জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্তার ঘটনায় মামলা দায়েরের কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মামলার আসামি হয়েও তারা এখনো গ্রেপ্তার হননি। অন্যদিকে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠা খুলশী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানও রয়েছেন আইনের নাগালের বাইরে। তাকে শুধু দায়িত্ব থেকে সরিয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আইনজীবী ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগে মামলা হলে গ্রেপ্তার বা আদালতে আত্মসমর্পণের মতো আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত কার্যকর হতো। কিন্তু পুলিশের সদস্যদের ক্ষেত্রে ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে, যা আইনের সমতার প্রশ্ন তুলছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার রাতে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ শেষে চট্টগ্রামে ফিরে বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাসায় ফিরছিলেন জাতীয় দলের স্পিনার নাঈম হাসান। নগরের লালখান বাজার ফ্লাইওভারের মুখে তার বহনকারী সিএনজি থামিয়ে তল্লাশি চালায় কয়েকজন ব্যক্তি, যারা নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয়।
পরে জানা যায়, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক সোনা চোরাচালানের একটি তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছিল। খুলশী থানার তৎকালীন ওসি আরিফুর রহমানের অধীন পরিচালিত অভিযানে এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও কয়েকজন সোর্স অংশ নেন।
নাঈমের অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। একপর্যায়ে জোর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। এতে বাধা দিলে তাকে মারধর করা হয়। স্থানীয় লোকজন এবং উপস্থিত কয়েকজন তাকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে শনাক্ত করলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি।
অভিযোগে বলা হয়, ঘটনাস্থলে থাকা এক পুলিশ সোর্স এবং অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যরাও শারীরিকভাবে তাকে লাঞ্ছিত করেন। পরে বিষয়টি ওসি আরিফুর রহমানকে জানানো হলে তার নির্দেশে নাঈমকে খুলশী থানায় নেওয়া হয়।
নাঈম দাবি করেন, থানায় নেওয়ার পরও নিজের পরিচয়পত্র দেখানো এবং জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পর তাকে দীর্ঘ সময় হয়রানির মুখে পড়তে হয়। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবাল ও পরিচালক ইসরাফিল খসরু পুলিশের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার পরদিন নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং পুলিশ সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়। অভিযোগে মারধর, অপহরণের চেষ্টা এবং বেআইনিভাবে আটকে রাখার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার পর সিএমপি সোর্স সোহেলকে গ্রেপ্তারের কথা জানালেও দুই পুলিশ সদস্যকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাদের শুধু প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ঘটনার মূল নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত ওসি আরিফুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নাঈম ও তার পরিবারের অভিযোগ, পুরো ঘটনার পেছনে ওসির নির্দেশনা ছিল। তবে আরিফুর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, অভিযানের বিষয়ে তাকে আগে জানানো হয়নি। থানায় আনার পর পরিচয় নিশ্চিত হলে তিনি নাঈমকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
ঘটনার পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী নাঈমের বাসায় গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের আচরণকে ‘চরম অপেশাদার’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভাগীয় তদন্ত কোনোভাবেই ফৌজদারি মামলার বিকল্প হতে পারে না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান খান বলেন, পুলিশের সদস্য হলেও আইন সবার জন্য সমান। কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মারধর, অপহরণের চেষ্টা বা বেআইনি আটকের অভিযোগে মামলা হলে তার ক্ষেত্রেও সাধারণ আসামির মতোই আইন প্রযোজ্য হওয়া উচিত। শুধু প্রত্যাহার বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে দায় এড়ানো যায় না।
তিনি আরও বলেন, ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া কোনো শাস্তি নয়, বরং এটি সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ জরুরি।
নাঈম হাসানকে হেনস্তার ঘটনাটি ইতোমধ্যে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার যদি নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। এখন সবার নজর তদন্তের অগ্রগতি এবং অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে।
রিপোর্টারের নাম 
























