাত থেকে। এই অর্থ এখন কাউন্সিলের নিজস্ব ব্যর্থতার তদারকিতেই ব্যয় হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে স্লাও, ক্রয়ডনের মতো কিছু কাউন্সিল হস্তক্ষেপের মুখে পড়লেও টাওয়ার হ্যামলেটস ব্যতিক্রমী। এটিই একমাত্র প্রধান স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যার ওপর দুটি পৃথক বড় হস্তক্ষেপ হয়েছে ২০১৪-১৮ এবং ২০২৪ সালে। উভয় ক্ষেত্রেই মূলত লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন ও ক্রয়-সংক্রান্ত উদ্বেগ থেকে হস্তক্ষেপ করা হয়।
মেয়র লুৎফুর রহমানের বক্তব্য জানতে সোমবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এস্পায়ার পার্টির নেতৃস্থানীয় সদস্য কাউন্সিলর কবির আহমেদ বলেছেন, প্রতিবেদনে উল্লেখিত কিছু সমস্যা প্রায় এক দশক ধরে চলে আসছে এবং সিনিয়র কর্মকর্তাদের সততা ও প্রতিবেদনের প্রতি তার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
তবে লেবার কাউন্সিলর মার্ক ফ্রান্সিস কাউন্সিলের নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়াকে ‘আত্মরক্ষামূলক’ বলে সমালোচনা করেছেন। আরেক লেবার কাউন্সিলর আসমা ইসলাম বলেছেন, কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পদ্ধতিগত ও সাংস্কৃতিক সমস্যা বিস্তৃত এবং এ বিষয়ে আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
রিপোর্টারের নাম 




















