২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সময় যখন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসিবাদী বাহিনীর হাতে রাজপথে একের পর এক প্রাণ ঝরছিল, তখন গেন্ডারিয়ার আদর্শ একাডেমির দশম শ্রেণির ছাত্র আনাস আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। পরিবারের সদস্যদের অগোচরে মায়ের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে তিনি সেই বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আন্দোলনে যোগ দেন। সেদিনই ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আনাস। পরবর্তী সময়ে মায়ের উদ্দেশে লেখা সেই চিঠি প্রকাশিত হলে তা সারা দেশের মানুষের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
সেই মর্মস্পর্শী চিঠিতে আনাস লিখেছিলেন—‘মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। আমি নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না। সরি আব্বুজান। তোমার কথা অমান্য করে বের হলাম। স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। আমাদের ভাইয়েরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে রাজপথে নেমে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অকাতরে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘একটি প্রতিবন্ধী কিশোর, সাত বছরের বাচ্চা, ল্যাংড়া মানুষ যদি সংগ্রামে নামতে পারে, তাহলে আমি কেন ঘরে বসে থাকব। একদিন তো মরতে হবেই। তাই মৃত্যুর ভয়ে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যু অধিক শ্রেষ্ঠ। যে অন্যের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয়, সে-ই প্রকৃত মানুষ। আমি যদি বেঁচে না ফিরি, তবে কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হয়ো। জীবনের প্রতিটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাই।’
মা সানজিদা খানের কাছে ক্ষমা চেয়ে, কাঁপা হাতে ভুল বানানে চিঠিটা লিখে বাড়ি ছেড়েছিলেন শাহরিয়ার খান আনাস। শাহাদৎ নিশ্চিত জেনেও লংমার্চ টু ঢাকায় শামিল হয়ে রাজপথে নেমেছিলেন এই কিশোর। বিগত সরকারের পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়ে বরণ করে নেন বীরের মৃত্যু। আনাস পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তার রেখে যাওয়া চিঠি তাকে অমর করে রাখবে, বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।
মাত্র ১৬ বছর বয়সি এই কিশোর বিজ্ঞান বিভাগে পড়তেন। ছোট দুই ভাইকে ছাড়া কিছু খেতেন না, বাবার কাছে কখনো বায়না ধরতেন না। দাদির মৃত্যুর পর সবার কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলেন তার জায়নামাজ, যাতে বসে নামাজ শেষে দীর্ঘ সময় দোয়া করতেন। এমনই এক সহজ-সরল, ধর্মভীরু ছেলে ছিলেন শাহরিয়ার খান আনাস, পরিবারের সবার চোখের মণি। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হতে শুরু করল, তখন এই কিশোরের মনেও জ্বলে উঠল প্রতিবাদের আগুন।
বাবা-মা তাকে আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে অনেক বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু ছাত্রদের বুকে যেদিন গুলি চলল, সেদিন থেকে আনাসের মনে আর শান্তি ছিল না।
রিপোর্টারের নাম 




















