সুনামগঞ্জের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ১১ হাজার একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ। দেশীয় মাছের অভয়ারণ্য, হিজল-করচের বন এবং শীতকালীন লক্ষ লাখ অতিথি পাখির আশ্রয়স্থল এই জলাভূমিকে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০০০ সালে এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে ‘রামসার সাইট’ মর্যাদায় ভূষিত হয়। তবে সম্প্রতি ‘টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ-২০২৫’-এর আলোকে জেলা প্রশাসন কর্তৃক জারিকৃত ১৩ দফার কড়া নির্দেশনায় ইসিএ সীমানায় পর্যটকবাহী নৌযান ও হাউসবোট চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ এবং সাউন্ডসিস্টেম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে নতুন করে আইনি কাঠামোর জটিলতা সামনে আসে।
পরিবেশবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, সরকার হাকালুকি হাওরের সংকটাপন্ন সীমানা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করলেও টাঙ্গুয়ার হাওরের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করেনি। ফলে প্রতিবছর পর্যটন মৌসুমে জেলা প্রশাসন থেকে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা বা গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অভাবে তা ‘কাগুজে আদেশে’ পরিণত হয়। পরিবেশবিজ্ঞানীরা মনে করেন, ইসিএ এবং রামসার সাইট দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীতমুখী ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ইসিএ নীতি মূলত একতরফা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে এলাকাকে অবরুদ্ধ করার কথা বলে। অন্যদিকে, বিশ্ব পরিবেশ সংস্থা ও রামসার কনভেনশন মানবসম্পর্ক বিচ্ছিন্ন না করে ‘ওয়াইজ ইউজ’ (Wise Use) বা সুষম ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।
রামসার কনভেনশনের এই ‘ওয়াইজ ইউজ’ নীতি তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত: বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা, সমন্বিত জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্ষতি না করে বর্তমানের টেকসই ব্যবহার। অভিজ্ঞ মহলের মতে, এনজিও-নির্ভর ক্ষণস্থায়ী প্রকল্প ও আমলাতান্ত্রিক দায়সারা পদক্ষেপের বৃত্ত ভেঙে রামসার নীতি অনুসরণ করা গেলে টাঙ্গুয়ার হাওরকে একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘বিশেষ পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক অঞ্চল’ বা ‘ইকো-ইকোনমিক জোন’-এ রূপান্তর করা সম্ভব। এর মাধ্যমে আধুনিক অভয়ারণ্য, মৎস্য প্রজননকেন্দ্র ও নিয়ন্ত্রিত ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তুলে জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় লক্ষাধিক মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
রিপোর্টারের নাম 

























