মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
ঢাকা ০৩:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: যখন কোটা থেকে অধিকারের সংগ্রামে রূপ নেয় তরুণদের আন্দোলন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা

২০২৪ সালের জুলাই মাসটি প্রথমে অন্য সব জুলাইয়ের মতোই এসেছিল। আকাশে মেঘ ছিল, রাস্তায় ধুলো ছিল, শহরের মানুষের হাতে ছিল অসমাপ্ত কাজের তালিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে কেউ চাকরির আবেদন করছিল, কেউবা বিকালে বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে বসে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছিল। তখনো কেউ জানত না, কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের পরিচিত শহরটি বদলে যাবে। পরিচিত সড়কগুলো হয়ে উঠবে প্রতিরোধের মঞ্চ, রাস্তায় পাওয়া যাবে বারুদের খোসা, হাসপাতালের বারান্দা ভরে যাবে রক্তাক্ত তরুণে, আর মায়ের ফোন ধরার আগে সন্তানকে একবার ভেবে নিতে হবে—সত্যিটা বলবে, নাকি বলবে, ‘আম্মু, আমি নিরাপদে আছি।’

একটি দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। দাবি ছিল ন্যায্যতার, সমতার, ভবিষ্যৎকে নিজের যোগ্যতায় অর্জনের অধিকারের। কিন্তু বিগত সরকার যখন তরুণদের এই চাওয়াকে অপরাধ হিসেবে দেখতে শুরু করল, তখন সেই দাবি আর কেবল কোটার মধ্যে রইল না। একটি প্রজন্ম হঠাৎ বুঝতে পারল, তাদের শুধু চাকরির সুযোগ নয়, কথা বলার এমনকি বেঁচে থাকার অধিকারও সংকুচিত হয়ে এসেছে।

১৬ জুলাই আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন। তার হাতে অস্ত্র ছিল না। সামনে ছিল বন্দুক, পেছনে ছিল তার প্রজন্ম। গুলি চলল। একজন তরুণ মাটিতে পড়ে গেলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে যেন হাজার হাজার বা লাখ লাখ নয়, বরং অগণিত তরুণ উঠে দাঁড়ালেন। শহরের ওপর দিয়ে একটি অদৃশ্য শব্দ ছড়িয়ে পড়ল; প্রথমে ক্ষীণ, পরে প্রবল। সেই শব্দ কোনো দলীয় স্লোগান ছিল না। সেই শব্দে জেগে উঠল ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত, মো. ফারুক ও মো. শাহজাহানরা। সে শব্দ ছিল অপমানিত মানুষের কণ্ঠ, নিহত সহপাঠীর জন্য ক্রোধ এবং নিজের ভেতরে নিষ্পেষিত ও জমে থাকা ভয় ভেঙে ফেলার শব্দ।

১৭ জুলাই সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খালি হলো, আবাসিক শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে পড়লেন ঘরের উদ্দেশে। কিন্তু ছড়িয়ে পড়ল আগুন। ফ্যাসিবাদী শক্তি হয়তো ভেবেছিল, সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ মানেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। কিন্তু তরুণেরা নদীর জলের মতো। এক পথ আটকে দিলে তারা অন্য পথ খুঁজে নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল নিঃশব্দ হওয়ার পরদিনই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও আশপাশের সড়কগুলো জেগে উঠল।

১৮ জুলাই সকালে কেউ কাউকে নেতা ঘোষণা করেননি। কোনো কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রত্যেকের হাতে নির্দেশনাও পৌঁছায়নি। তবু নর্থ সাউথ, ব্র্যাকসহ অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে যোগ দেন, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সন্ত্রাস বরদাশত করা হবে না: মামুনুল হক

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: যখন কোটা থেকে অধিকারের সংগ্রামে রূপ নেয় তরুণদের আন্দোলন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা

আপডেট সময় : ০১:৫৭:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

২০২৪ সালের জুলাই মাসটি প্রথমে অন্য সব জুলাইয়ের মতোই এসেছিল। আকাশে মেঘ ছিল, রাস্তায় ধুলো ছিল, শহরের মানুষের হাতে ছিল অসমাপ্ত কাজের তালিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে কেউ চাকরির আবেদন করছিল, কেউবা বিকালে বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে বসে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছিল। তখনো কেউ জানত না, কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের পরিচিত শহরটি বদলে যাবে। পরিচিত সড়কগুলো হয়ে উঠবে প্রতিরোধের মঞ্চ, রাস্তায় পাওয়া যাবে বারুদের খোসা, হাসপাতালের বারান্দা ভরে যাবে রক্তাক্ত তরুণে, আর মায়ের ফোন ধরার আগে সন্তানকে একবার ভেবে নিতে হবে—সত্যিটা বলবে, নাকি বলবে, ‘আম্মু, আমি নিরাপদে আছি।’

একটি দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। দাবি ছিল ন্যায্যতার, সমতার, ভবিষ্যৎকে নিজের যোগ্যতায় অর্জনের অধিকারের। কিন্তু বিগত সরকার যখন তরুণদের এই চাওয়াকে অপরাধ হিসেবে দেখতে শুরু করল, তখন সেই দাবি আর কেবল কোটার মধ্যে রইল না। একটি প্রজন্ম হঠাৎ বুঝতে পারল, তাদের শুধু চাকরির সুযোগ নয়, কথা বলার এমনকি বেঁচে থাকার অধিকারও সংকুচিত হয়ে এসেছে।

১৬ জুলাই আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন। তার হাতে অস্ত্র ছিল না। সামনে ছিল বন্দুক, পেছনে ছিল তার প্রজন্ম। গুলি চলল। একজন তরুণ মাটিতে পড়ে গেলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে যেন হাজার হাজার বা লাখ লাখ নয়, বরং অগণিত তরুণ উঠে দাঁড়ালেন। শহরের ওপর দিয়ে একটি অদৃশ্য শব্দ ছড়িয়ে পড়ল; প্রথমে ক্ষীণ, পরে প্রবল। সেই শব্দ কোনো দলীয় স্লোগান ছিল না। সেই শব্দে জেগে উঠল ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত, মো. ফারুক ও মো. শাহজাহানরা। সে শব্দ ছিল অপমানিত মানুষের কণ্ঠ, নিহত সহপাঠীর জন্য ক্রোধ এবং নিজের ভেতরে নিষ্পেষিত ও জমে থাকা ভয় ভেঙে ফেলার শব্দ।

১৭ জুলাই সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খালি হলো, আবাসিক শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে পড়লেন ঘরের উদ্দেশে। কিন্তু ছড়িয়ে পড়ল আগুন। ফ্যাসিবাদী শক্তি হয়তো ভেবেছিল, সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ মানেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। কিন্তু তরুণেরা নদীর জলের মতো। এক পথ আটকে দিলে তারা অন্য পথ খুঁজে নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল নিঃশব্দ হওয়ার পরদিনই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও আশপাশের সড়কগুলো জেগে উঠল।

১৮ জুলাই সকালে কেউ কাউকে নেতা ঘোষণা করেননি। কোনো কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রত্যেকের হাতে নির্দেশনাও পৌঁছায়নি। তবু নর্থ সাউথ, ব্র্যাকসহ অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে যোগ দেন, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।