ঢাকা ০৮:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

আমনের বাম্পার ফলনেও কম দামে বিপাকে রংপুরের কৃষকরা

রংপুর অঞ্চলে আমনধান কাটাই–মাড়াই এখন পুরো দমে চলছে। মাঠে বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ধানের দাম দ্রুত কমে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা বাড়ছে কৃষকদের। গত বছরের তুলনায় প্রতি মণ ধান ১৫০–২০০ টাকা কম দামে বিক্রি হওয়ায় লোকসানের শঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও দাম কমে যাওয়ার কারণে কৃষকেরা ভাবনায় রয়েছেন—ফসল তোলার গতি বাড়লে দাম আরও পড়ে যেতে পারে।

মাঠে দেখা গেছে, গত বছর মৌসুম শুরুর দিকে প্রতি মণ ধান যেখানে ১,২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, মৌসুম শেষে তা দাঁড়ায় ১,৪০০ টাকায়। কিন্তু এ বছর শুরুতেই দাম নেমে এসেছে ১,০০০ থেকে ১,১০০ টাকায়। অনেকের আশঙ্কা দিন যত যাবে, দাম হাজার টাকার নিচে নামতে পারে।

রংপুর নগরের কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ফসল ভালো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দাম যদি এমনই কম থাকে, খরচই উঠবে না। এত কষ্ট করে লোকসান গুনতে হলে কৃষি ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।’ টিপু সুলতানসহ আরও অনেকে একই অভিযোগ করেন—ফসল ভালো হলেও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে নেই।

চাল–ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় বাজারে আমনের দাম ১৫০–২০০ টাকা কম। যদিও তারা আশা করছেন, শিগগিরই চাহিদা বাড়লে বাজার কিছুটা স্থির হতে পারে।

জাতীয় পর্যায়েও আমনের বাজার অস্থির। উত্তরাঞ্চলে ধানের দাম ১,৩৩০ থেকে ১,৩৫০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা গত মৌসুমের তুলনায় কম। বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত সরবরাহ ও পুরোনো চালের মজুতই দাম কমার প্রধান কারণ।

এদিকে অনুকূল আবহাওয়া ও বাড়তি আবাদে রংপুরে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আমন চাষ হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্য ছিল ৬ লাখ ২০ হাজার ৪৩০ হেক্টর, কিন্তু আবাদ হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫০০ হেক্টরে। উৎপাদন ২০ লাখ টনের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩.২৫ টন চাল (৪.৮৭৫ টন ধান) উৎপাদিত হচ্ছে, ফলে কৃষকের গোলা নতুন ধানে ভরে উঠছে।

গত এক দশকে এই অঞ্চলে আমনের আবাদ ৩৭ হাজার হেক্টরের বেশি বেড়েছে, উৎপাদন বেড়েছে ৬ লাখ মেট্রিক টন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ মৌসুমে দেশে আমন উৎপাদন হবে ১.৬৫ কোটি টন। রংপুরের পাঁচ জেলায় প্রথমদিকের আমন বিক্রিতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কৃষক আয় করতে পারেন।

অন্তর্বর্তী সরকার কৃষকদের সুরক্ষায় ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে, সাধারণ ধানের কেজি ৩৪ টাকা (প্রতি মণ ১,৩৬০ টাকা) এবং আতব ধানের দাম ৪৯ টাকা। পরোক্ষ চালের দাম ঠিক করা হয়েছে ৫০ টাকা। ক্রয় চলবে ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তবে ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমানোয় বাজারে সরবরাহ চাপ বাড়তে পারে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম বাড়বে এবং কৃষক লোকসান এড়াতে পারবেন। সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ক্রয় কার্যক্রম দাম স্থিতিশীল করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে কৃষকদের মত আলু চাষিদের মতোই উৎপাদন বেশি হলেও বাজারদরে পতন হলে লোকসান অনিবার্য, যা আমনচাষিদেরও সতর্ক করছে। জাতীয় অর্থনৈতিক সংকট ও অতিরিক্ত সরবরাহ মিলিয়ে আমনের বাজার এখন চাপের মুখে। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় আরও সহায়ক নীতি প্রয়োজন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ফটিকছড়িতে গুলিতে যুবক নিহত: জামায়াত কর্মীর পরিচয় দাবি, থমথমে জনপদ, মেলেনি মামলা

আমনের বাম্পার ফলনেও কম দামে বিপাকে রংপুরের কৃষকরা

আপডেট সময় : ০১:১৫:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫

রংপুর অঞ্চলে আমনধান কাটাই–মাড়াই এখন পুরো দমে চলছে। মাঠে বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ধানের দাম দ্রুত কমে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা বাড়ছে কৃষকদের। গত বছরের তুলনায় প্রতি মণ ধান ১৫০–২০০ টাকা কম দামে বিক্রি হওয়ায় লোকসানের শঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও দাম কমে যাওয়ার কারণে কৃষকেরা ভাবনায় রয়েছেন—ফসল তোলার গতি বাড়লে দাম আরও পড়ে যেতে পারে।

মাঠে দেখা গেছে, গত বছর মৌসুম শুরুর দিকে প্রতি মণ ধান যেখানে ১,২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, মৌসুম শেষে তা দাঁড়ায় ১,৪০০ টাকায়। কিন্তু এ বছর শুরুতেই দাম নেমে এসেছে ১,০০০ থেকে ১,১০০ টাকায়। অনেকের আশঙ্কা দিন যত যাবে, দাম হাজার টাকার নিচে নামতে পারে।

রংপুর নগরের কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ফসল ভালো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দাম যদি এমনই কম থাকে, খরচই উঠবে না। এত কষ্ট করে লোকসান গুনতে হলে কৃষি ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।’ টিপু সুলতানসহ আরও অনেকে একই অভিযোগ করেন—ফসল ভালো হলেও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে নেই।

চাল–ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় বাজারে আমনের দাম ১৫০–২০০ টাকা কম। যদিও তারা আশা করছেন, শিগগিরই চাহিদা বাড়লে বাজার কিছুটা স্থির হতে পারে।

জাতীয় পর্যায়েও আমনের বাজার অস্থির। উত্তরাঞ্চলে ধানের দাম ১,৩৩০ থেকে ১,৩৫০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা গত মৌসুমের তুলনায় কম। বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত সরবরাহ ও পুরোনো চালের মজুতই দাম কমার প্রধান কারণ।

এদিকে অনুকূল আবহাওয়া ও বাড়তি আবাদে রংপুরে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আমন চাষ হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্য ছিল ৬ লাখ ২০ হাজার ৪৩০ হেক্টর, কিন্তু আবাদ হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫০০ হেক্টরে। উৎপাদন ২০ লাখ টনের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩.২৫ টন চাল (৪.৮৭৫ টন ধান) উৎপাদিত হচ্ছে, ফলে কৃষকের গোলা নতুন ধানে ভরে উঠছে।

গত এক দশকে এই অঞ্চলে আমনের আবাদ ৩৭ হাজার হেক্টরের বেশি বেড়েছে, উৎপাদন বেড়েছে ৬ লাখ মেট্রিক টন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ মৌসুমে দেশে আমন উৎপাদন হবে ১.৬৫ কোটি টন। রংপুরের পাঁচ জেলায় প্রথমদিকের আমন বিক্রিতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কৃষক আয় করতে পারেন।

অন্তর্বর্তী সরকার কৃষকদের সুরক্ষায় ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে, সাধারণ ধানের কেজি ৩৪ টাকা (প্রতি মণ ১,৩৬০ টাকা) এবং আতব ধানের দাম ৪৯ টাকা। পরোক্ষ চালের দাম ঠিক করা হয়েছে ৫০ টাকা। ক্রয় চলবে ১৭ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তবে ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমানোয় বাজারে সরবরাহ চাপ বাড়তে পারে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম বাড়বে এবং কৃষক লোকসান এড়াতে পারবেন। সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ক্রয় কার্যক্রম দাম স্থিতিশীল করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে কৃষকদের মত আলু চাষিদের মতোই উৎপাদন বেশি হলেও বাজারদরে পতন হলে লোকসান অনিবার্য, যা আমনচাষিদেরও সতর্ক করছে। জাতীয় অর্থনৈতিক সংকট ও অতিরিক্ত সরবরাহ মিলিয়ে আমনের বাজার এখন চাপের মুখে। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় আরও সহায়ক নীতি প্রয়োজন।