বাংলাদেশে ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের কথিত তৎপরতা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম, একটি ভারতীয় থিংক ট্যাংক এবং ইসরাইলি কূটনৈতিক সূত্রের কিছু বক্তব্য ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন বা সরকারি সূত্রে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
সম্প্রতি ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত থিংক ট্যাংক ‘উসানাস ফাউন্ডেশন’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হামাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তা ভারতের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
কী দাবি করা হয়েছে?
গত ১২ মে প্রকাশিত ‘Hamas Beyond West Asia: Why Its Growing Links in Pakistan and Bangladesh Matter for India’ শীর্ষক নিবন্ধে বলা হয়, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত একটি ধর্মীয় সমাবেশে হামাসের কয়েকজন নেতার অংশগ্রহণ ছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ফিলিস্তিনপন্থি সমাবেশ, গায়েবানা জানাজা এবং বিভিন্ন ইসলামপন্থি সংগঠনের অবস্থানকে হামাসের প্রতি সমর্থনের নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে নিবন্ধে উল্লিখিত তথ্যগুলোর বেশ কয়েকটির স্বাধীন যাচাই বা নির্ভরযোগ্য উৎস উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি লেখকের নামও প্রকাশ করা হয়নি।
ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য
এর কিছুদিন পর ভারতে নিযুক্ত ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সংগঠনটির সম্ভাব্য কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে ইসরাইল।
তিনি বলেন, কিছু তথ্য প্রকাশ্য সূত্রের ভিত্তিতে পাওয়া গেছে এবং আরও কিছু কার্যক্রম জনসমক্ষে না-ও থাকতে পারে। তবে বাংলাদেশে হামাসের কোনো নির্দিষ্ট সাংগঠনিক উপস্থিতি বা কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি।
আওয়ামীপন্থি কিছু গণমাধ্যমকর্মীর প্রচার
ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য এবং উসানাস ফাউন্ডেশনের নিবন্ধকে কেন্দ্র করে কয়েকজন বাংলাদেশি গণমাধ্যমকর্মী ও ইউটিউবভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাতা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। তাদের কিছু প্রতিবেদনে বাংলাদেশে হামাস নেতাদের সফরের দাবি করা হলেও সেই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বা যাচাইযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।
সমালোচকদের অভিযোগ, এসব কনটেন্টে অনেক ক্ষেত্রে মূল তথ্যসূত্র স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি এবং যাচাইবিহীন তথ্যকে নিশ্চিত ঘটনার মতো উপস্থাপন করা হয়েছে।
কী বলছেন পর্যবেক্ষকরা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, ফিলিস্তিনের প্রতি জনসমর্থন এবং হামাসের সাংগঠনিক উপস্থিতি—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা উচিত নয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি জনসমর্থন রয়েছে। গাজা বা ফিলিস্তিনে সংঘাতের ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ইসলামি সংগঠন ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ, মানববন্ধন বা গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে থাকে। তবে এসব কর্মসূচিকে সরাসরি হামাসের সাংগঠনিক তৎপরতার প্রমাণ হিসেবে দেখার আগে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুর প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও প্রচারণাকে তথ্য-যাচাইয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা জরুরি।
এখন পর্যন্ত কী জানা গেছে?
বাংলাদেশ সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো স্বীকৃত নিরাপত্তা সংস্থা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে হামাসের সাংগঠনিক উপস্থিতি বা কার্যক্রমের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হামাসের কোনো শীর্ষ নেতার বাংলাদেশ সফরের বিষয়েও নির্ভরযোগ্য সরকারি বা কূটনৈতিক সূত্রে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফলে বাংলাদেশে হামাসের কথিত উপস্থিতি নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা এখনো মূলত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সূত্রের দাবি-প্রতিদাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের প্রয়োজন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
রিপোর্টারের নাম 





















