ঢাকা ১০:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

ভারতে গণঅভ্যুত্থান কেন বিরল: স্থিতিশীল গণতন্ত্রের নেপথ্যে

ভারতে গণঅভ্যুত্থান বিরল কেন, এ প্রশ্নটি সম্প্রতি বেশ আলোচিত। কেউ কেউ মনে করেন, ভারতীয় জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের সাহস কম, তবে ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। গত ছয় দশকে ভারত অসংখ্য বড় আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— জয়প্রকাশ নারায়ণের ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ (১৯৭৪), জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, ১৯৭৭ সালের ব্যালট বিপ্লব, আসাম আন্দোলন, আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন (২০১১), নির্ভয়া প্রতিবাদ (২০১২), শাহীনবাগ ও সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন (২০১৯-২০), এবং ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলন যা তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহারে সরকারকে বাধ্য করেছিল। সুতরাং, প্রশ্নটি ‘ভারতে আন্দোলন হয় না কেন’ নয়, বরং ‘আন্দোলন কেন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় না’— সেটাই মূল জিজ্ঞাস্য।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পুরোনো একটি সত্য এর প্রথম উত্তর দিতে পারে: গণঅভ্যুত্থান তখনই অনিবার্য হয়ে ওঠে যখন ক্ষমতা পরিবর্তনের বৈধ পথগুলো বন্ধ হয়ে যায়। যেমন, বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থান ঘটেছিল দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ভোটের দরজা বন্ধ থাকার কারণে। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের ‘আরাগালায়া’ আন্দোলন হয়েছিল রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এবং পরিবারতন্ত্রের রাষ্ট্র দখলের ফলস্বরূপ। নেপালে যদিও ভোট ছিল, কিন্তু দুর্বল সরকার ব্যবস্থা তীব্র বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি তৈরি করে পরিস্থিতিকে বিষাক্ত করে তুলেছিল।

ভারতের ক্ষেত্রে, ত্রুটিপূর্ণ হলেও দেশটির নির্বাচনি ব্যবস্থা কার্যকর। রাজ্য পর্যায়ে এবং কেন্দ্রেও নিয়মিত ক্ষমতা বদল হয়। ফলে জনগণের অসন্তোষ ব্যালটের ‘সেফটি ভালভ’ দিয়ে বেরিয়ে আসে, রাজপথে বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই। অভ্যুত্থানকে ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ব্যর্থতার শেষ চিহ্ন হিসেবে দেখা হয়। যে দেশে কার্যকর নির্বাচনি ব্যবস্থা আছে, সেখানে সাধারণত বিপ্লব হয় না, বরং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদল ঘটে। এটিকে ভারতীয় জনগণের ভীরুতা হিসেবে না দেখে বরং দেশটির সুপ্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং নকশাগত সুফলের ফল হিসেবে দেখা উচিত।

ভারতের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ (রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে) এবং ক্ষমতার ভারসাম্য (নির্বাহী, আইন প্রণয়নকারী ও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ) রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে নির্বাহী, আইন প্রণয়নকারী ও বিচারিক— সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে বাংলাদেশের মৌলিক সংস্কারের দাবি একটি ‘বেসিক অ্যান্ড ফাউন্ডেশনাল কল’ হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় এই পর্যায়টি অতিক্রম করেছে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান এমন দেশে গণঅভ্যুত্থান খুব কমই হয়, যা ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিফলিত।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্বজয়ী স্প্যানিশ ফুটবল দলের রাজকীয় সংবর্ধনা: মাদ্রিদের রাজপথে লাখো মানুষের উল্লাস

ভারতে গণঅভ্যুত্থান কেন বিরল: স্থিতিশীল গণতন্ত্রের নেপথ্যে

আপডেট সময় : ০৯:৪৪:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

ভারতে গণঅভ্যুত্থান বিরল কেন, এ প্রশ্নটি সম্প্রতি বেশ আলোচিত। কেউ কেউ মনে করেন, ভারতীয় জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের সাহস কম, তবে ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। গত ছয় দশকে ভারত অসংখ্য বড় আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— জয়প্রকাশ নারায়ণের ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ (১৯৭৪), জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, ১৯৭৭ সালের ব্যালট বিপ্লব, আসাম আন্দোলন, আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন (২০১১), নির্ভয়া প্রতিবাদ (২০১২), শাহীনবাগ ও সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন (২০১৯-২০), এবং ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলন যা তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহারে সরকারকে বাধ্য করেছিল। সুতরাং, প্রশ্নটি ‘ভারতে আন্দোলন হয় না কেন’ নয়, বরং ‘আন্দোলন কেন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় না’— সেটাই মূল জিজ্ঞাস্য।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পুরোনো একটি সত্য এর প্রথম উত্তর দিতে পারে: গণঅভ্যুত্থান তখনই অনিবার্য হয়ে ওঠে যখন ক্ষমতা পরিবর্তনের বৈধ পথগুলো বন্ধ হয়ে যায়। যেমন, বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থান ঘটেছিল দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ভোটের দরজা বন্ধ থাকার কারণে। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের ‘আরাগালায়া’ আন্দোলন হয়েছিল রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এবং পরিবারতন্ত্রের রাষ্ট্র দখলের ফলস্বরূপ। নেপালে যদিও ভোট ছিল, কিন্তু দুর্বল সরকার ব্যবস্থা তীব্র বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি তৈরি করে পরিস্থিতিকে বিষাক্ত করে তুলেছিল।

ভারতের ক্ষেত্রে, ত্রুটিপূর্ণ হলেও দেশটির নির্বাচনি ব্যবস্থা কার্যকর। রাজ্য পর্যায়ে এবং কেন্দ্রেও নিয়মিত ক্ষমতা বদল হয়। ফলে জনগণের অসন্তোষ ব্যালটের ‘সেফটি ভালভ’ দিয়ে বেরিয়ে আসে, রাজপথে বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই। অভ্যুত্থানকে ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ব্যর্থতার শেষ চিহ্ন হিসেবে দেখা হয়। যে দেশে কার্যকর নির্বাচনি ব্যবস্থা আছে, সেখানে সাধারণত বিপ্লব হয় না, বরং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদল ঘটে। এটিকে ভারতীয় জনগণের ভীরুতা হিসেবে না দেখে বরং দেশটির সুপ্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং নকশাগত সুফলের ফল হিসেবে দেখা উচিত।

ভারতের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ (রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে) এবং ক্ষমতার ভারসাম্য (নির্বাহী, আইন প্রণয়নকারী ও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ) রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে নির্বাহী, আইন প্রণয়নকারী ও বিচারিক— সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে বাংলাদেশের মৌলিক সংস্কারের দাবি একটি ‘বেসিক অ্যান্ড ফাউন্ডেশনাল কল’ হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় এই পর্যায়টি অতিক্রম করেছে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান এমন দেশে গণঅভ্যুত্থান খুব কমই হয়, যা ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিফলিত।