মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
ঢাকা ০২:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬

‘জুলাই ৩৬’ গণঅভ্যুত্থান: বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বাঁক পরিবর্তনকারী অধ্যায়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৩৯:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো শুধু একটি সরকারের উত্থান-পতনকে হিসাব না করে বরং একটি জাতির রাজনৈতিক চেতনা, রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের গতিপথকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ‘জুলাই ৩৬’ তেমনই এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটি ছিল একটি প্রজন্মের আত্মপ্রকাশ, রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্তকরণ এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির দাবিতে গড়ে ওঠা এক বিস্তৃত গণআন্দোলন, যা শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই ঘটনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের পথ সুগম করে, যা পরবর্তীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ভিত্তি স্থাপন করে।

‘জুলাই ৩৬’ নামটির মধ্যেই রয়েছে প্রতীকী তাৎপর্য। ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই বলে কোনো দিন না থাকলেও আন্দোলনকারীদের কাছে এটি ছিল দীর্ঘ প্রতিরোধের ধারাবাহিকতার প্রতীক। এটি এমন একটি সময়কে নির্দেশ করে, যখন ক্যালেন্ডারের প্রচলিত হিসাবকে অতিক্রম করে আন্দোলনের স্মৃতি ও আত্মত্যাগের একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা নির্মিত হয়। এই প্রতীকী ভাষা দেখিয়ে দেয় যে, ইতিহাস কেবল তারিখ দিয়ে নয়; বরং মানুষের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম এবং স্মৃতির মাধ্যমেও রচিত হয়।

এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল বিগত সরকারের আমলে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অধিকাংশ গণঅভ্যুত্থানের পেছনে একটি দৃশ্যমান ইস্যুর পাশাপাশি বহুদিনের জমে থাকা অসন্তোষও কাজ করে। কর্মসংস্থানের সংকট, প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন, রাজনৈতিক মেরূকরণ, নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ-অনিশ্চয়তা; এসব বিষয় আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিকে প্রসারিত করে। ফলে কোটা প্রশ্ন ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রশ্নের প্রতীকে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে গণঅভ্যুত্থান ও গণআন্দোলনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একটি আন্দোলন তখনই গণঅভ্যুত্থানের পর্যায়ে পৌঁছে, যখন তা কেবল নীতিগত পরিবর্তনের দাবি না জানিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৈধতা, শাসনব্যবস্থার চরিত্র এবং জনগণের অংশগ্রহণের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। ২০২৪ সালের ‘জুলাই ৩৬’ গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে এক ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে এগোলো টার্কিশ পেট্রোলিয়াম, দরপত্র কিনেছে ৫ বিদেশি সংস্থাও

‘জুলাই ৩৬’ গণঅভ্যুত্থান: বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বাঁক পরিবর্তনকারী অধ্যায়

আপডেট সময় : ১১:৩৯:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো শুধু একটি সরকারের উত্থান-পতনকে হিসাব না করে বরং একটি জাতির রাজনৈতিক চেতনা, রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের গতিপথকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ‘জুলাই ৩৬’ তেমনই এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটি ছিল একটি প্রজন্মের আত্মপ্রকাশ, রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্তকরণ এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির দাবিতে গড়ে ওঠা এক বিস্তৃত গণআন্দোলন, যা শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই ঘটনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের পথ সুগম করে, যা পরবর্তীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ভিত্তি স্থাপন করে।

‘জুলাই ৩৬’ নামটির মধ্যেই রয়েছে প্রতীকী তাৎপর্য। ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই বলে কোনো দিন না থাকলেও আন্দোলনকারীদের কাছে এটি ছিল দীর্ঘ প্রতিরোধের ধারাবাহিকতার প্রতীক। এটি এমন একটি সময়কে নির্দেশ করে, যখন ক্যালেন্ডারের প্রচলিত হিসাবকে অতিক্রম করে আন্দোলনের স্মৃতি ও আত্মত্যাগের একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা নির্মিত হয়। এই প্রতীকী ভাষা দেখিয়ে দেয় যে, ইতিহাস কেবল তারিখ দিয়ে নয়; বরং মানুষের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম এবং স্মৃতির মাধ্যমেও রচিত হয়।

এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল বিগত সরকারের আমলে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অধিকাংশ গণঅভ্যুত্থানের পেছনে একটি দৃশ্যমান ইস্যুর পাশাপাশি বহুদিনের জমে থাকা অসন্তোষও কাজ করে। কর্মসংস্থানের সংকট, প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন, রাজনৈতিক মেরূকরণ, নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ-অনিশ্চয়তা; এসব বিষয় আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিকে প্রসারিত করে। ফলে কোটা প্রশ্ন ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রশ্নের প্রতীকে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে গণঅভ্যুত্থান ও গণআন্দোলনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একটি আন্দোলন তখনই গণঅভ্যুত্থানের পর্যায়ে পৌঁছে, যখন তা কেবল নীতিগত পরিবর্তনের দাবি না জানিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৈধতা, শাসনব্যবস্থার চরিত্র এবং জনগণের অংশগ্রহণের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। ২০২৪ সালের ‘জুলাই ৩৬’ গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে এক ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়।